Sun Sun Sun Sun Sun
English

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় গৃহশিক্ষকতা

|| ড. এম হেলাল ||
কেউ স্বীকার করুক আর নাই-ই করুক, একথা সত্য যে- আমাদের দেশে যে শিক্ষা চলছে, তা আদৌ বাস্তবসম্মত বা যুগোপযোগী নয়। এমনকি এই শিক্ষায় ব্যবস্থাগত ত্রুটিও বেশ লক্ষণীয়। এখানে না আছে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক, না আছে সবার জন্য শিক্ষার নিশ্চয়তা। সবার জন্য শিক্ষার নিশ্চিন্তকরণ যে আমাদের মতো একটা দরিদ্র দেশে বেসরকারি উদ্যোগে সম্ভব না, তা আলোচনার উর্ধ্বে বলে স্বীকার করে নেয়াই শ্রেয়।

তবে এই শিক্ষা সবার জন্য না হলেও একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য তো বর্তমান। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমরা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে অগ্রগামী মনে করতে পারি। আর বাকী যে একটা শ্রেণী অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণী- তারা আর যাই পাক, শিক্ষার সুযোগ পায় না। কেননা পেটের চিন্তা যাদের বড়, তারা তো সময়ের একটা বড় অংশ ঐ পেট পূর্তিতেই ব্যবহার করবে- এটাই স্বাভাবিক। উপরন্তু আমাদের শিক্ষায় সময় লাগে দেদার, ব্যয়ও হয় প্রচুর। কাজেই, এই সময় ও ব্যয়কে স্বীকার করে শিক্ষাগ্রহণ ঐ সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে সম্ভব না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম যে চোখে পড়ে না, তা নয়। তবে তা তো ব্যতিক্রমই। আর তাতে শিক্ষা ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর। মাঝখানে শূন্য রয়ে গেছে এক সর্বহারা শ্রেণী, যাদের সংখ্যা আমাদের দেশে নেহায়েত কম নয়।

আপাততঃ ঐ শ্রেণীর কথা থাক। নইলে লিখতে লিখতে অনেক লেখাই হয়ে যাবে, শুধু বাদ রয়ে যাবে আসল প্রসঙ্গ। তবু শিক্ষা ব্যবস্থার কথা আসলে সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের কথাও একইভাবে চলে আসে, তাই এত কথা বলা। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা কোন্ ব্যবস্থাপনায় এগুচ্ছে, ছাত্ররাও বা এটাকে কিভাবে গ্রহণ করছে?

প্রথমেই বলেছি- আমাদের দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে, তাতে আধিপত্য বিস্তার করে বসে আছে এদেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজনেরা। এদের অবস্থা স্বচ্ছল, আর এই স্বচ্ছলতার সুবাদে এরা এই ব্যয়সাপেক্ষ ও সময় সাপেক্ষ শিক্ষাকে নিজেদের করে নিতে পারছে। দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্য থেকে লোকজন শিক্ষিত হচ্ছে এবং পরবর্তীতে এরাই আবার মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের হাল ধরছে। কিন্তু তাদের এই শিক্ষার ভিতরে কতটুকু পরিপূর্ণতা আসছে? সমাজের জন্যই বা তারা কতটুকু কাজ করছে? কতটুকুই বা তাদের সহায়তায় দেশ এগুচ্ছে?

যদিও আমাদের শিক্ষার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নেই; তবু কিছুটা তো আছে, যদিও তা নেহাতই কম এবং এজন্যে বলা হয়, শিক্ষার সাথে বাস্তবতার সামঞ্জস্য নেই। এই বাস্তবতা বা অবাস্তবতার আলোচনার দরকার এখানে নেই। যতটুকু আছে, ততটুকুর ব্যবহার কতখানি হচ্ছে, তা-ই আলোচ্য বিষয়।

গৃহ শিক্ষকতাঃ
আলোচ্য বিষয় তো নির্ধারিত হল, জানা হল- শিক্ষা এখন কাদের প্রাধান্য স্বীকার করে নিয়েছে। এখন দেখতে হবে, ঐ প্রাধান্যকারীরা কেমন করে সেই শিক্ষাটাকে গ্রহণ করছেন?

এখানে স্বচ্ছলতার মানদণ্ডে মানুষ শিক্ষিত হয়। কার স্বচ্ছলতা কতটুকু, তাই-ই বলে দেয়- তার সন্তানেরা কতখানি শিক্ষিত হবে। স্কুলেই ঐ সন্তানের শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটবে, না এগুতে এগুতে শেষ পর্যন্ত কলেজের ছাড়পত্র পাবে, না বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাড়পত্রও নিতে পারবে।

যাক সে কথা। এবার ছাত্রের প্রসঙ্গে আসি, আসি অভিভাবকের প্রসঙ্গে। আজকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা উপাদান হচ্ছে গৃহশিক্ষকতা। আর যেহেতু শিক্ষা স্বচ্ছল পরিবারের জন্য নির্ধারিত, কাজেই প্রত্যেক পরিবারই তাদের সন্তান-সন্ততির জন্য একজন গৃহশিক্ষক রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। সন্তান-সন্ততি তথা ঐ ছাত্র-ছাত্রীরাও আশা করে- একজন গৃহশিক্ষক, যার কাছ থেকে তারা পরিপূর্ণ সহযোগিতা আশা করতে পারবে। সহযোগিতা ওরা ঠিকই পায়, পায় ভালো রেজাল্টেরও নিশ্চয়তা। আর অভিভাবকরাও গর্ব করে বলতে পারেন, আমার ছেলে কিংবা মেয়ে এবার ভাল রেজাল্ট করেছে বা ইত্যাকার অনেক কথা। আর এদেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় যেহেতু রেজাল্টই ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানের মাপকাঠি, তাই ছাত্র-ছাত্রী কতদূর জানলো বা না জানলো, কতটুকু শিখলো বা না শিখলো, তা বিবেচিত হয় ঐ রেজাল্টের মাধ্যমেই। কিন্তু এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা কতখানি, কতখানি ভূমিকা ঐ গৃহ শিক্ষকদের তা দেখার বা জানার আবশ্যকতা কেউ মনে করে না।

অবশ্য এই রেজাল্টই যে সবকিছু না, তা প্রমান করার জন্য এখানে যে বাস্তবতা, তা তো অপেক্ষা করেই আছে। আর যেহেতু বাংলাদেশী মানসিকতা বা অভ্যাস হচ্ছে “ঘোড়া দেখলে খোঁড়া হওয়া” তাই গৃহ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছাত্র-ছাত্রীরাও অনুরূপ ঘোড়া হয়ে যায়, ফলে হোম-টাস্ক থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া মুখস্থ করানোর দায়িত্ব বর্তায় বেচারা গৃহ শিক্ষকের স্কন্ধে। যেহেতু পয়সার জন্য গৃহ শিক্ষকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষা বিক্রি করেন, আর তাদের পড়ানোর সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা, কাজেই তারাও মনে-প্রাণে চেষ্টা করে ঐ ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্ত কাজই করে দেয়ার। আর তাতে যা হবার তাই হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা রেজাল্ট ভালো করে ঠিকই, পাশাপাশি পাকাপোক্ত করে তাদের পরনির্ভরশীলতা। আর শিক্ষাজীবন শেষে যে বাস্তবতা অপেক্ষা করে সেখানে যেহেতু এই গৃহ শিক্ষক নেই, আছে তাদের শেখানো সেই পরনির্ভরশীলতার পাঠ, তাই প্রতি পদে পদে ঐ পরনির্ভরশীলতার জন্য আঘাত খেতে হয়। রেজাল্টে দেখা যায় ভাল, অথচ ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে এসে বিরাট একটা শূন্যকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর যারা ছাত্রাবস্থায় শিখেছে স্বনির্ভরশীলতা, শিখেছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাঠ, তারা রেজাল্ট খারাপ করলেও কর্মজীবনের বাস্তবতায় তারা ভালো রেজাল্টই করে। আঘাত বা ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনাকে এরা হেসেই উড়িয়ে দিতে পারে।

অবশ্য এসব কথা জানা কথাই। নতুন করে বলার আবশ্যকতা নেই। কিন্তু আমরা জানাটাকে অজানা মনে করতেই অভ্যস্ত, অভ্যস্ত চিরাচরিত সনাতন পদ্ধতিতে সামনে এগুতে। আর এতে যে আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের কতখানি ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা একবারও বিচার করে দেখি না। ফলতঃ যা হবার তা-ই হয়, আর আমরা শুধু হা-হুতাশ করেই মরি। অথচ একটু সচেতন হলে, একটু দূর দৃষ্টিসম্পন্ন হলে, আমাদের বংশধরদের এমন অসুবিধায় পড়তে হয় না। অবশ্য গৃহ শিক্ষককে বাদ দেয়ার কথা বলছি না, বলছি তারা ঠিকই শিক্ষা দিক, শিক্ষা দিক ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানোর পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পাঠ। আর অভিভাবকগণ এদিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। নইলে আগামী দিনের সমাজ ব্যবস্থা আরো অধঃপাতে যাবে, আরো পরনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠবে। তখন দেশ বা জাতির উন্নতির আশা হবে সুদূর পরাহত, কেননা এই ছাত্রসমাজই তো আগামী দিনের দেশ ও জাতির বলিষ্ঠ কর্ণধার।

তাই বলতে হয়, আজকের এদেশে বিত্তের মাপকাঠিতে যে শিক্ষা চলছে বা গৃহ শিক্ষকের মাপকাঠিতে যে রেজাল্ট ভাল করানোর প্রয়াস চলছে তাতে শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু ঐ শিক্ষিতরাও পরনির্ভরশীল হয়েই গড়ে উঠছে। আর তাতে দেশ বা জাতি কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা আর নতুন করে বলার আবশ্যকতা রাখে না।

একথা স্বীকৃত সত্য যে- শিক্ষক জ্ঞান দান করতে পারেন না, জ্ঞান স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে পারেন মাত্র এবং এ কাজটা যিনি যত ভালভাবে করতে পারেন- তিনিই তত ভাল শিক্ষক।

পরিশেষে বলি- যে গৃহশিক্ষকতা শুধু পরনির্ভরশীলতার পাঠ দেয়, তা বদল করা হোক। বদল করা হোক, গৃহশিক্ষক কর্তৃক বাধ্যগতভাবে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পরনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার পদ্ধতি। তখন বিত্তের মাপকাঠিতে নয়, বরং ‘শিক্ষা জন্মগত অধিকার’- এই মাপকাঠিতে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যেন সর্বহারা শ্রেণীও আগের মত শিক্ষা-বঞ্চিত না থাকে। কাগজ-কলম-বই ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত গৃহশিক্ষক যে শিক্ষার আবশ্যকীয় কোন উপকরণ নয়, এ ধারণাও সবার মনে বদ্ধমূল হোক। তবেই আগামীর শিক্ষার্থীরা হবে আত্মনির্ভরশীল, সচেতন নাগরিক, জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার যোগ্য যোদ্ধা।

(১৯৮৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার ‘জগন্নাথ হল ট্রাজেডি’ বিশেষ সংখ্যায় মুদ্রিত)