Sun Sun Sun Sun Sun
English

ছাত্রসমাজ ও জাতীয় উন্নয়ন

|| ড. এম হেলাল ||
বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় দাঁড়িয়ে ইতিহাসের শিক্ষা, বর্তমানের বাস্তবতা আর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত মানুষকে আজ এই উপলব্ধি দিয়েছে যে- জনসম্পদ জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। তাই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার পদক্ষেপ এখন দুনিয়া জোড়া। শিক্ষা উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করে তার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়নে গতি সঞ্চার সম্ভব। আর ‘শিক্ষা উন্নয়ন’ ও ‘জাতীয় উন্নয়ন’ এ দু’য়ের মধ্যবর্তী স্তরে প্রধান গতিসঞ্চারক হলো ছাত্রসমাজ।

স্বাধীনতার আড়াই যুগ পরেও ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, কুসংস্কার পীড়িত বাংলাদেশে রাজনৈতিক গলাবাজি, কাল্পনিক সুদিনের স্বপ্নে জাতিকে বিড়ম্বিত করার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হতে পারে, তারা আমাদের ছাত্র সমাজ। তারুণ্যের শক্তি অপ্রতিরোধ্য, অদম্য। তারাই পারে বিপ্লব ঘটাতে, হাসিমুখে প্রাণ দিতে- দেশের জন্য, আদর্শের জন্য। আর সে তারুণ্য যখন হয় শিক্ষালোকে দীপ্ত তখন তার বিচ্ছুরণে আলোকিত হয় চারদিক। অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে যুগে যুগে তরুণরাই এগিয়ে এসেছে। আর তরুণদের মধ্যে ছাত্রসমাজ অধিক শক্তিশালী। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা ও ১১দফা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, নব্বইয়ের গণআন্দোলন প্রভৃতিতে ছাত্র সমাজই ছিল প্রধান গতি সঞ্চারক। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার নয়, ছাত্র সমাজকে হতে হবে জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ার।

দেশোন্নয়নে অবদান রাখতে হলে ছাত্র সমাজকে তাদের প্রধান কাজ শিক্ষা গ্রহণে একান্তভাবে নিমগ্ন হতে হবে, নিজেকে যত বেশি সম্ভব জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের সাজে সজ্জিত করতে হবে। জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ তথা সুশিক্ষার কোন বিকল্প নেই।

কম্পিউটার আর ইন্টারনেট বিপ্লবের এ যুগে ছাত্র সমাজই পারে এ বিপ্লবে সরাসরি অংশ নিতে এবং দেশকে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সুফল দিতে। সাম্প্রতিককালে এদেশের ছাত্ররা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দুনিয়া জোড়া এর যে চাহিদা, আমাদের ছাত্ররা তা পূরণে অংশ নিয়ে আয় করতে পারে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত। ছাত্ররা শিক্ষা জীবনে খুব সহজেই তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারে। দেশকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শক্তিশালী করবে সে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। আজ আমাদের ছাত্রদেরই যখন Online Database তৈরি করতে দেখি তখন গর্ব বোধ হয়। পরিবেশ ও জীবনের মানোন্নয়নে ছাত্ররা এগিয়ে আসতে পারে। ছাত্রদের বসবাস স্থান/বাসস্থান ও পারিপার্শ্বিকতা পরিচ্ছন্ন রাখায় উদ্যোগী হতে হবে। সাম্প্রতিককালে দেশব্যাপী ডেঙ্গু জ্বরের যে আতঙ্ক বিদ্যমান তার বহুলাংশই দূর করা যায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিতকরণের দ্বারা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মধ্যে যদি রুটিন করে তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ভার দেয়া হয় তাহলে তার সুফল হবে সুদূরপ্রসারী।

নিরক্ষরতা আমাদের জাতীয় উন্নয়নের পথে এক বিরাট বাধা। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি ছাত্র যদি অন্তত একজন করে নিরক্ষরকে অক্ষর জ্ঞান দেয় তবে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ছাত্ররা সক্রিয় সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে খাদ্য-বস্ত্র-অর্থ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে তারা রেখেছে বিশেষ ভূমিকা। পরিবেশ রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবেলা, সাধারণ স্বাস্থ্য জ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে ছাত্ররা জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। আজ আমাদের দেশ উন্নয়নের যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে ছাত্রসমাজের আরও সক্রিয়তা বাঞ্চণীয়। ছাত্রদের ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে গঠনমূলক ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে নয়। অথচ আমাদের ছাত্র-সমাজকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে কতিপয় অদূরদর্শী অসৎ ব্যক্তি। এই অদূরদর্শী কুচক্রীদের মধ্যে রয়েছে রাজনীতিবিদ, বিত্তশালী ক্ষমতালোভী জনগোষ্ঠী। কলমের বদলে ছাত্রদের হাতে তুলে দিচ্ছে অস্ত্র। ছাত্রদের পরিণত করছে সন্ত্রাসীতে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত দুই যুগে শত শত ছাত্র রাজনৈতিক কারণে নিহত হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষে নিহতের হারও উদ্বেগজনক, অকালে ঝরে গেছে বহু মূল্যবান প্রাণ। ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদ ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়ার পর বাবা-মা-আত্মীয় স্বজনের সব আশাকে ধুলিস্যাৎ করে অকালে এসব প্রাণ ঝরে যাওয়ার অর্থ জাতীয় সম্পদের বিপুল অপচয়। আজ ছাত্র সমাজকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে, তারা যেন আর রাজনৈতিক শ্রমিক হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের সোচ্চার থাকতে হবে। তাদের প্রতিবাদী শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে কল্যাণকর সংগ্রামে।

আমাদের ছাত্রদের মধ্যে এমন অনেকেই আছে যারা লেখাপড়ার পাশাপাশি উদ্যোগ নেয় নানারূপ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে মাঝারি পর্যায়ের শিল্পোদ্যোগও থাকে। কিন্তু প্রায়শঃই নানারূপ লাল ফিতার দৌরাত্ম্য তাদের সে উদ্যোগের পথে পাহাড় প্রতিম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব বেসরকারি উন্নয়ন ও উদ্যোগে সরকারই সবচেয়ে বড় বাধা এমনকি অনেক সরকারি কর্মকর্তাও মাস্তান-চাঁদাবাজ হিসেবে কাজ করে। আর তখনই হতাশাগ্রস্ত হয়ে অনেক তরুণ বেছে নেয় সন্ত্রাস, রাহাজানি, ছিনতাই -এ সকল পথ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নানা নিয়মকানুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য নয় বরং ছাত্র-তরুণদের হতোদ্যম করে দেবার জন্য। একটি উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে মন্ত্রণালয়গুলো থেকে যত ধরনের অনুসন্ধান (inquiry) করা হয় তাতে অনেক ছাত্র উদ্যোক্তাই হয়ে পড়ে নিরুৎসাহিত। স্বল্প মাত্রার অনুসন্ধানের কারণে কতিপয় ছাত্র উদ্যোগ যদি ব্যর্থও হয় তবু তার আর্থিক ক্ষতি রাঘব বোয়াল ঋণ খেলাপী কর্তৃপক্ষ সাধিত ক্ষতি অপেক্ষা অনেক কম হবে। অথচ ছাত্র-উদ্যোগের সফল রূপদান সম্ভব হলে তা বহু বেকারকে বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত করতে পারে। দেশের অর্থনীতিতেও সঞ্চারিত হতে পারে নতুন গতিধারা। একথা আজ পুরোনো হয়ে গেছে যে, জাতি হিসাবে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই, বিশ্বের বুকে নিজেদের নাম সগৌরবে প্রচার করতে চাই। আজ এ চাওয়া পূরণে সক্রিয় পদক্ষেপ অতি জরুরী। গ্রাম-প্রধান এদেশে গ্রামাঞ্চলের ছাত্ররা তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন ধারায় যুক্ত হতে পারে। উন্নত কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ চর্চায় তারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। ক্ষুদ্র শিল্প যেমন ফলমূল, শাক-সব্জি সংরক্ষণের মত কার্যকরী ও সময়োপযোগী শিল্পোদ্যোগে ছাত্ররা এগিয়ে আসতে পারে। তবে সরকারি সহায়তা এক্ষেত্রে অতীব জরুরী। বিশেষতঃ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে যত্নবান হওয়া দরকার।

বাংলাদেশ আজ সন্ত্রাস নয়- উন্নয়ন চায়, চায় শিল্পের বিকাশ। শিল্পোদ্যোগ ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হওয়ার জন্য ছাত্ররা চায় পৃষ্ঠপোষকতা। এ দাবী আদায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূরীকরণে ছাত্রসমাজ যদি একতাবদ্ধ হয় তবে যত ক্ষমতাধর ব্যক্তিই চেষ্টা করুক ছাত্রদের ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ সচিবালয়ের কোন বাধার প্রাচীর তাদের রুখতে পারবে না। মঙ্গল প্রয়াসে ছাত্ররা ব্রতী হোক, তার সাথে সহায়ক শক্তি হোক সরকার-সুধীজন, তারই সূত্র ধরে সম্মুখে ধাবিত হোক জাতীয় উন্নয়নের ধারা। সুদিন তবে আর বেশি দূরে রইবে না।

(২০০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার জানুয়ারি সংখ্যায় মুদ্রিত)