Sun Sun Sun Sun Sun
English

আঞ্চলিক উন্নয়নে যুবশক্তি

|| ড. এম হেলাল ||
আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোর নিদারুণ দৈন্যদশা সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি অবহিত। তাছাড়া উপর্যপুরি বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের এই অবস্থাকে আরেক বিপজ্জনক পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে জাতিসত্ত্বার বিকাশ সম্ভব নয়; দেশীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও এতে ব্যাহত হতে বাধ্য। বিশ্বের কাছে দেশের সম্মানজনক ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হওয়া স্বাভাবিক। এহেন পরিস্থিতিতে কি করে এ অবস্থার অবসান ঘটানো যায়, সেটাই এখন জাতির সামনে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিশ্বের দরিদ্র দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ একটি অন্যতম দরিদ্র দেশ। এদেশে সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা নতুন করে না বললেও চলে। আরও আছে হাজার হাজার নতুন পুরাতন সমস্যা। কাজেই সীমাবদ্ধ সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে এত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং এতে সমস্যা থেকে নতুন নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই, আমাদের দেশের এই স্থবিরতা নিরসনে বা সমস্যার জট খোলার জন্য যা দরকার, তা হচ্ছে সীমিত সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার।

একথা আমরা জানি, আমাদের দেশে সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও জনসংখ্যার যথেষ্ট প্রাচুর্য রয়েছে। এই জনসংখ্যাকে কাজে লাগাতে হবে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের লক্ষ্যে। যেমন ধরা যাক, একজন শিক্ষিত লোকের দ্বারা একজন নিরক্ষরকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারটা। যিনি শিক্ষিত তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাশ্রমে একজনকে অক্ষর শিক্ষা দিলেন। এক্ষেত্রে নিরক্ষর লোকের স্কুল খরচা বাঁচলো। পাশাপাশি দেশ লাভ করল আরেকজন শিক্ষিতকে। উপরন্তু নিরক্ষর লোকটার জন্য দেশের কোন বাড়তি খরচ যোগাতে হল না, দেশ ঐ খরচ অন্য উন্নয়ন খাতে ব্যবহারের সুযোগ পেল। এতে দেখা যাচ্ছে- যিনি শেখালেন, তিনি নিজেকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছেন, অন্যদিকে দেশের সম্পদের সুষম ব্যবহারেও সহযোগিতা করেছেন। সম্প্রতি দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিষয়ে জাতীয় ইংরেজী দৈনিক ডেইলী নিউজ এর চেয়ারম্যান জনাব মজিবুল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। তিনিও নিরক্ষরতা দূরীকরণ, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধসহ জাতীয় জন গুরুত্বপূর্র্ণ উন্নয়নের (যেখানে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় বাজেটে কোটি কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়) ব্যাপারে এই একই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেন। যাহোক, এমনিভাবে আমাদের দেশের বিভিন্ন পেশার জনগণ যদি পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি এরূপ স্বেচ্ছাশ্রমে অন্যান্য উন্নয়ন ও গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করে তবে তা হবে দেশের কল্যাণের জন্য একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তাতে দেখা যাবে, সামরিক ব্যক্তিরা শুধু দেশ রক্ষা করছেন না, দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও অবদান রাখছেন। একজন ব্যাংকারও শুধু ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন না, দেশ গড়ার অনন্য মহতী উদ্যোগে অংশগ্রহণ করছেন।

এটা সত্য, আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ হচ্ছে ছাত্র ও যুব সমাজ। দেশের অন্যান্য পেশাজীবীদের চেয়ে এরা দেশের বর্তমান দৈন্য অবস্থার জন্য খুব বেশি হতাশাগস্ত। পাশাপাশি এও দেখা যাচ্ছে, এই অবস্থা নিরসনে এরা প্রায় নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু দেশের বর্তমান দৈন্যতা নিরসনে সবার আগে এদেরই জোরালো ভূমিকা পালন প্রয়োজন। কেননা- এরা হচ্ছে সেই শক্তি, যে শক্তি কোন কিছু ভাঙতে বা গড়তে সক্ষম।

এবার আসা যাক, অঞ্চলভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ছাত্র-যুব সম্প্রদায় কোন্ কোন্ ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে, সে প্রসঙ্গে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এক একটি অঞ্চল দেশের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন কোন এলাকা নয়। কোন অঞ্চলের উন্নয়ন সাধিত হলে সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নতিই সাধিত হয়।

আমাদের দেশের বহুবিধ সমস্যা আছে। এ সমস্ত সমস্যা মূলতঃ বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যার সন্নিবেশ মাত্র। অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন কাজ করতে হলে প্রথমে জানা দরকার ঐ অঞ্চলে কি কি সমস্যা রয়েছে। একথা ঠিক, দেশের প্রধান প্রধান অধিকাংশ সমস্যার স্পষ্ট উপস্থিতি যে কোন অঞ্চলেই দেখা যাবে। এছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু পৃথক সমস্যাও আছে। যেমন ধরা যাক, লক্ষ্মীপুর জেলার রহমতখালী বাঁধ একটি সমস্যা। এই বাঁধ সমস্যা এখানে জানমালের দারুণ ক্ষতি করছে। এইভাবে সমস্যা নির্ণয়ের পর নির্ধারণ করতে হবে, কি কি কার্য এখানে পরিচালনা করা দরকার। সমস্যা নির্ণয় ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণের পর এই কার্যপদ্ধতি প্রয়োগের প্রশ্ন আসে। এখন প্রশ্ন, প্রয়োগ করবে কে? অন্যান্য সেক্টরের লোক জনসহ ছাত্র-যুব সম্প্রদায়কেও এই প্রয়োগের ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও স্বেচছামূলক উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া কোন কর্মতৎপরতাই অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ নয়। তাছাড়া ছাত্র-যুব সমাজ এক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করতে পারে, তা আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

এখন দেখা যাক- ছাত্র-যুব সমাজ কিভাবে আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে, সে বিষয়। ছাত্ররা তাদের ছুটির সময় কিংবা অবসর মুহুর্তে নিরক্ষরতা দূরীকরণে মোক্ষম ভূমিকা পালন করতে পারে। ভূমিকা পালন করতে পারে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে জনমত সৃষ্টিতে, আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানের জন্য এলাকার বিশিষ্ট লোকজনসহ স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণে, বন্যা বা দুর্যোগ মোকাবেলায়, গঠনমূলক প্রকাশনার ব্যবস্থা করতে, এলাকায় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণসহ বিবিধ ক্ষেত্রসমূহে। এ ব্যাপারে এদের একক উদ্যোগ যতখানি ফলপ্রসু না হবে, তারচে বেশি ফলপ্রসূ হবে একটি সাংগঠনিক উদ্যোগ। তবে বর্তমানে ষ্ট্যাম্পপ্যাড সর্বস্ব যেসব আঞ্চলিক সংগঠন গড়ে উঠেছে, তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম যেন ঐসব সংগঠনের পর্যায়ে না পড়ে যায়, সে দিকে খেয়াল করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কাজের জন্য সংগঠন, ব্যক্তি স্বার্থের জন্য নয়।

লক্ষ্মীপুর জেলা বাংলাদেশের অবহেলিত একটি জনপদ। প্রকৃতির সযত্নে লালিত উপকূল অঞ্চল লক্ষ্মীপুর আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। অশিক্ষা, দারিদ্র্য, অপুষ্টিসহ এই সব সমস্যা এলাকাবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই অঞ্চলের সার্বিক সমস্যার সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে ছাত্র-যুব সম্প্রদায়ের প্রতি আমার আহবান, আপনারা সর্বাগ্রে এগিয়ে আসুন। এলাকার সমস্যা সমাধানে ব্যাপক হারে স্বেচছামূলকভাবে অংশগ্রহণ করুন। এতে শুধু এলাকার উন্নতি হবে না, গোটা দেশেরও উন্নয়ন সাধিত হবে।

সর্বোপরি, আমি মনে করি- আমাদের মত ও পথের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ প্রশ্নে এই মত ও পথের পার্থক্যকে বিসর্জন দিতে হবে। এজন্য যতটুকু আÍত্যাগ করা দরকার, তা করতে হবে। নইলে জাতিসত্তার বর্তমান দৈন্যদশা কোনদিন ঘুচানো সম্ভব হবে না।

(লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকার জুন ’৯৩ সংখ্যায় মুদ্রিত)