Sun Sun Sun Sun Sun
English

রক্তস্নাত একুশ

|| ড. এম হেলাল ||
শাসক ও শোষকের সুতীব্র হুমকির মুখে একটা বিস্ফোরণ। পরাধীনতার কালো শৃঙ্খল ভাঙ্গার প্রথম আন্দোলন। প্রথম বিদ্রোহ। প্রথম বিপ্লব। কতগুলো তাজা প্রাণের আত্মাহুতি। কিন্তু জাতীয় জীবনে এ চেতনার মূল্য কতটুকু?

পাকিস্তানের সাথে ভাষাগত, আচরণগত বিভেদ আমাদের ছিল। তাই যখন সংখ্যালঘুদের ভাষা ঊর্দূকে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়া হয় তখনই ১৪৪ ধারাকে উপেক্ষা করে ছাত্রজনতা রাজপথে বুকের তাজা তপ্ত রক্ত ঢেলে দিয়ে প্রমাণ করে বাঙালি তথা বাংলাদেশীরা শুধু শান্তিপ্রিয় নয়, এরাও পদ্মা, মেঘনা, কর্ণফুলীর উত্তাল স্রোতের মত উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে। শান্তি ভাঙ্গার হুমকি এলে উদ্যত বুক নিয়ে শোষকের বুলেটকে ফিরিয়েও দিতে জানে। তারপরইতো গণ অভ্যুত্থানের পাশ কাটিয়ে ’৭১ এর রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশে স্বাধীনতা আসে, আসে জাতীয় মুক্তি। কিন্তু জাতীয় সে মুক্তি, দেশের সে স্বাধীনতা আজ কতখানি অর্থবহ! আমাদের এই বাংলাদেশ এখন চরম দারিদ্র্যের মাঝে নিমজ্জিত। এখানে মানুষ না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় চলছে চরম নৈরাজ্য, চরম দৈন্য। অর্থনৈতিক মন্দাভাব, সামাজিক দুর্নীতি আজ তুঙ্গে। আর এদেশের গুটিকতক মানুষ সেই ভাঙা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মেরুদন্ড সেজে প্রতিনিয়ত মানুষকে নিষ্পেষিত করছে। দুর্নীতির অতল গহ্বরে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে। স্বাধীনতার মূল অর্থটা তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

যে একুশ শিখিয়েছিল সংগ্রামের মূলমন্ত্র, জীবন দেয়ার বজ্রকঠিন শপথ; যার ভাষা ছিল মুক্তির স্বোচ্চার উচ্চারণ তাকে কি অবহেলা করা হচ্ছে না? হচ্ছে! ব্যাপকভাবে হচ্ছে। আজ জাতীয় জীবনের এ চরম অপব্যবস্থার জন্য শুধুমাত্র গুটিকয়েক মানুষই দায়ী নয়, দায়ী এদেশের গোটা গোষ্ঠীই। তাদের চেতনা ও দেশপ্রেমের অভাবের জন্য দেশ আজ হুমকির সম্মুখীন; প্রতিমুহূর্তে বাড়ছে সংকট। ১৯৫২ সালের এই একুশে ফেব্রুয়ারিতে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত যে মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিল বাঙালি তথা বাংলাদেশীদের শৈর্য্য আছে, বুকের তাজা রক্ত তারাও ঢেলে দিতে পারে দাবি আদায়ের প্রত্যয়ে সে চেতনার অবমূল্যায়ন কি এখনও আমরা করছি না? অবশ্যই করছি। সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে প্রকাশ, ‘আজ ইংরেজি-বাংলার মিশ্রণে অফিস আদালতে এক জগদ্দল অবস্থা।’ হতে পারে ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা, বিদেশি ব্যাপারগুলো না হয় ইংরেজিতেই সমাধা করা উচিত, আমাদের মত একটা স্বল্পোন্নত দেশের জন্য। কেননা এদেশকে বিদেশি সাহায্য এবং সহযোগিতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশীয় ব্যাপারগুলো যা বিদেশের সাথে যুক্ত নয় এবং যুক্ত হওয়ার প্রশ্নও যেখানে আবদ্ধ সেখানে কেন ইংরেজি এবং বাংলার এ তীব্র মিশ্রণ মানসিকতা? একটা চিঠিতে দেখা যাচ্ছে বাংলায় প্যাডটা ছাপানো হলেও তাতে ইংরেজি লেখা, আবার ইংরেজিতে চিঠি লেখা হলেও তাতে সই বাংলায়। এরকম জগদ্দল অবস্থা আর কতদিন চলবে? এমন অবস্থা কি জাতীয় চেতনার অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছে না? দেশ আজ স্বাধীন, এখন স্বজাতির স্বভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিঘ্নতা কোথায়? কেন এত গড়িমসি?

আজ দেশের চরম দুর্দশা, চরম দৈন্যতা জনমনকে হতাশাগ্রস্ত করছে; জাতীয় চেতনার অবমূল্যায়ন ঘটছে। সর্বোপরি বাংলা ভাষাকে অবহেলার বিষবাষ্পে ঘৃণিত করে রাখা হয়েছে। তাহলে এদেশের স্বাধীনতার মূল্য কতখানি? এদেশে ভাষা আন্দোলনই বা কতটুকু গুরুত্ব বহন করে আসছে?

এককথায় উত্তর দেয়া যায়, এদেশের স্বাধীনতা কাগজে কলমে, এদেশের ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব কেবল ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ পালনের মাঝে। কিন্তু আমাদের কি উচিত নয়, চেতনার এই ‘একুশ’ এই ‘স্বাধীনতা’কে প্রয়োগ করা? অবশ্যই। তাই আসুন, মহান একুশের রক্তঝরা দিনকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যম, নতুন চেষ্টা নিয়ে বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যাই। একুশের রক্ত শপথের মধ্য দিয়ে আসা স্বাধীনতাকে বহুলাংশে অর্থবহ করে তুলি।

(১৯৯১ সালে লক্ষ্মীপুর বার্তা পত্রিকার ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় মুদ্রিত)