Sun Sun Sun Sun Sun
English

বিবর্তনের আলোয় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা

|| ড. এম হেলাল ||
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পাশাপাশি আর যেসব মৌলিক মানবিক প্রয়োজন রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা। তদ্রুপ, বর্তমান সভ্যতায় শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাথে একথাও স্বীকার করতে হয়, বর্তমান সভ্যতার জন্মদাতা শিক্ষাই বটে।

তাইতো প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি মানুষ শিক্ষাকে যথেষ্ট মূল্য দিয়ে আসছে। শিক্ষার বিকাশে নানাভাবে তারা গর্বিত ভূমিকা পালন করছে। জ্ঞান তাপস প্লেটো একসময় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একাডেমী। প্রাচীন ভারতবর্ষেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তক্ষশীলা ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। তখনকার সময়ে এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধ্যাত্মিক বিষয়-আশয়ের শিক্ষাদানই প্রাধান্য পেত। আমরা যদি প্লেটোর একাডেমীর স্তর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস ঘাটি তাহলে দেখতে পাব, এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার নিয়ে মধ্যযুগীয় ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হতে কেটে গেছে প্রায় দেড় হাজার বছর। পরবর্তীতে পূর্বতন সূত্র ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, প্রকৃতির বদল হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়াসহ তাদের আকৃতি, প্রকৃতি ও আদর্শের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিবর্তন লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে।

পাশাপাশি প্রাথমিক স্তরে আধ্যাত্মিক বিষয়-আশয়কে প্রাধান্য দিলেও, পরবর্তীতে সে ধারা অব্যাহত থাকেনি। পরে শিক্ষা হয়ে উঠেছে অধিকতর জাগতিক এবং শেষ পর্যায়ে দেখা গেছে, শিক্ষা পুরোপুরি যুক্তিবাদী আদর্শে প্রভাবিত হয়েছে ও বর্তমানে তাতে সমস্ত কিছুর সংমিশ্রণ ঘটেছে।

আর আমাদের উপমহাদেশের বেলায় দেখা যায়, নালন্দা ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় কোন প্রাচীন আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারপর দীর্ঘদিন শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন সাধিত হয়নি। এমনকি এক পর্যায়ে দেখা যায়, দু’টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাও অনেকখানি ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট। অবশ্য এও ঠিক তখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষার প্রচলন কমে গেলেও, সামাজিকভাবে শিক্ষা-দীক্ষার ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছিল। এদেশের লোকজন ঘরে বসেই ধর্মীয় পুস্তিকাদি পাঠ করা শিখে নিত। বলাবাহুল্য, এদেশের লোকজন বহু পূর্ব থেকেই ধর্মভীরু এবং তাই পাঠ্য বিষয়-আশয়ের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষাই প্রাধ্যান্য পেত। এসময়ে টোলেরও প্রচলন হয়েছিল। টোল ছিল এক ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোন বিদ্বান ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগে এটি পরিচালনা করা হত, এর ছাত্রসংখ্যাও অনেকটা ঐ ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ প্রতিষ্ঠানে ঐ ব্যক্তিই শিক্ষা দিতেন এবং প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদিগকে আবাসিক ও আহারাদির সুবিধা দেয়া হত। এখানে ছাত্র-ছাত্রীরা সাধারণত ব্যাকরণ, কাব্য, অংক, আয়ুর্বেদ, জ্যোতিষশাস্ত্র, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়সমূহে শিক্ষালাভ করত। এদেশে ইংরেজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও এ ধরনের টোলের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়।

নালন্দা ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে আমাদের উপমহাদেশে যে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেটি ছিল কলিকাতা মাদ্রাসা। ১৭৮১ সালে ইংরেজ কোম্পানি এটি প্রতিষ্ঠা করে। ক্রমে আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৭৯২ সালে বারানসী সংস্কৃত কলেজ এবং ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মূলতঃ তখন থেকেই এদেশীয় শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এদেশীয় জনগণও প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার সাথে পরিচিত হয়ে ওঠে। বলাবাহুল্য, এক্ষেত্রে ইংরেজদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। বলা আবশ্যক, ইংরেজরা বিনা স্বার্থে এই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি বা এদেশীয় লোকজনদেরকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা, শিক্ষা-দীক্ষা, কৃষ্টি-সভ্যতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। ইংরেজ কোম্পানি তাদের প্রশাসনিক কার্যে সাহায্য সহযোগিতা লাভের আশায় এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে তখন যে সাড়া পড়ে, তা কম উৎসাহব্যঞ্জক নয়। এতে ইংরেজদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি হিতে বিপরীতও হয়ে যায়। কারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে জাতীয়তাবোধের বিকাশ লাভ ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত ইংরেজদের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এদেশে তক্ষশীলা ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর শেষ পর্যন্ত ১৮৫৭ সালের দিকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন দেখা যায়, শুধু সরকারি উদ্যোগেই নয়, বেসরকারি উদ্যোগেও নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু করেছে। আমাদের এই বাংলাদেশে ১৯২১ সালের দিকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন উপমহাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

নানা প্রতিকূলতা ও আন্দোলনের মুখে ইংরেজরা ক্ষমতা ত্যাগ করলে দেখা যায়, ভারত সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত। সে সময় আজকের বাংলাদেশে ডিগ্রি কলেজ ছিল চব্বিশটি ও বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটি। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের সময় দেখা যায়, এদেশে মোট ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ও আটচল্লিশটি ডিগ্রি কলেজ রয়েছে। অর্থাৎ একেবারে কম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করিনি।

অবশ্য এও ঠিক, এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে যেমন সরকারি তৎপরতা ছিল তেমন বেসরকারি প্রচেষ্টারও দরকার হয়েছে। এমনকি, নানা দাবি ও আন্দোলনের মুখে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেকটি গড়ে তুলতে হয়েছে বলে জানা যায়। ইংরেজরা যখন এদেশে আসে, ক্ষমতা দখল ক’রে নিজেরাই শাসন প্রতিষ্ঠা করে, তখন এদেশে টোল ছাড়া তেমন কিছু ছিল না, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি ছিল অস্পষ্ট। এখন সেখানে এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তা সত্যি গর্বের। তবুও আমাদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা আছে। অবশ্য স্বাধীনতা লাভের পর বিভিন্ন সরকার এই স্বল্পতা কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পারেনি, তা বলার দরকার হয় না। বর্তমানে সে ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দু’টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর একটি খুলনায়, অন্যটি সিলেটে।

কাজেই নালন্দা ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে এদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যাত্রা হাটি হাটি পা পা করে হলেও টোল পর্যন্ত গিয়ে থেমে থাকেনি। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে এদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে মস্ত বিপ্লব সাধিত হয়ে গেছে। এখানে উল্লেখ্য, টোল ছাড়া এদেশে সেই মধ্যযুগের রাজন্যবর্গের জনহিতকর কার্য হিসেবে দু’চারটে স্কুল ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেমন মোঘল রাজ দরবারে ভাষা ছিল ফার্সী, তাই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফার্সী ভাষা শিক্ষা দেয়া হত। তবে টোলের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে যতখানি জানা যায়, তখনকার প্রতিষ্ঠিত স্কুল মাদ্রাসা সম্পর্কে ততখানি পরিষ্কার ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ইতিহাস বেশ নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

তবে এদেশবাসী যে সেই প্রাচীন আমল থেকে শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে, তা আর বিশেষভাবে বলার অবকাশ রাখে না। তাই এক সময় আধ্যাত্মিকতা প্রাধান্য পেলেও, পরে অন্যান্য দেশের মত এদেশের শিক্ষায়ও জাগতিক বিষয় আশয় প্রাধান্য লাভ করেছে। শেষ নাগাদ দেখা গেছে, একসময় শিক্ষাক্ষেত্রে যুক্তিবাদী বিষয়সমূহ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশসমূহের মত এখন এদেশের শিক্ষায়ও অবিমিশ্র কোন প্রকৃতি তার পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠিত নেই।

তবে এও ঠিক, প্রতিটি দেশের শিক্ষা দেশীয় ভাবধারা থেকে প্রভাবিত হয়, শিক্ষার দ্বারাও দেশ প্রস্তাবিত হয়। আমাদের বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র একটি দেশেও সে ধারার ব্যতিক্রম হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, শিক্ষায় গতি-প্রকৃতি আদর্শ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এ ধারার প্রভাব খুব স্পষ্ট। তদ্রুপভাবে, শিক্ষাই এদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব ঘটিয়েছে। অর্থাৎ ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব যে ভূমিকা পালন করেছিল, আমাদের দেশে শিক্ষাকে সেই একই ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। তবে অন্যান্য দেশ থেকে আমাদের শিক্ষার ব্যতিক্রম এই, আমাদের শিক্ষা আমাদের মাঝে যে জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ ফল আমরা লাভ করতে সমর্থ হয়েছি। আমাদের দেশ দুই দুইবার স্বাধীনতা লাভ করেছে এই জাতীয়তাবোধের জন্য।

কাজেই আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেমন বিবর্তন হয়েছে সঙ্গী, তেমন শিক্ষার ক্ষেত্রে বিবর্তনই হয়েছে সহচর। আর আমরাও সেই পথ ধরে আজকের সভ্যতার মাঝে প্রবেশ করেছি বা করছি। এজন্য অনেক চড়াই উৎরাই পার হওয়ার দরকার পড়েছে, আমরাও তা অতিক্রম করেছি দীর্ঘ সফরে, অক্লান্ত পরিশ্রমে।

(১৯৮৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার মে-জুলাই সংখ্যায় মুদ্রিত)