Sun Sun Sun Sun Sun
English

স্কুলে ভর্তি পদ্ধতি লটারিভিত্তিক নয়, এলাকাভিত্তিক করুন

|| ড. এম হেলাল ||
পত্রিকান্তরে দেখলাম, শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত ভিকারুননিসা নূন স্কুলে এখন থেকে শিশুভর্তি করা হবে লটারির ভিত্তিতে। ‘ভর্তির লটারি’ শীর্ষক সে নিউজ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামের শীর্ষে স্থান পায়। পরদিন আবার দেখলাম, অন্যসব স্কুলও ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি-পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে।

শিক্ষা পদ্ধতি ও ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে এদেশে পরীক্ষা-নীরিক্ষার অন্ত নেই। শিশু-কিশোর-তরুণরা এমনকি জনগণও তাদের নেতা-নেত্রীদের বিভিন্ন experiment বা পরীক্ষা-নীরিক্ষার গিনিপিগ হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। শত শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত বাঙালি জাতি স্বাধীনতার ৪০ বছরেও শিক্ষাসহ বহুক্ষেত্রেই তাদের নীতি-পদ্ধতি বা system নির্ধারণ করতে পারেনি। স্বাধীন সার্বভৌম অবস্থায়ও এদেশের সামরিক এবং গণতান্ত্রিক বিভিন্ন সরকার ব্যক্তি-চিন্তা ও দলীয় দৃষ্টিকোণে যে নীতি-পদ্ধতি ও কৌশল গ্রহণ করে, পরবর্তী সরকার এসে তা বাতিল বা পরিবর্তন করে ফেলে। জাতীয় নীতি ও পদ্ধতির পরিবর্তন-সংস্কৃতির এ প্রতিযোগিতা বিশ্ববাসীর হাসির খোরাক যোগালেও এখানকার হতাশ জনমনে তার ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া এখন আর তেমন পরিলক্ষিত হয় না। তাই actual & accurate system বা প্রকৃত পদ্ধতির স্বাদ ও আস্বাদন বাঙালির নিকট এখনো সুদূরপরাহত। এ যেন ইংরেজ বেনিয়া শাসকদের সে উক্তির বাস্তব অনুরণন- The Bengalese can’t manage themselves.

বিদুষী ও দক্ষ প্রশাসক অধ্যক্ষা হামিদা আলী তাঁর জীবনের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য উৎসর্গ করে ভিকারুননিসা স্কুলকে একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর সৃজনশীল চিন্তা-চেতনার কারুকাজ হিসেবে শিশুপাঠ থেকে প্রাইমারী, প্রাইমারী থেকে হায়ার সেকেন্ডারী পর্যন্ত আদর্শ শিক্ষায়তন হিসেবে এটি সগৌরবে ও বিরল স্বাতন্ত্র্যে উন্নত নারীশিক্ষা দিয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী-নেতৃত্ব তৈরি করছিল। এজন্য তাঁকে ধৈর্যের বাঁধ তৈরির পাশাপাশি নানা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে হয়েছে। সিদ্ধেশ্বরীর মূল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জোয়ার ঠেকাতে প্রতিষ্ঠিত হয় বসুন্ধরা ক্যাম্পাস, ধানমন্ডি ক্যাম্পাস, আজিমপুর ক্যাম্পাস। কিন্তু এ বিদ্যায়তনকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নীতকরণের পর্বে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে তিনি আর টিকে থাকতে পারেননি। শিক্ষার শীর্ষ পর্যায়ে অবদান রাখার স্বমহিমা ও কারিগরির মাধুর্য থেকে তাঁকে ছিটকে পড়তে হয়; ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় শিক্ষা-নিবেদিত একটি প্রাণ। কিন্তু ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। তাই ভিন্ন মতাবলম্বী শিক্ষানুরাগীরা হামিদা আলীকে প্রাণীত করেন শূন্য থেকে গড়ে তুলতে আরেক প্রতিষ্ঠান, সাউথ পয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজ। দক্ষ এ শিক্ষা কারিগর ও মহিয়সী নারী তাঁর সেই ভগ্ন হৃদয়ের উদার ছোঁয়ায় মাত্র ৩/৪ বছরের ব্যবধানে গুলশান কেন্দ্র থেকে মহানগরীর বিভিন্ন প্রান্তে এ শিক্ষায়তনের শাখা বিস্তারে সক্ষম হন। প্রতিষ্ঠিত হয় নিকেতন শাখা, মালিবাগ শাখা।

ওদিকে তাঁর যৌবন-জীবন বাজি রেখে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসার সিস্টেম ভেঙ্গে ভেঙ্গে একে বিশেষত্বের সারি থেকে নামিয়ে এতই সাধারণ করা হচ্ছে যে, এ স্কুলে এখন নাকি ভর্তি হবে লটারির ভিত্তিতে। এটি আসলে সিস্টেম ভাঙ্গা নয়; বরং মন ভাঙ্গা, চিন্তা ভাঙ্গা।

শিশু শিক্ষায় ভ্রান্ত পদ্ধতিই তৈরি করছে সামাজিক ব্যাধি
মনন ও চিন্তার ভুবনে ভাঙ্গন ধরাতে ধরাতে তথা হৃদয় খণ্ডিত করতে করতে এখন আমরা হৃদয়হারা হয়ে গেছি। এরপর হৃদয়হরী হয়ে জীবনহরীর অভিযানে নেমেছি। আর তাইতো এখন শিক্ষা ও আদর্শ ছেড়ে ভগ্নি ও ভাগ্নীতুল্যদের অপমান করে মেরে ফেলছি। কল্যাণকামী মুরব্বীয়ানরা ইভটিজিং নামীয় সে অবক্ষয় ও ব্যাধির প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে বেশ সুনামও কুড়াচ্ছেন। কিন্তু ইভটিজিং প্রতিরোধ আন্দোলন যত তীব্র হচ্ছে, টিজিংপ্রিয় তারুণ্যের গতিও যেন তত তীব্রতর হচ্ছে। ফলে ২০১০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের পত্র-পত্রিকার পাতায় পাতায় টিজিং সম্পর্কিত যত ঘটনা-রটনা-হত্যা-আত্মহত্যার মত নেতিবাচক বিষয় দেখা যাচ্ছে, ২০০৯ সালের একই সময়ে সে সংখ্যা তার অর্ধেক এবং ২০০৮ সালে তারও অর্ধেক ঘটনা সম্পর্কে ছাত্র-তরুণরা অভিজ্ঞ বা experienced ছিল তথা তাদের মস্তিষ্কে বা ধারণায় ছিল। এ কারণেই হয়ত খোদ ভূমি প্রতিমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেছেন- ইভ টিজিং কালে কালে ছিল, আছে; কিন্তু এখন বেড়েছে মিডিয়ার কল্যাণে।

ইভ টিজিংয়ের ওপর সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ বা concentration হতে দেখে সুবোধ বালকটিও এখন টিজার হয়ে উঠছে, টিজিং হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য ও সংক্রমিত মহামারীরূপে; তৈরি করছে জাতীয় সমস্যার ইস্যু। ক্লাসে যে অর্ধেক শিক্ষার্থী অনুপস্থিত রয়েছে, কেবল তাদের নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকদের হা-পিত্তেশ, মাতামাতি ও মনোযোগ দেখে ক্লাসে উপস্থিতরাও ক্রমান্বয়ে অনুপস্থিতির খাতায় নাম লেখাতে থাকবে -এটি কিশোর মনস্তত্ত্বের বৈশিষ্ট্য। গ্লাসের যে অর্ধেক অংশ খালি, সেদিকে কম তাকিয়ে যে অর্ধেকে পানি আছে, সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলে তাতে খালি অংশ ভরাটের সুযোগ তৈরি হয় -এ common psychology এবং power of positive thinking বিদ্যার কথা আমরা সবাই ভুলে বসলে কি চলবে? টিজিং কি নেগেটিভ না পজিটিভ জিনিস, কোমল ও সুবোধ প্রাণগুলো তা না বুঝে টিজিংকে গ্রহণ করছে -popular idea; এ idea সংক্রমণের জন্য আমাদের টিজিং-বিরোধীদের strategy-ই কি দায়ী নয়? এ যেন ‘পাগলা, সাঁকো নাড়িস না’ প্রবাদের ন্যায়।

গ্লাসের খালি অংশ পছন্দ না করলে তা যেমন পানি দিয়ে ভরতে হয়, তেমনি টিজিংয়ের ন্যায় কুকর্ম ও কুচিন্তা দূর করতে হলে তরুণদের মাঝে ভাল কথা-চিন্তা-কর্মের সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। তাহলেই কেবল টিজিং ও মাদকসহ সকল সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব। বড়দের mis-strategy ও mis-handling -এর কারণেই কিন্তু যুব-অবক্ষয় বৃদ্ধি পেতে পারে।

টিজিংয়ের মত নেগেটিভ বিষয়কে স্লোগানে-বক্তৃতায় বা প্রচার-প্রপাগান্ডায় না এনে তৎপরিবর্তে পারিবারিক ভালবাসা আন্দোলনে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও জাগ্রত করলে দ্রুত সুফল মিলত বলে আমার বিশ্বাস। ক্যাম্পাস’র শিক্ষানবিশ কার্যক্রম এবং ‘প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড’ -এর ওপর নিয়মিত সেমিনার দেখে অনুরূপ সুফল সম্পর্কে বহু সুধীজন তাঁদের মত প্রকাশ করেছেন। যে চিন্তা-চেতনা থেকে টিজিংয়ের উৎপত্তি, সেই চিন্তার সূত্রপাত তথা Primary brain programming হয় পরিবারে, যে প্রোগ্রামিংয়ের এডভান্সড্ লার্নিং হয় শিক্ষায়তনে এবং শেষতক তা বদ্ধমূল হয় তার আশপাশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আচার-আচরণের প্রভাবে। তাই পরিবারে-ক্লাসে-ক্লাবে-পাড়ায়-মহল্লায়, অফিস-আদালতে নেতিবাচক কথা-চিন্তা-কর্ম পরিহার এবং তদস্থলে ইতিবাচক চিন্তা ও কর্মের উদ্যোগ যত দ্রুত গৃহীত হবে, তত দ্রুতই টিজিংসহ সকল শিশু-কিশোর অপরাধ হ্রাস পাবে। আর সে উদ্যোগের বাস্তবায়ন যতদিন পর নিশ্চিত হবে, ততদিন পরই বন্ধ হবে টিজিংসহ সকল সামাজিক ব্যাধি। ১৫ কোটি জনসংখ্যার এদেশ থেকে ১৫জন ভাল মানুষ খুঁজে বের করতে হিমশিম খাচ্ছে যে ছাত্র-যুবক, যার সম্মুখে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব বা চরিত্রের বড় অভাব, নেই রোল মডেল বা আদর্শ পুরুষ - সেই ছাত্র-তরুণদের কাছ থেকে টিজিং ছাড়া আর কি মহত্ব আশা করা যায়?

আসলে টিজিং-বিরোধীরা তথা এই আমরা সবাই যাচ্ছি কোথায়, যাব কোথায় অথবা কোন্ পথ ও পদ্ধতি আমাদের জন্য সুগম ও সঠিক - এ নিয়ে নিরাপদ ও উদার আলোচনা বা গবেষণার সুযোগ আছে কি, এ বাংলার মাটিতে? সত্যিকথা বললেতো আবার নিরাপদ দূরত্ব থেকে এ কলমের প্রতি নিক্ষিপ্ত হবে লাঠি-গুলি। তাই ভাসানী নানার সে ‘হক কথা’ অথবা অযোগ্য এ নাতির সোজা কথা রেখে সত্য কথার আশপাশে ঘুরঘুর করি।

ভিকারুননিসা স্কুলে শিশুভর্তি লটারিভিত্তিক নয়, এলাকাভিত্তিক হওয়া উচিত এবং তা জরুরিও বটে। কারণ উন্মুক্ত লটারির ভিত্তিতে ভর্তি হলে এ স্কুলের সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসের আশপাশের শিশুদেরকে বারিধারা ক্যাম্পাসে গিয়ে এবং বারিধারা ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী শিশুদেরকে সিদ্ধেশ্বরী বা অন্যত্র বহুদূর গিয়ে ক্লাস করতে হবে। এতে বহুদিকেই তাদের অপূরণীয় ক্ষতি করা হবে। অপরদিকে অন্য সবার ক্ষতিও কম হবে না; অর্থনাশ-যানজট-সময়জটসহ বহু বহু জট বেড়ে যাবে।

স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে তথা জীবনের শুরুতেই শিশুদেরকে মেধা ও সৃজনশীলতার খেলা শেখার পথ থেকে সরিয়ে কি কারণে যে লটারি বা প্রকারান্তরে জুয়া খেলা শেখানো হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। লটারির খেলাতো স্বাভাবিক বা সাধারণ খেলা নয়। অনন্যোপায় হয়ে তথা অন্যকোন উপায় না থাকলে সেক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে বেছে নিতে হয় লটারির খেলা। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে জীবনের শুরুতেই লটারির মত অস্বাভাবিক খেলাকে বাধ্য করে দেয়া একেবারেই অনুচিত। এমনকি মেধা বাদ দিয়ে যদি লটারির খেলা কোমলমতি শিশুদেরকে শিখতেই হয়, তাহলেও তা স্ব স্ব এলাকার শিশুদের সাথেই তারা খেলবে এবং তা খেলবে সন্নিকটস্থ স্কুল ক্যাম্পাসেই; দূরবর্তী স্কুলে গিয়ে নয়। বারিধারার শিশুরা ভিকারুননিসা স্কুলের ধানমন্ডি শাখার লটারিতে যাবে না, অথবা ধানমন্ডির শিশুরা বারিধারা বা সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসে লটারি খেলবে না। অর্থাৎ যার বাসা-বাড়ি স্কুলের যত কাছে, ভর্তির ক্ষেত্রেও নিকটস্থ স্কুলে তার তত অগ্রাধিকার থাকা উচিত।

কোন বিশেষ কারণে যদি লটারির ভিত্তিতে শিশুকে স্কুলে ভর্তি করতেই হয়, তাহলে তাও এলাকাভিত্তিকই করতে হবে। এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের মাধ্যমে সময়-শ্রম ও অর্থের অপচয় বন্ধ হবে; অন্যদিকে বাবা-মা’র প্রতিদিনের টেনশন কমবে, গাড়ি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি কিংবা হৈ-হুল্লোড় থাকবে না, রাস্তায় যানজট ও দুর্ঘটনা কমবে; তাছাড়া তেল ও গাড়ি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও খাতে জাতীয় অপচয় বন্ধ হবে।

তাই সদাশয় সরকার ও সকল নীতি নির্ধারকের প্রতি সনির্বন্ধ আহ্বান- আসুন, জাতীয় সমৃদ্ধির ঝান্ডা উড্ডীন করতে এবং ড্রপআউট ও শ্রেণীবৈষম্য হ্রাসসহ জাতীয় বহু সমস্যার একক ও আশু সমাধানের লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেলকে (www.helal.net.bd/bangla/model.php)বাস্তবে রূপ দেই।

এলাকাভিত্তিক স্কুলিং হলে দেশ ও জাতি লাভবান হবে যেভাবে-
১। স্কুলে যাতায়াতের জন্য যানবাহনের দরকার হবে না; ফলে যানজট থাকবে না, সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে;
২। জাতীয় ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল আমদানি ও গ্যাসের অপচয় রোধ হবে; বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং জাতীয় অর্থের অপচয় কমবে;
৩। যাতায়াত সঙ্কট ও যাতায়াত ব্যয় থাকবে না বলে এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পেছনে অভিভাবকের টেনশন থাকবে না এবং অর্থব্যয় হবে না;
৪। সন্তানের জন্য বাবা-মা’র অফিসের গাড়ি বরাদ্দের দুর্নীতি বন্ধ হবে;
৫। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শ্রম ও সময়ের অপচয় রোধ হবে;
৬। সন্তানের স্বার্থেই অভিভাবকগণ নিজ এলাকার স্কুলের উন্নয়নে তৎপর হবেন; সন্তানকে অন্য শহরে বা বিদেশে পাঠাতে হবে না;
৭। ভর্তি-প্রতিযোগিতা না থাকায় ভর্তি-দুর্নীতি দানা বাঁধবে না;
৮। স্কুল পর্যায়ে কোচিং-ব্যবসা ও শিক্ষা-বাণিজ্য বন্ধ হবে;
৯। কোচিং দরকার হবে না বিধায় এক্ষেত্রেও যাতায়াত বন্ধ হবে এবং যানজট থাকবে না;
১০। ড্রপ-আউট থাকবে না; ফলে টিজিং ও মাদকসহ কিশোর অপরাধ হ্রাস পাবে;
১১। মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে; শিশু-কিশোর বয়সেই শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, মূল্যবোধ, টিম-স্পিরিট, শেয়ারিং, স্মার্টনেস ইত্যাকার শিক্ষালাভ সহজ হবে;
১২। শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভাজন হ্রাসের ফলে সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য হ্রাস পাবে;
১৩।সামগ্রিকভাবে স্কুলে শিক্ষার মান ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে;
১৪। শিশুর জন্ম ও ক্রমবৃদ্ধির সঠিক ও যথাযথ পরিসংখ্যান রাখা সম্ভব হবে;
১৫।মেধাবী ও প্রতিভাবান জাতি এবং জ্ঞানভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন সহজ হবে।

এলাকাভিত্তিক ও আধুনিক স্কুলিং ব্যবস্থা আমাদের জাতীয় বহু সমস্যার সমাধান এনে দেবে; আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যাবে অর্থনৈতিক নানা সমস্যার; শক্তভাবে গড়ে উঠবে গুণগত শিক্ষার প্রাথমিক ভিত, সহায়ক হবে উন্নততর ও কার্যকর উচ্চশিক্ষা কাঠামো নির্মাণে; বর্তমান বিভাজিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে যে বিভক্ত করে ফেলছে, তা থেকেও রক্ষা পাবে জাতি; হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর মতো জেএমবি তৈরির সুযোগ থাকবে না শিক্ষাঙ্গনে।

বিদ্যালয়ে শিশুভর্তি সম্পর্কিত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব-নিকাশ এবং সে ক্ষতি থেকে নিষ্কৃতি ও দীর্ঘমেয়াদী লাভের কথা লিখে পাঠিয়েছি মান্যবর সকল মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়কে; শিক্ষানীতি প্রণয়নকারী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদেরও পাঠিয়েছি। আকাশেও ছড়িয়ে রেখেছি সে মডেল (www.helal.net.bd/bangla/model.php)। তাই এর পুনরাবৃত্তি না করে বরং সটকে পড়ি এ লেখা থেকে।

পূবাকাশে কিঞ্চিৎ লালিমা দেখা দিয়েছে, একটু পরই ভোর হবে, তারপর সকাল। সে সকাল থেকে রাত অবধি রাস্তার ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে থেকে অন্যদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানীকৃত তেল পুড়ে পুড়ে আমাকে আরো ভাবতে হবে, কি করলে নেতা-নেত্রীগণকে সে মডেলটিতে একটিবার চোখ বুলাতে বলতে পারি! অথবা তাঁদের কাছে জানতে পারি, কি কি অসুবিধার কারণে দুর্বিষহ যানজটসহ জাতীয় বহু সমস্যার একক সমাধানরূপে এ মডেল সর্বসমক্ষে থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়নে তাঁরা এগিয়ে আসছেন না!

মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, বোমাবাজি, সন্ত্রাস, টিজিং, মাদক, ঘুষ-দুর্নীতি, ছিনতাই ও চুরিসহ সকল অপকর্ম, অপশক্তি ও কুচিন্তার অবসানে প্রয়োজন সুস্থ মনন ও প্রোএকটিভ এটিচিউড - যা কেবল সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকেই আসে। মৌলিক শিক্ষা তথা প্রাথমিক স্কুলিংই সকল শিক্ষা ও জ্ঞানের মূল ভিত্তি। শক্ত ভিত ছাড়া উঁচু ভবন নির্মাণ যেমনি পাগলামীর সামিল, তেমনি আদর্শ প্রাইমারী শিক্ষা ছাড়া উন্নত ও আদর্শ জাতির প্রত্যাশা নির্বুদ্ধিতা মাত্র। দুর্বল ও ঘুণে ধরা প্রাথমিক শিক্ষার ভিত থেকে জাতির কোন সুফল আশা করা যায় না। তাই দেশের উন্নয়ন ও জাতি জাগরণে প্রথম প্রয়োজন স্কুলিংয়ের উন্নয়ন।

মুরগির খাঁচার ন্যায় রিক্সা ভ্যানে বা কাভার্ড ভ্যানে ভরে শিশুকে স্কুলে নেয়া-আনা করালে সে শিশুর কাছ থেকে chicken heart ছাড়া উদার বা বড় কিছু আশা করা যায় না। তাই শিশু মেধার বিকাশ ও লালনকে রাস্তার যানজটে আটকে রেখে, শিশুকে গাড়ির ধোঁয়া ও ধূলিবালি খাইয়ে যে শিশুস্বাস্থ্য ও শিশুমেধা বিনষ্ট করা হচ্ছে এবং জাতির সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, তা রক্ষার্থে এখনই প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক স্কুলিং ব্যবস্থার বাস্তবায়ন।