Sun Sun Sun Sun Sun
English

সাহসী ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতারূপে
শিশু-কিশোরদের গড়ে তুলবেন যেভাবে

|| ড. এম হেলাল ||
শত শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ এবং তৎপরবর্তীতে প্রকৃতি ও মনুষ্য-সৃষ্ট দুর্যোগ ও দুর্গতির কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। সহসাই দ্রুত উন্নয়নের বিষয়ে আশা-ভরসাও পাচ্ছেন না অনেকে। এর কারণ দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির করালগ্রাস, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রকট অভাব, খাদ্যে ভেজাল ও বিষ প্রয়োগে জাতীয় স্বাস্থ্যহানি, মৌলিক শিক্ষায় ত্রুটি এবং সর্বোপরি দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের আকাল। জাতীয় ক্ষেত্রে এত্তসব মৌলিক সমস্যার জোড়াতালি সমাধান প্রচেষ্টা বুমেরাং হয়ে প্রকারান্তরে উন্নত বিশ্বের সাথে আমাদের ব্যবধান বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ বিশ্ব যেখানে এগিয়ে, আমরা সেখানে পিছিয়ে। এ অবস্থায় আমাদের প্রধান সম্পদ তথা ১৬ কোটি মস্তিষ্ককে সুচিন্তায় প্রোগ্রামিং করে পারস্পরিক কল্যাণ ও সহযোগিতায় উদ্বুদ্ধ ও নিবেদিত করার কোন বিকল্প নেই।

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যত কান্ডারী বিধায় আজকের শিশুর প্রতিভা বিকাশের ওপর নির্ভর করে দেশ ও জাতির উন্নতি ও অগ্রগতি -যা নিশ্চিত করা সম্ভব অভিভাবকের দূরদর্শী পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার মাধ্যমে। অভিভাবকের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও কৌশল যদি যথার্থ হয় -তাহলে শিশুকে তাঁরা যেভাবে গড়ে তুলতে চান, অবশ্যই সেভাবে বেড়ে উঠবে তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন শিশুটি তথা দেশের ভবিষ্যত কান্ডারী।

Seniors are followed by the Juniors. একথা যদি স্বতঃসিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে পরিবারে-সমাজে বা জাতিতে যুব-তরুণদের বর্তমান অবক্ষয়, ইভটিজিং বা অনুরূপ নেগেটিভ ভূমিকার জন্য তাদের দায়ী করার কোন সুযোগ নেই; বরং এসব অবক্ষয়ের জন্য দায়ী অভিভাবকরা। এ বিষয়ে আমার প্রণীত এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেলেও লিখেছিলাম- ১৬ কোটি মানুষের যে দেশে ১৬ জন অনুকরণীয় মানুষ খুঁজে পাওয়া দুরূহ, সে দেশের ছাত্র-যুবকদের কাছে ইভটিজিং ছাড়া আর কি আশা করা যায়!

জন্মের পর থেকে শিশুর আচার-আচরণ, শিক্ষা, সঙ্গ, খাদ্যাভাস, স্বাস্থ্যাভ্যাস, চিন্তা-চেতনা এমনকি জীবনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সবকিছুই হওয়া উচিত সঠিকতা, পরিমিতি, যৌক্তিকতা ও যথার্থতার মধ্য দিয়ে। পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে অত্যাধুনিক দেশের সুযোগ্য নাগরিক। তাই চৌকস, দেশপ্রেমী, কর্মোদ্যমী, উচ্ছল-উজ্জ্বল-আলোকিত জাতি গঠনের লক্ষ্যে আপনার সন্তানকে শৈশব-কৈশোর থেকেই প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউডে গড়ে তুলুন নিশ্চিতভাবে, যাতে সে হয়ে ওঠে সাহসী ও বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতারূপে। সে লক্ষ্যে তথা প্রতিভাবান জাতি গড়ার মানসে শিশু-কিশোরদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে নিম্নোক্ত কিছু টিপস উপস্থাপিত হল।

পরমাত্মীয় ও সমঝদার পাঠকদের চুপি চুপি বলে রাখছি- এ টিপসগুলো লেখা শুরু করেছিলাম কিন্তু সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টে বসে। সে মুহূর্তে ক্ষণিকের ভাবালুতায় আচ্ছন্ন আমি- কবে দেখবো দু’চোখ ভরে আমার প্রিয় মাতৃভূমে সিঙ্গাপুরী উন্নয়ন-অগ্রগতি অথবা কি শক্ত ভিত তৈরি করলে দশকের ব্যবধানে দেখতে পাব অত্যাধুনিক বাংলাদেশ। তখনকার সে অনুসন্ধানী চেতনায় ধরা দেয় সৃজনশীল এক প্রজন্মের আবশ্যকতা, যে প্রজন্মের এক সুশাসকই বদলে দেবে এ দেশকে এবং বিশ্বশীর্ষ করবে; যেমনি করেছিল কামাল আতাতুর্ক, হো-চি-মিন, মাহাথির মোহাম্মদ প্রমুখ রাষ্ট্রনায়কগণ। আমাদের বাংলাদেশে রাজনীতিকের ছড়াছড়ি থাকলেও অনুরূপ রাষ্ট্রনায়কের বড় অভাব। তাই এ প্রজন্ম এবং অনাগত প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের কল্যাণে তাৎক্ষণিক এ লেখাটির আইডিয়া জাগে।

আসুন, আমাদের সবার জন্ম-জন্মান্তরের সুদীর্ঘ স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দেশমাতৃকার দুঃখ-দৈন্য ঘোচাতে এবং স্বপ্নের সোনার বাংলাকে বাস্তবে রূপ দিতে সোনার সন্তানদেরকে হীরের টুকরোরূপে গড়ে তুলি।

শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল করে গড়ে তোলার উপায়
১। শিশু-কিশোররা সর্বক্ষণ বড়দের মনোযোগ, সহানুভূতি ও ভালবাসা পেতে চায়। They are highly attention seeker. তাই বাচ্চাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং তাদের প্রতি হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করবেন।
২। ছোট্ট শিশুকে যতটা সম্ভব বারংবার কোলে নেবেন, তার সাথে Greetings & Energy exchange করবেন। তাকে বুকে নিয়ে অথবা ভাবাবেগে জড়িয়ে ধরে নিজে অনুভব করবেন যে- তাকে অনেক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আশীর্বাদের ঝুলি দিচ্ছেন; অন্যদিকে আপনিও তার কাছ থেকে নিচ্ছেন সহজ-সরলতা, সবুজতা ও সতেজতার Energy।
৩। মাঝে মাঝেই আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে শিশুদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন; গান শোনাবেন, স্রষ্টার যেকের শোনাবেন ও করাবেন, যেকের করতে করতে ঘুমও পাড়াতে পারেন।
৪। যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন, সন্তানদের সাথে প্রতিদিন কিছুক্ষণের ফ্যামিলি টাইম কাটাবেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাদেরকে কাউন্সেলিং করবেন।
৫। শিশু ঘুমালে তার কাছে-ধারে উচ্চস্বরে কথা বলবেন না; এতে তার স্মৃতিশক্তির ক্ষতি বা মস্তিষ্ক-বিভ্রাট ঘটতে পারে।
৬। শিশু-কিশোররা ভাল কথায় কর্ণপাত না করলে বা অবাধ্য হলে তথা আপনার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে সেইক্ষেত্রে যখন সে ঘুমাবে তখন তার কানের কাছে ভাল কথা, পরামর্শ বা উপদেশ বাণীগুলো আস্তে-ধীরে বলতে থাকবেন। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ আলফা লেভেলে থাকে বলে তখন এরূপ ভাল কথা সে প্রত্যাখানের সুযোগ পাবে না; বরং তা অবচেতন মেমোরিতে গাঁথতে থাকবে। পরে বিটা লেভেলে বা জাগ্রত অবস্থায় আদর করে যখন তা বুঝিয়ে বলবেন, তখন সে সহজেই Accept করে নেবে।
৭। শিশু-কিশোরকে ভাল কাজে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করবেন। কোনক্রমেই তাদের উদ্যম ও ব্যক্তিত্ববোধ নষ্ট করবেন না; বরং সর্বদাই এসব বাড়ানোর পাশাপাশি সাহসী ও ধৈর্যশীল হতে শেখাবেন।
৮। দৈনন্দিন ক্ষেত্রে শিশু যা করতে চায়, তা করার সুযোগ দেবেন; যদি তার চাওয়া অযৌক্তিক বা অসংগত না হয়। এসব ক্ষেত্রে তার Freedom অক্ষুণ্ন রাখতে চেষ্টা করবেন অর্থাৎ শিশুর যৌক্তিক মতামতকে গুরুত্ব দেবেন। পিতা-মাতা বা বড়দের ইচ্ছা যখন-তখন ছোটদের ওপর চাপিয়ে দেয়া সমীচীন নয়।
৯। শিশুদের সাথে বেশি বেশি পজিটিভ কথা বলবেন। কারণ নেগেটিভ কথাবার্তা বললে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়, উদ্যম ও সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। তাই হতাশাব্যঞ্জক কথা শিশুর সামনে বলবেন না।
১০। শিশুদের সাথে মিথ্যা ও কৃত্রিম কথা বলবেন না। তাদেরকেও সত্য বলায় উৎসাহিত এবং মিথ্যা বলায় নিরুৎসাহিত করবেন। তাদের প্রশ্নের উত্তর ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দেবেন না এবং তাদেরকেও সহজ প্রশ্নোত্তরে উৎসাহিত করবেন।
১১। শিশু-কিশোরদেরকে চিন্তার স্বাধীনতা দেবেন এবং চিন্তাশীল করে গড়ে তুলবেন। শিশু কি বলবে, কি খেলবে, কখন খেলবে, কখন পড়বে; কিভাবে কি চিন্তা করবে; ভবিষ্যতে কি হবে; কোন বয়সে, কখন, কার সাথে বন্ধুত্ব বা প্রেম করবে -ইত্যাকার বিষয়ে তার সাথে মাঝে মাঝে বন্ধুর মত আলাপ-আলোচনা করবেন। অর্থাৎ গঠনমূলক চিন্তা-চেতনায় অভ্যস্ত করে তুলবেন।
১২। প্রকৃত, প্রাকৃত ও সত্যানুসন্ধানীরূপে গড়ে উঠতে শিশুকে যেকোন বিষয়ে প্রশ্ন করতে দেবেন। অবশ্যই তার প্রশ্নের উত্তর দেবেন এবং তাকেও প্রশ্ন করে উত্তর বের করবেন। শিশু বলে তার প্রশ্ন কিংবা উত্তরকে অবহেলা, অবজ্ঞা বা অবমূল্যায়ন করবেন না। বরং সম্ভব হলে তার প্রশ্ন বা উত্তর নিয়ে রি-সার্চ করবেন- কেন, কি কারণে বা কি আইডিয়া থেকে তার মাথায় এরূপ প্রশ্ন জাগলো বা উত্তর এলো।
শিশু এবং অভিভাবক সবার ক্ষেত্রেই দার্শনিক জ্যাঁ পল সার্ত্র -এর কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য- ‘অন্বেষণ করো, অনুসন্ধান করো, জানতে চাও, প্রশ্ন করো, প্রশ্নের উত্তর খোঁজো- সত্য বেরিয়ে আসবেই’।
১৩। শিশুকে চোখ বন্ধ করিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন এবং তার চিন্তা থেকে উত্তর বের করার মাধ্যমে মস্তিষ্কের চর্চা করাবেন। তার চোখ বন্ধ করিয়ে বলবেন- তোমার গায়ের জামায় কি রং, কি ফুল বা কি ছবি রয়েছে; তোমার আশপাশের দেয়ালের রং কি; বর্তমান রং পরিবর্তন করে দেয়ালে লাল-সবুজ-হলুদ বা অন্য রং করলে তা কেমন লাগবে; ইত্যাকার নানা বিষয়ে তাকে চিন্তা করানোর মাধ্যমে মস্তিষ্ক চর্চার সুযোগ তৈরি করবেন।
রঙের চর্চায় শিশুর বুদ্ধি বাড়ে, বুদ্ধি ও চিন্তার চর্চায় শিশুর সৃজনশীলতা ও প্রতিভা বৃদ্ধি পায়। এতে ধীরে ধীরে সে অন্যদের তুলনায় আলাদা তথা উন্নততর মানুষ (Superior Human Being) হিসেবে গড়ে উঠতে থাকবে।
১৪। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের মতামত নেয়ার চেষ্টা করবেন। আপনার পোশাক বা পরিধেয় নির্বাচনে যেমন, শার্ট-স্যুট-টাই প্রভৃতির ম্যাচিংয়ে তার Choice বা মতামত নিতে পারেন। এভাবে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে মতামত দানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে Involved রাখলে তার পছন্দ-অপছন্দ, রুচিবোধ, মতামত প্রদানের ক্ষমতা বাড়বে; এতে তার উৎসাহ-উদ্দীপনা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, নিজস্ব ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে।
১৫। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছেলে-মেয়ে ভেদাভেদ করে ছেলেকে অগ্রাধিকার দিলে মেয়েশিশু হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে, যা তার সৃজনশীলতা বিকাশে অন্তরায়। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক -উপযুক্ত পরিচর্যা, সঠিক মূল্যায়ন ও সহযোগিতা পেলে কন্যাশিশুটিও হতে পারে মাদার তেরেসা, ইন্দিরা গান্ধী, হিলারি ক্লিনটন কিংবা তাঁদের চেয়েও বিখ্যাত।
১৬। অন্য শিশুর সাথে আপনার শিশুর তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক হবেন। তার আত্মবিশ্বাস কমতে পারে, এমন তুলনা একদম করবেন না। তবে অনুপ্রেরণা, অনুরাগ বা উচ্চাকাঙ্খা জন্মানোর মত বিষয়ে অন্যের উদাহরণ টানতে পারেন।
১৭। অন্যকে সাহায্য করতে শেখাবেন; অন্যের অধিকার রক্ষার চেতনায় উদ্বুব্ধ করবেন। পরচর্চা ও পরনিন্দায় বাধা দেবেন। ছোটবেলা থেকে এরূপ সুচিন্তা ও সুঅভ্যাস গড়ে তুললে পরবর্তী জীবনে ভাল মানুষ হবার পথ সহজ হয়ে যায়।
১৮। অন্যের মঙ্গল কামনায় উদ্বুদ্ধ করবেন এবং সে অভ্যাস শুরু করাবেন ফ্যামিলি মেম্বারদের কল্যাণ-কামনা ও চর্চার মাধ্যমে। বড় বাচ্চাকে বলবেন ছোট বাচ্চার পরীক্ষায় ভাল ফলের জন্য wish করতে, ছোট বাচ্চাকে বলবেন বড় বাচ্চার জন্য অনুরূপ করতে। অন্যের জন্য wish করলে যে নিজের মঙ্গল হয়ে যায়, অন্যের মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে গেলে যে নিজের মঙ্গল প্রদীপ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জ্বলে ওঠে -এরূপ শিক্ষা ও চেতনা শিশুকাল থেকেই তার মধ্যে সঞ্চারের চেষ্টা করবেন।
১৯। অন্যকে সালাম দেয়া, Thanks বলা এবং নিজ ভুল-ত্রুটির জন্য Sorry বলতে উদ্বুদ্ধ ও অভ্যস্ত করাবেন।
২০। নিজের ভুল-ত্রুটি স্বীকার করার এবং অন্যের ওপর দোষ না চাপানোর অভ্যাস তৈরি করাবেন।
২১। ভালকে ভাল এবং মন্দকে মন্দ বলায় সর্বদা উৎসাহিত করবেন। এতে শিশুর ভাল-মন্দ পার্থক্য বিচারের সাহস ও ক্ষমতা বাড়বে।
২২। শিশু-কিশোরদের রুমে ভাল ভাল কথার স্টিকার, প্ল্যাকার্ড লাগাতে পারেন। যেমন- What you do today, determines where you will be tomorrow; We should not run after momentary pleasure; Do to others only, what you like others to do to you.
২৩। ভবিষ্যতে বড় কিছু হবার স্বপ্ন দেখাবেন এবং তার নিজ থেকেও অনুরূপ স্বপ্ন দেখতে বা বড় চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করবেন। সে যা হতে চায়, যা করতে চায় তাতে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করবেন।
২৪। সময়ানুবর্তিতা শেখাবেন, যা শিশুর উন্নত ভবিষ্যতের পিলারস্বরূপ। সময়ের কাজ সময়ে করলে সে কিভাবে লাভবান হবে আর না করলে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা উদাহরণ দিয়ে বোঝাবেন।
২৫। বয়স ৩/৪ এর পর থেকে নিজের কাজ যতটা সম্ভব নিজে করতে উৎসাহিত করবেন; যেমন তার পড়ার টেবিল, কাপড়-চোপড়, বিছানা, খেলনা ইত্যাদি গোছানো; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি। প্রতিদিন তাকে সামান্য কিছু কাজের রুটিন করে দিতে পারেন, অর্থাৎ তাকে আত্মনির্ভরশীল ও কর্মমুখী হতে শেখাবেন।
২৬। বেশিক্ষণ টেলিভিশন দেখতে এবং কম্পিউটার বা মোবাইলে গেম খেলতে দেবেন না। এতে বাচ্চারা অলস হতে পারে এবং তাদের সৃজনশীলতা লোপ পেতে পারে।
২৭। শিশুকে নিজ ভাষা-সংস্কৃতি ও আচারে অভ্যস্ত করাবেন; পাশাপাশি কিশোর বয়স থেকে আন্তর্জাতিক ভাষা ও আচার-আচরণ শেখানোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন ইংরেজী ভাষা শিক্ষা অথবা কাটা চামচ ব্যবহারের দীক্ষা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। তবে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি অতি আকর্ষণ শিশু-কিশোরদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাড়িতে বাংলা ও ইংরেজি চ্যানেলের চেয়ে হিন্দী চ্যানেলের অধিক প্রচারের ফলে বাচ্চারা হিন্দী ভাষা ও সংস্কৃতির ধুমধামে তথা ভীনদেশি সংস্কৃতিতে ভারসাম্যহীন হয়ে গড়ে ওঠে।
২৮। খেলাধুলার চর্চা করাবেন এবং সাঁতার শেখাবেন। সাঁতার না জানার কারণে অকালেই অনেকের মর্মান্তিক সলিল সমাধি ঘটে।
২৯। বন্দুক, পিস্তল, পটকা বা ছুরি জাতীয় খেলনা শিশুর হাতে দেবেন না; বয়স অনুযায়ী শিক্ষাসুলভ খেলনা দেবেন। ফিসার প্রাইস, ডুপলো ইত্যাকার কোম্পানী বয়সভেদে শিশু-খেলনা তৈরি করে।
৩০। শিশু-কিশোরদের পার্সোনাল ফোন, কম্পিউটার, ফেইসবুক ইত্যাকার ব্যবহারে অবশ্যই সতর্ক হবেন। এগুলো তার জন্য যেমনি মঙ্গলজনক হতে পারে, তেমনি ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে ভাল-মন্দ বোঝার মত তার বয়স ও বুদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা বাঞ্ছনীয়।
৩১। কৈশোর বা যৌবনে কার সাথে মিশছে বা আড্ডা দিচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাইরে যাচ্ছে, কখন ঘরে ফিরছে -এরূপ বিভিন্ন বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। আপনার অসতর্কতাই হতে পারে সন্তানের ধ্বংসের কারণ।
৩২। কিশোর বয়স হলে খবরের কাগজ পড়তে উৎসাহিত করবেন। এখনকার খবরের কাগজে শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি পাতার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিত্য-নতুন আবিষ্কারের নানা বিষয় থাকে। খবরের কাগজ থেকে তার আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয় বিষয়ে ঐদিন কি জানল, তা জিজ্ঞাসা করতে পারেন ডাইনিং টেবিলে বসলে বা ফ্যামিলি টাইমে।
৩৩। শিশুকে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক জায়গায় নিয়ে যাবেন। এরূপ কোথাও গেলে সেখান থেকে ফেরার সময়ে গল্পচ্ছলে তার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইবেন; ঘটনাক্রম সাজিয়ে বলার অভ্যাস করাবেন; প্রথমে বাংলায় এবং পরে ইংরেজিতে বলাবেন।
বাচ্চা একাধিক হলে প্রথমে ছোটজনকে দিয়ে বলাবেন; তারপর বড়জনকে দিয়ে বের করাবেন- ছোটজন কি কি মিস করেছে বা কি কি ভুল করেছে। অর্থাৎ বড়জনকে দিয়ে ছোটজনের বিষয়বস্তুর ও বর্ণনার ভুল-ত্রুটি শুধরাবেন। বড়জনকে দিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা ইংরেজিতেও বলাতে পারেন।
এরূপ চর্চায় শিশুর জড়তা কাটে; Observation capacity, expression এবং presentation capacity সহ অনেক ক্ষেত্রেই সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। তাদের মধ্যকার এরূপ সেশন চলাকালে উপস্থিত অন্যদেরকে কথা বলায় নিরুৎসাহিত করবেন এবং শিশুর কথায় মনোযোগ দিতে বলবেন।
৩৪। বাচ্চাদেরকে তার নাম, পিতা-মাতার নাম ও পেশা, বংশপরিচয়, স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানা, ফোন নং জানাবেন, মুখস্ত করাবেন এবং অন্যের জিজ্ঞাসায় তা বলতে অভ্যস্ত করাবেন।
৩৫। বয়সের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিশুকে লেখাপড়া করাবেন। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি স্কাউটিং, ক্যাডেট কোর, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ছবি আঁকা, নাচ-গান শেখা ইত্যাকার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত করবেন।
৩৬। মুখস্থ বিদ্যা এবং কোচিং শিক্ষায় নিরুৎসাহিত করবেন; বরং মুক্তবুদ্ধির চর্চা বা সৃজনশীল চিন্তা ও চেতনায় উৎসাহ যোগাবেন।
৩৭। প্রতিদিন বা প্রতিসপ্তাহে তার নির্বাচিত বিষয়ে রচনা লেখাবেন; আপনি নিজেও বিষয় ঠিক করে দিতে পারেন। তার লিখিত রচনায় কি কি ভুল হয়েছে, সেটা ধরিয়ে দেবেন- সমালোচনার জন্য নয়, ভবিষ্যত উৎকর্ষের জন্য। লেখা ভাল হলে প্রশংসা করবেন, Compliments দেবেন; সম্ভাব্যক্ষেত্রে পুরস্কৃত করবেন।
৩৮। শিশুকে বাস্তবজ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক গল্প এবং বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (Science Fiction) শোনাবেন। ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব, জ্বীন-পরী বা অনুরূপ ভীতিকর গল্প না শোনানোর বা অনুরূপ ছবি না দেখানোর চেষ্টা করবেন। তাছাড়া বাস্তবে ঘটিত কোন সহিংস ঘটনা অথবা টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত ভীতিকর ও নেতিবাচক ছবি দেখাবেন না।
৩৯। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের জীবনালেখ্য শোনাবেন। এতে ঐসব ব্যক্তিত্বের জীবনাদর্শে তারা অনুপ্রাণিত হবে এবং নিজ জীবনে তা লালনে সচেষ্ট হবে।
৪০। ধর্মকর্মে উৎসাহিত করবেন। ছোটবেলায়ই ধর্মগ্রন্থ পড়িয়ে ফেলবেন। আপনার ধর্মকর্মে তাকেও সঙ্গে রাখবেন। যেমন- মসজিদে, ঈদের জামায়াতে বা কবর জেয়ারতে যাবার সময়ে তাকে সাথে নেয়ার চেষ্টা করবেন। বাসায় শিশুসহ ফ্যামিলি মেম্বারদের নিয়ে মাঝে মাঝে মিলাদ ও যেকের আয়োজন করতে পারেন।
৪১। সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত সুস্বাস্থ্য, সুস্বাস্থ্যের জন্য সুষম খাবার বা balanced diet অত্যন্ত জরুরি। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুকে নিয়মিত ও পরিমিত স্বাস্থ্যসম্মত খাবারে অভ্যস্ত করাবেন। স্বাস্থ্যকর খাবারের যৌক্তিকতা এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন করে তুলবেন। তাকে পাশে বসিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করবেন।
৪২। শিশুকে বয়সভেদে শাক-সব্জি, মাছ ও ফলমূল খেতে উৎসাহিত করবেন। বাদাম, কলা, ডিম, দুধ প্রভৃতি খাদ্যে ব্রেন ও স্বাস্থ্য সুগঠিত হয়; তাই এসব খাদ্য তার জন্য জরুরি।
৪৩। জাঙ্কফুড, ফাস্টফুড, কোক-ফান্টা, চিপস্, চকলেট, আইসক্রিম না দেয়ার চেষ্টা করবেন। এসবের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তাদের প্রাসঙ্গিকভাবে অবহিত করবেন। এতে তারাই একদিন বলে উঠবে এগুলো খাদ্য নয়, বিষ।
৪৪। চিনি ক্যান্সারসহ শতাধিক রোগের কারণ। তাই শিশুকে ছোটবেলা থেকেই চিনির বদলে মধু, স্টেভিয়া বা গুড় খাওয়াতে পারেন। শিশুকে ফ্রিজের খাবার এবং বাসি খাবার না দেয়ার চেষ্টা করবেন। এতে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা এবং অসুখ-বিসুখ হ্রাস পাবে।
৪৫। কেমিক্যালে তৈরি ঔষধ-খাবার-পানীয় তাদের পেটে বা শরীরে সহজে দেবেন না; এন্টিবায়োটিক ঔষধ প্রয়োগ বা শরীর কাটা-ছেঁড়ায় খুব সহজে যাবেন না। এসবের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে আমার লেখা স্বাস্থ্য কলামের ৩৭ নং অধ্যায়ে।
৪৬। খাবার গ্রহণের সময়ে খাবার ফেলে দেয়া বা নষ্ট না করার দিকে খেয়াল রাখবেন। অর্থাৎ খাবারসহ যেকোন কিছুর অপচয় না করতে বলবেন। তার বুঝ-বুদ্ধির বয়স হলে বোঝাবেন- এ খাবার কতজনের পরিশ্রম ও ত্যাগের ফসল, পৃথিবীর কত মানুষ অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটায়, অপচয়কারী শয়তানের ভাই... ইত্যাকার প্রাসঙ্গিক বিষয়।
৪৭। কোন কোন সময়ে শিশু পড়তে চায় না, স্কুলে যেতে চায় না; অর্থাৎ পড়ালেখা বা ক্লাসে মনোযোগী হয় না। এক্ষেত্রে তার ওপর মোটেই রাগ বা বিতৃষ্ণা দেখানো যাবে না। বরং School fear বা বিদ্যালয়-ভীতি অথবা পড়তে না চাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করে প্রোএকটিভ এটিচিউডে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন।
শিশুর এ ধরনের আচরণ অস্বাভাবিক নয়। ক্লাসটিচার, সহপাঠী, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবেশ-প্রতিবেশের বিভিন্ন নেতিবাচক কারণে ও প্রভাবে শিশুর স্কুলভীতিসহ নানারূপ মানসিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। এসব ক্ষেত্রে শিশুকে আদরে-সোহাগে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার উৎস খুঁজে বের করতেই হবে। এ বিষয়ে ক্লাসটিচার, খেলার সাথী বা সংশ্লিষ্টদের সাথেও আলাপ করতে পারেন এবং বিভিন্নভাবে তাদের সাহায্যও নিতে পারেন।
৪৮। শিশু খিটমিটে বা অবাধ্য হলে অথবা নেগেটিভ আচরণ করলে তাকে ধমক, চড়-থাপ্পড় বা বিরূপ প্রতিক্রিয়াসম্পন্ন শাস্তি না দিয়ে তথা ভীতিকর অবস্থায় না ফেলে আন্তরিকতার সাথে কাউন্সেলিং করবেন এবং তাকে বোঝানোয় প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাবেন। শিশুর সমস্যা চিহ্নিত করে তদনুযায়ী সঠিক কাউন্সেলিং এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারলে সাফল্য নিশ্চিত। এক্ষেত্রে ৬নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এসব ক্ষেত্রে আপনার নিজের ধৈর্য অত্যাবশ্যক। যদি আপনি নিজেই ধৈর্যহারা হয়ে যান বা ব্যর্থ হন, তাহলে শিশু-কাউন্সেলিং কেন্দ্র বা মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।
৪৯। শিশু-কিশোরদেরকে মেডিটেশন, ইয়োগা, আকুপ্রেশার, রিফ্লেক্সোলজি ও রেইকিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক চর্চা ও চিকিৎসায় অভ্যস্ত করাবেন। এগুলো মানসিক একাগ্রতা, সৃজনশীলতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু এমনকি শতায়ুলাভেও সহায়তা করে; কৃত্রিমতা ও নেতিবাচক চিন্তা থেকে নিয়ে আসে প্রকৃতির কাছাকাছি, বলীয়ান করে অফুরান ও উজ্জীবনী প্রাকৃতিক শক্তিতে।
৫০। শিশুর বয়স ৫ বছর বা তার বেশি হলে ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার পরিচালিত প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউড সেমিনারে পাঠাতে বা তাকে নিয়ে আসতে পারেন। রিএকটিভ না হয়ে শান্ত থেকে বা ধৈর্য ধরে এবং বুদ্ধি-বিবেচনা খাটিয়ে যেকোন পরিবেশ কিভাবে জয় করা সম্ভব -সেসব গুণ ও কৌশল জানবে এসব সেমিনারে অংশগ্রহণ করলে। তাছাড়া নিজকে জানা (Know Thyself), আত্মশক্তি জাগানো, রাগ নিয়ন্ত্রণ ও সম্পর্ক উন্নয়নের নানা উপায়সহ সফল ও জনপ্রিয় হওয়ার বিভিন্ন কৌশল শিখতে পারবে ক্যাম্পাস’র এসব সেমিনার বা ওয়ার্কশপ থেকে।
৫১। কিশোর-তরুণদেরকে ক্যাম্পাস’র দেশ উন্নয়ন ও জাতি গঠনমূলক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে পারেন; এতে তারা দেশপ্রেমী, মানবতাবাদী, চৌকস, কর্মযোগী, স্মার্ট ও আধুনিক হতে শিখবে।
ক্যাম্পাস’র শিক্ষানবিশ কার্যক্রমে অথবা ডিজিটাল ইয়াং-স্টার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলে ছাত্র-তরুণরা দলবদ্ধভাবে তথা টিম স্পিরিটে কাজ করতে শিখবে, এডজাস্টমেন্ট ও ম্যাচিং ক্যাপাসিটি অর্জন করবে, শেয়ারিং-কেয়ারিং শিখবে, অফিস আচরণ শিখবে, অবজারভেশন ক্যাপাসিটি বাড়বে, শংকা ও জড়তা কাটিয়ে স্মার্ট-আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল হবে, ভুল-ত্রুটির সমালোচনা শোনার ও শোধরানোর মানসিকতা তৈরি হবে, সহকর্মীদের এমনকি টিম-লিডারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়ার মত সৎসাহস অর্জন করবে, সদাচার- শিষ্টাচার ও শৃঙ্খলা শিখবে। এরূপ বেস্ট প্র্যাকটিসগুলো শেখা ও লালনের মাধ্যমে Superior Human Being হয়ে গড়ে উঠবে; অর্জন করবে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব-গুণ।
শেষকথা ॥ শিশু-কিশোরদের মধ্যে কোন সুঅভ্যাস তৈরি ও বদভ্যাস তাড়ানোর পূর্বে বা তাড়ানোর সময়ে পিতা-মাতা বা অভিভাবকের নিজের মধ্যে অনুরূপ সুঅভ্যাস থাকলে শিশুরা তা সহজেই গ্রহণ করে বা আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়। অভিভাবকের মধ্যে সে সুঅভ্যাস না থাকলেও শিশুকে ভালর চর্চায় উৎসাহিত করবেন, অনুপ্রেরণা যোগাবেন। পাশাপাশি আপনার ছোটবেলাকার সীমাবদ্ধতার কথা বলে তাকে বোঝাবেন কেন আপনি এসব ভালর চর্চা করতে পারেননি, আর কেনইবা তাকে বিভিন্নক্ষেত্রে ভাল হতে হবে এবং মঙ্গল চিন্তা করতে হবে। এসময়ে শিশুর সাথে অভিভাবকগণও অনুরূপ সুঅভ্যাসের চর্চা করলে তা হবে সুউন্নত মননের পরিচায়ক।
আজকের শিশু-কিশোররাই আপনার দুঃখ-হতাশা এবং দেশ ও জাতির দুর্যোগ-দুর্গতি-দারিদ্র্যসহ সকল অন্ধকার দূর করে দেবে; যদি তাদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং যুক্তি ও ন্যায়ের চর্চা গড়ে তুলতে পারেন; যদি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন মানব-চরিতের বেস্ট প্র্যাকটিস বা সর্বোৎকৃষ্ট চর্চাগুলো, যদি শিশু-কিশোরদের মনে জ্বালাতে পারেন আলোর বহ্নিশিখা (Igniting mind).
এরূপ পরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা চৌকস ও কর্মযোগী শিশুরাই একদিন পরিণত হবে প্রতিভাবান ও আলোকিত জাতিতে। আর এভাবে গড়ে ওঠা মেধাবী প্রজন্মই সহজে বদলে দেবে সমাজ, দেশ ও সমগ্র বিশ্ব।

শিশু-মানস গঠনে উন্নত বিশ্বের সরকারি উদ্যোগ
অনুসরণ করতে পারে আমাদের সরকারও

শিশুরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত বলেই উন্নত বিশ্বের সরকারগুলো শিশু-মানস গঠনে নানা উদ্যোগের পাশাপাশি পারিবারিক ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সেসব সরকার প্রায়ই মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ নিয়ে থাকে- শিশু-কিশোররা কিভাবে গড়ে উঠছে, তারা কি ধরনের অপরাধ করছে, কেন করছে, এর প্রতিকারই বা কি?

সাম্প্রতিককালে ব্রিটিশ সরকারের অনুরূপ গৃহীত ব্যবস্থা আমাদের ন্যায় উন্নয়নকামী দেশের জন্যও বিশেষ অনুকরণীয়। আমরা ইভটিজিং নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা, আন্দোলন-মানববন্ধন, মিটিং-মিছিল করেছি এবং করছি। এত্তসব যত করছি, ততই বাড়ছে টিজিং। আসলে আন্দোলন আর আলোচনায়তো টিজিং বা কিশোর-অপরাধ বন্ধ হবার কথাও নয়। এ নিয়ে নেই সামাজিক গবেষণা, নেই গঠনমূলক বা কার্যকর উদ্যোগ। বাংলাদেশে টিজিং সম্পর্কে ইতঃপূর্বে কয়েকবার লিখেছি, তাই পুনঃআলোচনায় গিয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। চাই শুধু সরকার ও সমাজপতিদের সুচিন্তাপ্রসূত গঠনমূলক ও কার্যকর দ্রুত পদক্ষেপ।

শিশুদের চরিত্র গঠনে আরও যত্নশীল হতে ব্রিটেনে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন মনে করেন- গত আগস্টে সেদেশে যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে, তার মূলে রয়েছে তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়। এজন্য পরিবার এবং অভিভাবকদের দায়ী করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, বাবা-মায়েরা শিশুদের লালনপালন ও বড় করতে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছেন না। এ বিষয়ে হয়তোবা তারা অজ্ঞ বা উদাসীন।

ব্রিটেনের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো শিশুদের সুস্থ মানস গঠনে যেন বৈজ্ঞানিক ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে, সে লক্ষ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন। যে পরিবারে ৫ বছর বয়সের নিচে সন্তান রয়েছে, সেই বাবা-মাকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি। প্রশিক্ষণ ক্লাসে উপস্থিত থাকার জন্য পরিবারপ্রতি ১০০ পাউন্ড দেয়া হবে। প্রথম দফায় ৫০ হাজার অভিভাবককে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এ খাতে ব্রিটিশ সরকারের বার্ষিক ব্যয় হবে ৫০ লাখ পাউন্ড।

ব্রিটেনের শিশুবিষয়ক মন্ত্রী সারাটিখার বলেন- আমাদের দেশের শিশু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রত্যেক শিশুর জীবনের প্রথম ৫ বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ৫ বছর শিশুর জীবনে স্থায়ী ছাপ ফেলে, যা তার ভবিষ্যৎ মানস গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ সময়েই তার মূল্যবোধ, নৈতিকতা, আচার-আচরণ, সমাজ ও পরিবারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়িত্ববোধ গঠনে প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয় -যা শিশুজীবনের ভিত হিসেবে বিবেচিত। তাই শিশুর ৫ বছর বয়সের মধ্যেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত। এজন্য অভিভাবক-শ্রেণীকক্ষ ও পারিবারিক নৈতিকতার গন্ডিকে সমন্বয় করে শিক্ষাসূচি তৈরি করা হচ্ছে।

শিশুদেরকে সুস্থ মনের, নীতিবান ও চরিত্রবান ভবিষ্যৎ নাগরিকরূপে গড়ে তুলতে ব্রিটিশ ক্যামেরন সরকার উপরোক্ত যে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে, তার মূল লক্ষ্য- দায়িত্ব সচেতন ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে বাবা-মা তথা অভিভাবকদের করণীয় এবং তাদের দায়িত্ব পালনের সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে ব্রিটিশ সরকার বদ্ধপরিকর।