Sun Sun Sun Sun Sun
English

নিজের চিন্তাশক্তি দিয়েই জীবন বদলে দিন
কী কারণে মানুষ ভালো বা মন্দ চিন্তা করে

|| ড. এম হেলাল ||
কর্মই জীবন, আবার চিন্তা থেকেই কর্মের সৃষ্টি। তাই চিন্তার পদ্ধতি ও গুণের ওপর সকল কর্মপ্রক্রিয়া ও কর্মফল নির্ভর করে। এজন্যই বলা হয়, Your thought is your energy and energy is the power. বাংলা প্রবচনেও রয়েছে- যেমন চিন্তা তেমন কর্ম, যেমন কর্ম তেমন ফল।

চিন্তাশক্তি দিয়েই মানুষ বড় হয়, সুখী হয়, সফল ও সমৃদ্ধ হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ তত বেশি বড়, যার চিন্তার শক্তি যত বেশি। অর্থাৎ চিন্তার প্রখরতা-গভীরতা ও দূরদৃষ্টি যার যত বেশি, তিনি তত বড় মাপের মানুষ এবং তার জীবন তত সমৃদ্ধ। আবার চিন্তার দারিদ্র্যের কারণেই মানুষের জীবনে ঘটে এর উল্টোটা।

প্রতিটি মানুষ কমবেশি ভালো চিন্তা করে, আবার সচেতন বা অবচেতনভাবে খারাপ চিন্তাও করে; যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে খারাপ চিন্তা করার কথা স্বীকার করতে চায় না। Positive চিন্তা মানুষকে Positive দিকে পরিচালিত করে, আর Negative চিন্তা মানুষকে নিয়ে যায় Negative পথে। সংগত কারণেই ভালো কাজের পূর্বশর্ত হলো ভালো ভালো চিন্তা। খারাপ বা Negative চিন্তা থেকে ভালো কাজ আশা করা যায় না। Positive thoughts & ideas beget positive results and negative thoughts beget negative results -এ সূত্র চিরন্তন এবং সব মানুষের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য।

চিন্তার উৎস হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যভান্ডার; যে তথ্য সঞ্চয়নের শুরু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের চিন্তা, শোনা ও বলা থেকে। প্রকৃতপক্ষে জন্মের পর থেকে এ ভান্ডার পরিপূর্ণ হতে থাকে; অনেকটা কম্পিউটারের মতো। কম্পিউটার আমাদেরকে যে আউটপুট দেয়, তা নির্ভর করে কম্পিউটারে আমরা যে ডাটা ইনপুট করেছি, সেই ডাটার ওপর। আমাদের ইনস্টল করা ডাটা ও সফটওয়্যারের বাইরে সে কোনোরূপ আউটপুট দিতে পারে না। তেমনি মস্তিষ্কে ডাটা ইন্সটলেশনের ওপর এবং মস্তিষ্কের গড়ন ও প্রকৃতির ওপর মানুষের চিন্তার ধরন ও গুণ নির্ভর করে। মস্তিষ্কে ভালো তথা Positive ডাটা ইনপুট হলে চিন্তার ধরন ভালো বা Positive হতে থাকবে, আর ডাটা খারাপ বা Negative হলে চিন্তা বা কর্ম নেতিবাচক বা খারাপ হতে থাকবে। মানুষের খারাপ চিন্তার কারণ ও প্রতিকার এবং ভালো চিন্তার শক্তি তৈরি ও সাফল্য লাভই এ লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়।

কী কী কারণে মানুষ ভালো বা মন্দ চিন্তা করে
মানুষের চিন্তা ইতিবাচক হবে নাকি নেতিবাচক হবে -তা কিছু বিষয় বা কারণের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত তিনটি কারণের ওপর মানুষের চিন্তা ও কর্মের গুণগত বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে।

১। মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের ধরন বা Quality of Information:
মানুষের চিন্তার উৎস হচ্ছে তার মস্তিষ্কে থাকা তথ্যাবলী। মস্তিষ্কে থাকা তথ্য বা জ্ঞান যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে চিন্তার ধরন বা বৈশিষ্ট্য হবে নেগেটিভ তথা খারাপ। যেমন- বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্যের মাথায় তথ্য আছে যে, অমুক হাবিলদার অত টাকার মালিক; তমুক সার্জেন্ট গুলশানে ফ্ল্যাট কিনেছে; অমুক এসপি লন্ডনে বাড়ি করেছে...। পেশা ও কর্মসংশ্লিষ্ট এসব তথ্য মস্তিষ্কে রেখে বাড়ি-গাড়িহীন জীবন যাপনের চিন্তা করা তার পক্ষে দুরূহ। তাই বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যের মস্তিষ্ক থেকে সৎ ও সাধারণ জীবন যাপনের চিন্তা-ভাবনা খুব বেশি আশা করা যায় না।

ওদিকে ব্রিটিশ পুলিশ সদস্যের মস্তিষ্কে এসব নেগেটিভ তথ্য নেই। তাই বাংলাদেশ পুলিশের এসব অনৈতিক চিন্তার কথা শুনলে সে অবাক হবে। আবার ঐ ব্রিটিশ পুলিশই যদি বাংলাদেশ পুলিশে কাজ করতে আসে এবং কয়েক মাস এখানে থাকে, তাহলে তার আজন্ম লালিত সততার বিষয়ে সে নিজেই কনফিউজড হয়ে উঠবে। বছরখানেক পর অনুরূপ ঘুষ-দুর্নীতিতে তার অভ্যস্ত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ মানুষের ভালো-মন্দ চিন্তার উৎস হচ্ছে তার মস্তিষ্কে থাকা তথ্যাবলী।

ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রতিদিন প্রতিক্ষণ মানুষের মধ্যে এরূপ ভালো-মন্দের তফাত দেখতে পাচ্ছি। এ লেখায় হাত দেবার কিছুক্ষণ পূর্বের একটি ঘটনার কথা উদাহরণস্বরূপ বলছি।

আমার স্ত্রী ড. নাজনীন এবং আমার অফিসের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ আমাকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরামর্শ দেয় ৩ দিন আগে। তাৎক্ষণিকই ড. নাজনীনকে দায়িত্ব দিলাম ঐ ব্যাংকের যারা তার কাছে আসে, তাদের কাউকে আমার সাথে দেখা করাতে। ২ দিন পার হবার পর রাজুকে বললাম, তুমি ম্যাডাম থেকে এ দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ডেস্কে ফোন করে আজই তাদের কাউকে আসতে বলো। কিছুক্ষণ পর রাজু এসে বলল, স্যার এখন ১০টা বেজে গেছে; তাই তারা আজ কাউকে পাঠাতে পারবে না, কাল বা পরশু পাঠাবে। তাকে বললাম- যে কর্তার সাথে কথা বলেছ, তাকে ফোনে ধরিয়ে দাও; আমি কথা বলব।

রাজু ফোন করে ব্যাংকের হেড অফিসে। ওপাশ থেকে স্মার্ট গলায় কথা বলা ভদ্রমহিলাকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম, Bank is for the clients, but clients are not for the bank. So you should consider client’s convenience; i.e. clients should be given priority. সাথে সাথেই তিনি উত্তর দিলেন- কি করতে হবে স্যার, বলুন; আপনি যাই বলেন, আমি তা চেষ্টা করব। তাই আর কথা না বাড়িয়ে তার পজিটিভ এটিচিউডের জন্য thanks দিয়ে আজই দুপুরের পর কাউকে পাঠাতে অনুরোধ করে ফোন রাখলাম।

এ ঘটনার সূক্ষ্ম পর্যালোচনা করতে গেলে কয়েক পাতা লিখতে হবে। কিন্তু সংক্ষেপে দাঁড়ায় যে- রাজু’র মস্তিষ্কে যদি ব্যাংক ও ক্লায়েন্টের পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য বা ধারণা থাকত, যদি এরূপ বা অনুরূপ অধিকার চর্চার বিষয়ে অতীতের কোনো Success story বা পজিটিভ তথ্য তার মস্তিষ্কে থাকত -তাহলে ভদ্রমহিলার সাথে সেভাবে কথা বলায় রাজু উদ্যত হতো। ঐ কর্মকর্তাকে আমার বলা অনুরূপ কথাগুলো যদি রাজু নিজেই বলতে পারত, তাহলেতো আমার আর কথা বলতে হতো না। ঐ ব্যাংকের অফিসার রাজুকে বা আমাকে দেখেননি। শুধু আমাদের মস্তিষ্কের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি কথার মাধ্যমে আমাদের দু’জনকে দু’রকম বুঝে একজনকে Regret করেছেন, অন্যজনকে Oblige করেছেন।

এভাবেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমি অন্যের সহযোগিতা পেয়ে আসছি দারুণভাবে; এমনকি পুলিশের কাছ থেকেও। কারণ আমার জানা আছে যে, বাংলাদেশ পুলিশেও অনেক সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি আছেন, যারা সৎভাবে আপনাকে সাহায্য করতে উদগ্রীব। বিভিন্নক্ষেত্রে আমার এরূপ সহযোগিতা লাভের মূল রহস্য হচ্ছে আত্মবিশ্বাস, যা অতীতের পজিটিভ ইনফরমেশন বা পজিটিভ চিন্তার মধ্যে নিহিত। অধিকার সচেতনতা বা অধিকার সম্পর্কে তথ্য বা জ্ঞানও এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে। ‘অধিকার’ মানে কেবল নিজের অধিকার নয়, যা স্বার্থপরতা হিসেবে চিহ্নিত; বরং অন্যের অধিকার বোঝা এবং সে সম্পর্কে সচেতন থাকা। পুলিশের কাছ থেকে সহযোগিতা চাওয়ার ক্ষেত্রে তার অধিকারের প্রতিও আমাকে সচেতন থাকতে হবে। অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। আর অন্যের অধিকারের প্রতি সচেতনতা নির্ভর করে নিজ মস্তিষ্কে থাকা অনুরূপ অনুকূল তথ্যের ওপর।

ছোটবেলা থেকে নিজের স্বার্থের পূর্বে অন্যের স্বার্থ দেখতে দেখতে এখন আর আমাকে নিজের স্বার্থ দেখতে হয় না, বরং অন্যরাই আমার স্বার্থ আমার চেয়ে বেশি দেখেন। এ প্রসঙ্গে পারিবারিক দু’টি সাধারণ বিষয় উল্লেখ করছি।

ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পর মা যদি খাবার তুলে দিতে না পারতেন, সেক্ষেত্রে নিজ হাতে খাবার নেয়ার সময়ে মাছের বড় টুকরো বা মুরগির রানটি আমি নিতাম না। ছোটটি বা সাধারণটি নিতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। ভাবতাম, বড়টি দিয়ে মা প্রয়োজনে মেহমানদারী করতে পারবেন অথবা আমার পরের জন বড়টি খাবে। কিন্তু আমার অন্য ভাই করত এর উল্টোটা। এতে মা মাঝে মাঝে তার ওপর রাগ করতেন বড়টি বা বেশি খাওয়ার কারণে, অন্যদিকে আমাকে পীড়াপীড়ি করতেন ভালোটা খাওয়ার জন্য।

এভাবে মা আমাকে নিরাপদ ভাবতে ভাবতে ৪০ বছর পর এখনো তাঁর সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে আমার সাথেই থাকছেন এবং প্রতিদিন সকাল-বিকাল আকর্ষণীয় খাবারটুকু খাওয়ার জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করেই চলেছেন।

মায়ের পরিবারে আমার যে অভ্যাস ছিল, তা স্ত্রীর সংসারেও রয়ে গেছে। এখনো ডাইনিং টেবিলে থাকা নানা পদ খাবারের মধ্যে কোন্ পদটি অন্যরা খেতে চায় না বা কম খায় -তা সবাইকে জিজ্ঞেস করি এবং অন্যের অপছন্দের খাবারটিই খেতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তাতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে- আমার পরিজনদের আনন্দ হয় তখন, যখন তাদের পছন্দের কোনো খাবার আমাকে একটু খাওয়াতে পারে। তাদের প্রিয় খাবারটি খেতে যদি আমি রাজি হই, তাহলে তারা বেজায় খুশি। আমাকে খাওয়ানোয় তাদের এই সোৎসাহ দেখে আমি বুঝতে পারি যে- তাদের অধিকার ও চাওয়া-পাওয়ার প্রতি অগ্রাধিকার দিতে দিতে এখন তারা নিজ অধিকারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার অধিকার সচেতনতায় মেতে উঠেছে।

আমার অফিস স্টাফদের যেকোনো ভোজ বা ভোগের ক্ষেত্রেও তাদেরকে খাওয়ানো বা দেয়ার পূর্বে আমার খাওয়া বা নেয়ার ইচ্ছা এখনো তৈরি করতে পারিনি। তারা বুঝেই নিয়েছে যে- এ নিরস ব্যক্তিকে খাওয়ানোয় আনন্দ নেই, বরং তার খাওয়ানোর আনন্দে শরীক হলেই সে খুশি। এভাবেই অন্যের অধিকারে অগ্রাধিকার দিতে দিতে তথা ইতিবাচক বা পজিটিভ চিন্তা প্রয়োগ করতে করতে এখন এমন হয়েছে যে- ভোগের ক্ষেত্রে কোনো কিছুকে আমার একার বলে মনে হয় না; এমনকি কোনো ক্ষেত্রেই এরূপ সমস্যাবোধ করি না, যার সমাধান নেই; সবকিছুই সহজ বলে মনে হয়; পৃথিবীকে অনেক বড় অনেক সুন্দর বলে মনে হয়।

তাই আমার ক্ষেত্রে- Impossible is a word, I don’t believe. অসম্ভব বলে কোনোকিছু আমার অভিধানে নেই। আমি আরও মনে করি, পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান আছে অর্থাৎ সমাধানহীন কোনো সমস্যাই পৃথিবীতে নেই। সমাধানের জন্য প্রয়োজন কেবল জ্ঞান,কৌশল এবং উদার মন তথা স্বার্থ ত্যাগের মানসিকতা।

ছোটবেলা থেকেই আমি নেগেটিভ পরিস্থিতিকে পজিটিভ করার অভ্যাস ও চর্চা করে আসছি বলে আমার সামনে নেগেটিভ এসে বেশিক্ষণ বা বেশিদিন ভর করে টিকে থাকতে পারে না। অন্যদিকে আমার আশপাশের অনেককে দেখেছি, সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়। তাই তাদের জীবনতরী এঁকেবেঁকে চলে সংশয়ে-সন্দেহে-অনিশ্চয়তায়-হতাশায় ও অবিশ্বাসের দোলাচলে।

২। অতীত অভিজ্ঞতা বা Past Experience:
ভালো বা মন্দ চিন্তার ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা টনিক হিসেবে কাজ করে। অতীতে কোনো ব্যাপারে আপনার তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলে বর্তমানে সেরূপ বিষয়ে আপনি সহসা ভালো চিন্তা করতে পারবেন না। যেমন- অতীতে কাউকে সাহায্য সহযোগিতা করতে গিয়ে আপনি অপমানিত হলে এখন অন্যকে সাহায্য করতে আপনি কুণ্ঠিত হবেন, কনফিউজড হবেন, পিছপা হবেন। অতীতে অন্যকে টাকা ধার দিয়ে ফেরত পাননি অথবা ফেরত পেলেও নানা বিড়ম্বনায় পড়েছেন, ঝক্কি-ঝামেলায় পড়েছেন, সম্পর্ক নষ্ট করতে হয়েছে। তাই এখন কাউকে টাকা ধার দিতে আপনি ভয় পাচ্ছেন এটাই স্বাভাবিক। বন্ধুত্ব বা ভালোবাসার ক্ষেত্রেও অন্যের থেকে প্রতারিত হলে বা আতংকিত হবার মতো কিছু অতীতে আপনার জীবনে ঘটে থাকলে আপনি বর্তমানের প্রেমিকের মাঝেও সেই আতংক খুঁজে বেড়াবেন।

উন্নত ও আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞানে দক্ষ একজন সার্জন অতীত অপারেশন কেসের সাকসেস অভিজ্ঞতার সাহসে ও বিশ্বাসে বর্তমানে শত শত রোগী সফলভাবে অস্ত্রোপচার করে চলেছেন। অন্যদিকে আরেক অনভিজ্ঞ সার্জন বর্তমানে রোগীর পেটে গজ-ব্যান্ডেজ রেখে পেট সেলাই করে দিচ্ছেন। এজন্যই মেডিটেশনের হেলথ কেইসে অর্থাৎ কোনো রোগীকে ভালো করার প্রোগ্রামিংয়ের পূর্বে নিজের অতীতের Success story করার বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়।

এককথায় মানুষের অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তথা মস্তিষ্কে থাকা তথ্যের ওপর নির্ভর করেই তার ভালো বা মন্দ চিন্তা আসে এবং পজিটিভ বা নেগেটিভ চিন্তার প্রতিফলনে সে কাজে নেমে সফল বা ব্যর্থ হয়। এ বিষয়ে আর কোনো সংশয় বা বিতর্কের অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।

৩। দৃষ্টিভঙ্গি বা Belief System:
মানুষ কেন ভালো বা মন্দ চিন্তা করে -এর প্রধানতম কারণ তার দৃষ্টিভঙ্গি বা Belief system. অতীতের কোনো পরিস্থিতি বা ঘটনাকে একজন কি Conclusion -এ বা কি বিশ্বাসে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বর্তমান ঘটনা প্রবাহ কি বিশ্বাসে গ্রহণ করছে -তা থেকে তার বর্তমান ভালো বা মন্দ চিন্তার সৃষ্টি হয়। বিশ্বাসের এ প্রক্রিয়ায় পড়ে একজন মানুষ সারাজীবন ভালো বা মন্দ আচরণ করে তথা পজিটিভ বা নেগেটিভ ফল পেতে থাকে। তাই একটি ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা নিয়ে কেউ সফল ও সমৃদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত থাকে; আবার ঐ একই পরিস্থিতিকে কেউ নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করে ব্যর্থ চর্চায় অভ্যস্ত হয়। দু’জনের চতুর্পাশের ঘটনা প্রবাহের স্বরূপ প্রায় একই রকম হওয়া সত্ত্বেও দু’জনের Belief system দু’রকম হওয়ার কারণে একজনের গন্তব্য হয় স্বর্গের দিকে, অন্যজনের হয় নরকযাত্রা। এ দেখে অনেকে অবাক হয়, স্রষ্টার লীলাখেলা মনে করে তাঁর ওপর সব দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে আত্মরক্ষায় ব্যর্থ প্রয়াসী হয়। চিন্তার এরূপ বৈপরীত্যের কারণেই পরিবারে ও সমাজে বড়-ছোট, ধনী-গরিব, মালিক-ভৃত্য, রাজা-প্রজা প্রভৃতির এত বিস্তর ব্যবধান দেখা যায়।

উপরে উল্লেখিত ২নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত অতীত অভিজ্ঞতার উদাহরণে সাহায্য করার ক্ষেত্রে যে দুঃখজনক অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে, তার মূলে রয়েছে ঐ ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি তথা Belief system. সে একজনকে সাহায্য করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে এখন পৃথিবীর তাবৎ মানুষকে অবিশ্বাস করছে। তেমনি অতীত প্রেম বা বন্ধুত্বে আতংকিত মানুষটিও বর্তমানে প্রেমের ওপর আস্থা আনতে পারছে না। পৃথিবীতে বিশ্বাস করার মতোও যে অনেক মানুষ আছে -তা এখন সে ভাবতে পারছে না। তার বোধেই আসে না যে- পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আলাদা, একের সাথে অন্যের মিল নেই। অতএব একটি বিষয়ে আমি দু’জন খারাপ মানুষকে দেখলেও অন্যসব মানুষ একইরূপ নাও হতে পারে। অন্যদেরকে সন্দেহ করতে করতে আমার সন্দেহ ও সংশয় আমারই সকল সাফল্য ও চাওয়া-পাওয়াকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।

অধিকাংশ মা-বাবা সন্তানকে বকা দিয়ে পড়ান বা পড়ার টেবিলে বসান। কারণ তারাও ছোটবেলায় পড়েছেন বকা খেয়ে। তাই তাদের বিশ্বাস, বকা দিয়েই পড়াতে হবে। তবে এ বিশ্বাসে ব্যতিক্রমী তথা পজিটিভ এটিচিউডের মানুষও রয়েছেন, যার ছোটবেলায় বকা খেয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও এখন তার সন্তানকে পড়ার জন্য বকাবকি করেন না। অর্থাৎ নিজের নেগেটিভ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সন্তানের সাথে পজিটিভ আচরণ করেন। এক্ষেত্রে শিক্ষা ও জ্ঞানের কারণে তার অভিজ্ঞতার নেগেটিভ বিশ্বাস চলে গিয়েছে, তার Belief system চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে। অনুকূল ও উন্নত চিন্তায় তিনি অভিষিক্ত হওয়ায় তার আচরণ এখন আধুনিক এবং উন্নত।

দু’বন্ধু -একজন ইঞ্জিনিয়ার, অন্যজন সংগীতশিল্পী; একত্রে বেড়াতে গিয়েছে। সেখানে ২য় জনের প্রশংসায় সবাই মশগুল দেখে প্রথম বন্ধু ঈর্ষান্বিত হয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তার নেগেটিভ এটিচিউডের ভাবনা এরূপ- আমি ঐ বন্ধুর তুলনায় ভালো পড়াশোনা করে ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সত্ত্বেও কেউ আমাকে চেনে না বা আমার প্রশংসা করে না।

এখানে ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর Belief system নেগেটিভ হওয়ায় তার চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণ সবকিছুতেই নেগেটিভ ইফেক্ট দেখা যাবে। কিন্তু ঐ বন্ধুটি যদি ভাবতে পারে যে- সঙ্গীত শিল্পীটি আমারই বন্ধু, ও প্রশংসিত হলে বা বড় হলে তাতে আমার ক্ষতি কী? বরং আমিও সেই প্রশংসার অংশীদার -এভাবে Positive belief system ভালো চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সুকর্মের সহায়ক। তাই একই ঘটনাকে দু’ব্যক্তি দু’বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ ও বিশ্বাস করার ফলে দু’জনের চিন্তা দু’উল্টো পথে চলে যায়। একজন নরকে, অন্যজন স্বর্গে।

আমার জীবনেও এরূপ বহু ঘটনা রয়েছে। তন্মধ্যে অপ্রকাশ্য একান্ত পারিবারিক একটি ঘটনা সুপ্রিয় পাঠকের সাথে শেয়ার না করে পারছি না। আমার শ্বশুর প্রফেসর এন আহমেদ ঢাকা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও গ্রন্থকার; একজন উদারপ্রাণ অমায়িক মানুষ। শ্বশুরের দু’ছেলে ও দু’মেয়ে। আমার স্ত্রী ও জ্যাঠাস দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী। বিয়ের পূর্বে আমার মায়ের প্রতি শ্বশুরের একটিই আবদার ছিল- তাঁর মেয়ের পড়ালেখার ক্ষেত্রে সহায়তা দানের জন্য। কিন্তু বিধি বাম! তাঁর মেয়ের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আমার মায়ের অসহযোগিতা আসেনি, বরং বিপত্তি এসেছে তাঁরই পরিবার থেকে। তাঁর সন্তানদের কোনো একজনের মনে এল- বোন যদি কমনওয়েলথ স্কলারশীপ পেয়ে বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আসে, তাহলে পরিবারে ও সমাজে তার তুলনায় এ বোনের কদর ও আকর্ষণ বেড়ে যাবে; নিজের গুরুত্ব কমে যাবে। তাই Negative belief system -এর ঐ সদস্য নিজে প্রভাব খাটিয়ে ব্যর্থ হয়ে বোনের স্বামী হিসেবে আমাকে তার স্পাউজের মাধ্যমে বলাতে থাকেন যে- ওরতো মাত্র বিয়ে হলো, সুন্দরী মেয়ে বিদেশে গিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারে, দেশে আর ফিরে নাও আসতে পারে। কিন্তু নদী বাধা পেয়ে যেমনি সরোবর হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি স্ত্রীর বিদেশে যাবার বিষয়ে এ ভবঘুরের ইচ্ছাও কঠিন শপথে রূপ নেয়। আমি তাদের বললাম- কেবল কমনওয়েলথ স্কলারশীপই নয়, যেকোনো সুযোগেই সে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে; তাতে স্বামী হিসেবে আমার বাধা দেয়া বিবাহগত চুক্তি ভঙ্গের অপরাধ, বৈবাহিক সিদ্ধান্তের বরখেলাপ। স্ত্রীর অধিকার ক্ষুন্নে পাপ রয়েছে এতে, যা আমি কোনোক্রমেই করতে পারি না। অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কেবল স্ত্রী বা সন্তানকে নয়, যে কাউকেই সহযোগিতা দান সবারই সর্বতোভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য। অধ্যয়নকে অগ্রাধিকার না দিলেতো সত্যকে অবহেলা করা হবে। আর তাই ঢাকা বিমান বন্দরে ব্রিটিশ প্লেনে তুলে দিতে গিয়ে নববধূর প্রতি আমার শেষ কথা ছিল- Don’t hesitate to enjoy anything around your world.

প্রিয় পাঠক, এভাবেই Power of positive thinking -এর Belief system ঠিক রেখে আমার জীবনে বহু কঠিন কঠিন পরীক্ষা পাসের পাশাপাশি শ্বশুরালয়ের উক্ত পরীক্ষায়ও অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। শ্বশুর পরিবারের ঐ সদস্যের নেতিবাচক বিশ্বাসের পাল্লায় সেদিন যদি আমি পড়ে যেতাম -তাহলে স্ত্রীর বর্তমান অবস্থান, আমার মায়ের প্রতি শ্বশুরের আবদার এবং এতদসংশ্লিষ্ট সবার পরিণতি যে কী হতো, তা সহজেই অনুমেয়। সেক্ষেত্রে শ্বশুর পরিবারকে দোষারোপ করে হয়ত পার পেয়ে যেতে পারতাম, কিন্তু নিজের বেঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তথা Negetive belief system -এর পাপের ফল থেকে কি রেহাই পেতাম?

তাই নেতিবাচক মানসিকতা (Negetive or reactive thought) যেমনিভাবে জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, তেমনি ইতিবাচক মানসিকতা জীবনের গুণগত মানে নাটকীয় উন্নতি বয়ে আনতে পারে; যা ইচ্ছা ও বিশ্বাস করলেই সহজে অর্জিত হয়ে যায়। তবে ইতিবাচক মানসিকতা সবার ক্ষেত্রে আপনাআপনি অর্জিত হয় না বরং চেষ্টার মাধ্যমে আয়ত্ব করে নিতে হয়। এভাবেই আপনার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধন Belief system কে জীবনের টার্নিং পয়েন্টগুলোতে যদি সঠিক-যথাযথ-প্রকৃত ও প্রাকৃত রাখতে পারেন, তাহলে আপনার আর বেশি কিছু করতে হবে না; আপনি জীবনে জয়ী হয়ে যাবেন Naturally, easily, effortlessly, automatically. অর্থাৎ প্রকৃতি বা স্রষ্টাই আপনাকে নিয়ে যাবেন আপনার স্বচ্ছন্দ গন্তব্যে। আর Belief system যদি ঠিক রাখতে না পারেন, তাহলে ব্যারিস্টার-ডাক্তার-ডক্টর-ইঞ্জিনিয়ার অথবা আর যত্ত কিছুই হোন না কেন, সত্য-সুন্দর ও চূড়ান্ত সাফল্যের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন না।

আমরা অনেকে বিশ্বাস করি যে, জাগতিক কর্মের পাশাপাশি ধর্মকর্মের গুরুত্বও কোনোক্রমে কম নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে নফল নামাজ পড়ে নিজের আত্মশক্তি অনেক বৃদ্ধি করা যায়, এতে কর্মফলও বাড়ে। কিন্তু সে বিশ্বাস কারো কারো নাও থাকতে পারে। তাই তিনি নফল নামাজ কেন, হয়ত ফরজ নামাজও পড়তে চান না। এক্ষেত্রে দু’জনের Belief দু’রকম, তাই ফলও দু’রকম। উদাহরণস্বরূপ একটি ঘটনা বলছি।

একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি এসোসিয়েশনের নির্বাহী কর্মকর্তার অসৎ কর্মের প্রতিবাদ করে সংগঠনের প্রধানদের নিকট অভিযোগপত্র লিখেছিলাম আমরা ক’জন এলামনাই। ভেবেছিলাম, অভিযোগকারী ও অভিযুক্তসহ আমাদের সবাইকে ডাকবেন সভাপতি এবং তিনি সাংগঠনিক নিয়মে তথা গঠনতান্ত্রিকভাবে ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু ঐ চিঠির কোনো উত্তর না দিয়ে এবং তাঁর সহকর্মী হিসেবে আমাদের কারুর সাথে কোনোরূপ আলাপ না করে তিনি অভিযুক্ত ঐ নির্বাহীর সাথে কোর্টে চলে গেলেন। আমাদের সবার (অভিযোগকারীদের) বিরুদ্ধে মামলা করে দিলেন এবং তাতে ৭ আসামীর মধ্যে ১নং আসামী করলেন আমাকে। আমিসহ অন্য আসামীদের ক’জন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের নির্বাচিত নেতা অর্থাৎ বিভিন্ন ছাত্র-সংসদের ভিপি, জিএস, সম্পাদক ইত্যাদি এবং সে হিসেবে তদবির করতে চাইলে আমরা কোন্ জায়গায় না যেতে পারতাম। তবুও বিভিন্ন তদবিরের কথা সহ-আসামীরা বললেও আমি তাতে সায় দেইনি। আমার বিশ্বাস ছিল- যেহেতু এটি একটি সাংগঠনিক বিষয়, তাই আমরা যদি অন্যায় করে থাকি, তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে তা হতে হবে সাংগঠনিকভাবে। অর্থাৎ আমাদের চূড়ান্ত শাস্তি হতে পারে সাধারণ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে আমাদেরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার। এটি কোর্ট-কাচারীর বিষয় নয়, এলামনাইদের ফেলোশীপকে কারাগারে বন্দি করার বিষয় নয়...।

আইনজীবী আমাদের এ কথা কোর্টকে বুঝাতে সক্ষম না হলেও আমরা মাননীয় কোর্টকে বুঝাতে সক্ষম হব এবং এরূপ বেআইনী ও হয়রানী মামলায় বিচলিত না হয়ে এ থেকে আমরা অভিজ্ঞতা নেব। কিন্তু ক’জন সহযোদ্ধা আমার এ মতের সাথে এক হলেন না। তারা বললেন- তাদের অনেক Prestige loss হয়ে যাচ্ছে, মামলা থেকে অতি দ্রুত নিস্তার পেতে চান। তাই তারা বিভিন্নভাবে তদবির করিয়ে তারপর কোর্টে গেলেন। আর আমি এ অধম কারুর কাছে কোনো তদবিরে যাইনি। ভোররাতে আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে থেকে তাঁকে বললাম- হে স্রষ্টা তুমি সত্যের জয় করো, মান-সম্মান রক্ষা করো। আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল এবং এখনও আছে, মহান স্রষ্টার বিচার পাব। কোর্টে গিয়েই পেয়ে গেলাম সুবিচার। মামলার প্রাথমিক অবস্থায় তথা Charge hearing তারিখেই অভিযোগ থেকে ১নং ও ৩নং আসামীর অব্যাহতি। সরল বিশ্বাসের জয় হয়েছে, স্রষ্টা আমার প্রার্থনা কবুল করেছেন; সত্যের জয় চিরন্তন।

মানব জীবনের সর্বাধিক কাক্সিক্ষত প্রেম-ভালোবাসা এবং পরিবার প্রথায়ও দৃষ্টিভঙ্গি বা Belief system -এর গুরুত্ব সর্বাধিক। দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচকতা বা নেতিবাচকতার ওপর পরিবারের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং প্রেম-ভালোবাসায় সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রায় সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে। সুখের আশায় গড়া পারিবারিক জীবনে যে অশান্তি ও বিপর্যয় নেমে আসে, এমনকি বিবাহের ক’বছর পরই সংসার ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায় -এর প্রধানতম কারণ সন্দেহ-সংশয়-রিএকটিভ ও নড়বড়ে দৃষ্টিভঙ্গি বা অস্থির চিন্তা। আবার চাওয়া-পাওয়ার স্বার্থপরতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতায় পড়ে পালিয়ে যায় প্রেম-ভালোবাসা। পাওয়ার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কাটিয়ে কেবলই দেয়ার উদার দৃষ্টিভঙ্গি লালন ও প্রদর্শন করতে পারলে কোনো প্রেম-ভালোবাসা বা পরিবার ভেঙ্গে যেতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। অথচ এ একই ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যের কারণে তথা দেয়ার চেয়ে পাওয়ার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে বেহেশতী সুখের প্রেম-ভালোবাসা ও পারিবারিক শান্তি হারিয়ে যায়; আর আমরা কেবল ঘুরে মরি ঐ মরীচিকার পেছনে। ভালোবাসার শক্তি হচ্ছে বিশ্বাস। অথচ এই বিশ্বাসের টানাপোড়নে পড়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে এ যুগের ভালোবাসা।

এই সকল ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তার পরিবর্তন হওয়া দরকার। এই পরিবর্তনের মানসিকতা যদি কোনোদিন ঐ মানুষের জীবনে না আসে, তাহলেই সে হতাশা ও দুরাশার গহীন অন্ধকারে নিপতিত হতে হতে জীবন সায়াহ্নে বলে ওঠে মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে, আমি আর বাইতে পারলাম না...।

সাহায্য করতে গিয়ে আমি বিপদে পড়েছি বলে মনে পড়ে না, তবে একটি দুঃখজনক ঘটনার কথা এ মুহূর্তে মনে পড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে ছাত্রদের নির্বাচিত নেতা হওয়ার পর আমার নিকট বিভিন্ন তদবির এবং দেন-দরবার আসতে থাকে। একবার আমার এক ফুফু ফোন করে বললেন- তোমার ফুফাতো বোন ইডেন কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে, চান্স পায়নি, ওয়েটিং লিস্টেও নাম নেই; তুমি একটু চেষ্টা করলে...।

ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জাহানারা আপা, অমায়িক মানুষ। ফোন করার সাথে সাথেই বললেন, তোমার ফুফাতো বোন মেরিটে তোমার কাছাকাছিতো থাকবে নিশ্চয়ই। তুমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে একাউন্টিংয়ে পড়লে সে ইডেনের ম্যানেজমেন্টে পড়ার চান্স পাওয়া উচিত ছিল। ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করেনি কেন, আমি দেখছি; ওর ডিপার্টমেন্ট হেডকে আমি বলে দেব। এর ক’দিন পর ফুফু আরেক তদবিরে ফোন করলে ফুফাতো বোনের ভর্তির বিষয়ে আমি খোঁজ নিতেই তিনি বলে উঠলেন তোমাকে বলেছিলাম, তুমিতো করে দাওনি; ওর ভর্তি এমনিতেই হয়ে গেছে, সে এখন ক্লাস করছে। ভর্তি পরীক্ষায় না টিকে এমনিতেই কীভাবে ভর্তি হয়ে গেল, সে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক প্রশ্নে তিনি আগডুম-বাগডুম বলতে থাকেন।

ফুফুর এরূপ নেতিবাচক আচরণে আমার ক্ষেত্রে নেতিবাচক চিন্তার সুযোগ নেই। কারণ সুবোধ তদবিরের ফলাফলে এবং মানুষের আচারে ততদিনে এমনই সিদ্ধহস্ত হয়ে গিয়েছি, আমি বুঝে ফেলেছি যে মানুষের মধ্যে যা আছে সেতো তাই দেবে; যার মধ্যে অকৃতজ্ঞতা ও অহমিকা রয়েছে, সে কৃতজ্ঞতা ও বিনয় দেখাবে কোত্থেকে? যার মধ্যে ভালোবাসা আছে সেইতো ভালোবাসা দেবে; যার মধ্যে ঘৃণা আছে সে দেবে ঘৃণা; যার মধ্যে রাগ আছে, সে রাগ বা বিরক্তি ছাড়া আর কিই-ই বা দিতে পারে!

সততা ও বিনয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষই পারে অন্যের সাথে সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে, সততায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে। এরূপ সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ অন্যকে ভক্তি করবে, শ্রদ্ধা করবে, আপন ভাববে, ভালোবাসবে। অন্যদিকে অসততা ও অন্যায়ে অভিজ্ঞতা লাভকারী মানুষটি তা পারবে না। সে অন্যকে আপন ভাবতে দ্বিধান্বিত হবে, ভালোবাসতে গিয়ে সংশয়ে পড়বে, সন্দেহের দোলাচলে পড়ে নিজেতো হাবুডুবু খাবেই -অন্যকেও খাওয়াবে, নিজের নেতিবাচক চিন্তা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্যকে খারাপ ও অসৎ ভাববে; নিজের কাছ থেকেও হয়ত দিতে থাকবে অসততা। দ্বিধা ও সংশয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষ অন্যকে সর্বদাই সন্দেহের চোখে দেখবে, নেতিবাচকতার মানুষ উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে -এটাইতো স্বাভাবিক।

কোনো এক বিজ্ঞানীর প্রশ্ন ছিল- যার মস্তিষ্কে চিন্তার রংয়ে কেবল হলুদ-নীল ও কমলা রয়েছে, সে ব্যক্তির কাছ থেকে লাল রংয়ের তথ্য বা লাল অভিজ্ঞতা আশা করছেন কীভাবে? যার মস্তিষ্কে লাল রংয়ের ধারণা নেই, তার কাছে লাল চিন্তা বা কাজের প্রত্যাশা? এতে ঐ সীমাবদ্ধ ব্যক্তির নিকট আপনিও সীমায় আবদ্ধ হয়ে গেলেন। এটি আপনার ক্রিয়েটিভিটি বা ডায়নামিজমের পরিচায়ক নয়। তখনই আপনি সুস্থ চিন্তার মানুষরূপে পরিগণিত হবেন, যখন আপনি তার কাছ থেকে তা-ই চাইবেন, যা তার কাছে রয়েছে এবং তার কাছে যা নেই, সেই প্রয়োজনীয় বিষয় তার মধ্যে সৃষ্টি করার চেষ্টা করবেন। আর ডায়নামিক ও বিশেষ মানুষ হিসেবে পরিগণিত হবেন তখনই, যখন তার মধ্যে ঐ গুণ তৈরি করতে না পারা পর্যন্ত আপনি তার সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে লেগে থাকবেন। বিশেষ মানুষ তিনি, যিনি কোনো ক্ষেত্রেই নেগেটিভ হন না। নেগেটিভ এটিচিউডের অসৎ ব্যক্তিকেও তিনি সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ বানিয়ে ছাড়েন নিজের সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য ও বিনয় দিয়ে।

মস্তিষ্কে ভালো তথ্য ইনপুট এবং চিন্তা শক্তির উন্নয়ন করবেন যেভাবে
আমরা যা চিন্তা করি, তা-ই পরিণত হয় কর্মে। অনুরূপ কর্ম দীর্ঘমেয়াদে পরিণত হয় অভ্যাসে। অভ্যাসের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় ব্যক্তিত্বের ধরন। এই ব্যক্তিত্ব বা চরিত্রই আমাদেরকে পৌঁছে দেয় গন্তব্যে। সে গন্তব্য হতে পারে আগরতলা অথবা উগিরতলা; হতে পারে রাজরানি অথবা চাকরানি।

তাই দেখা যায়, মানব জীবনে সফলতা বা ব্যর্থতার একক ও মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে চিন্তা। চিন্তা শক্তির উন্নয়নের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে ব্যাপক সাফল্যের দুয়ার উন্মোচিত হয়। তাই আমাদের চিন্তা সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং মস্তিষ্কে থাকা অতীতের খারাপ তথ্যের স্থলে ভালো তথ্য ইনপুট করার কলাকৌশল জানা থাকলে যে কেউ সহজেই উন্নততর মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। Positive belief বা Positive thought -এর মাধ্যমে নিজের মধ্যে প্রচুর Energy তৈরি করা এবং সে Energy দিয়ে নিজকে Powerful being তথা শক্তিশালী মানুষরূপে গড়ে তোলা কঠিন কিছু নয়।

আমাদের সমগ্র শরীরের মধ্যে ব্রেনই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ-সরল ও বোকা প্রকৃতির। তাকে আপনার আত্মা তথা আপনি যেভাবে কমান্ড দেন, সেভাবেই সে পরিচালিত হয়। ব্রেনে পজিটিভ বা নেগেটিভ যেরূপ ইনফরমেশনই পাঠানো হয়, ব্রেন সেরূপ তরঙ্গই সৃষ্টি করে এবং শরীরে তার প্রতিফলন ঘটায়। আমরা যখন ব্রেনে নতুন ইনফরমেশন পাঠাই, তখন মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি হয়। যখন আমরা লাগাতার একই পজিটিভ মেসেজ পাঠাতে থাকি, তখন ব্রেনের কাজের কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং ইনফরমেশন অনুযায়ী ব্রেন নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।

ফ্রেঞ্চ সাইকোলজিস্ট এমিল কো তাঁর গবেষণায় পেয়েছেন- মানুষ যখন ভালো কথা বার বার বলে, তখন ভালো জিনিস তার কাছে আসতে থাকে; ফলে জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন হতে থাকে। তাই জীবনে পজিটিভ পরিবর্তন বা সাফল্য আনতে চাইলে প্রথমে Belief system বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। আর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চাইলে বিশ্বাস করতে হবে যে, আমি বদলাতে পারি। এজন্য প্রথমে মনস্থির ও লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, তারপর বিশ্বাস আনতে হবে যে- আমি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারি এবং আমি এটা করব। প্রথম প্রথম এটি কষ্টকর হতে পারে, সাফল্য কম হতে পারে, এমনকি নাও হতে পারে। সাফল্যের এ পথে বিরাট বাধা হচ্ছে সংশয়। তাই প্রথমেই সন্দেহ-সংশয় ঝেড়ে ফেলতে হবে। একটি অস্ত্রই এসব দুর্বলতা দূর করতে পারে। আর তা হল মেডিটেশন ও অটোসাজেশন।

ধ্যান বা মেডিটেশনের মাধ্যমে চিন্তা শক্তির উন্নয়ন এবং মস্তিষ্কে খারাপ তথ্যের স্থলে ভালো তথ্য ইনপুট করা যায় সহজেই। মেডিটেশন একটি মহাকার্যকর সাধন পদ্ধতি; নিজের ভেতরের শক্তি কাজে লাগানোর যাদুকরী গুণ। প্রতিদিন নিয়ম করে মেডিটেশন করলে এক সময়ে অত্যাশ্চর্য ফল পাওয়া যায়।

মেডিটেশনের পথ দিয়ে অটোসাজেশনের ঘরে ঢুকতে হয় এবং অটোসাজেশনকে কাজে লাগিয়ে জীবন বদলাতে হয়। অটোসাজেশনের মাধ্যমেই মনের লুক্কায়িত শক্তিকে জাগিয়ে তোলা যায়, একই পজিটিভ বাক্য বারবার আওড়ে। শরীর ও মন উভয়ই তখন ব্যক্তিকে সাহায্য করে এবং তাকে সেভাবে তৈরি করে- সে যা চায়, তা পেতে। এভাবে শরীর ও মনে যখন রূপান্তর আসে, তখন ইচ্ছাটি বাস্তবে রূপ নেয়। মনে হয়, এ যেন এক মিরাকল।

মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে ব্রেনের আলফা লেভেলে পৌঁছে আপনি বার বার নিজ লক্ষ্যের কথা আওড়ালে এবং মনের চোখে তা দেখতে থাকলে এটি আপনার শরীর ও মনে এক ছন্দ তৈরি করে; যা নিরবে ও ধীরে ধীরে আপনাকে পরিবর্তিত করে তোলে। শুরু হয় আপনার সুস্থ, সুন্দর জীবনযাপন; শতায়ু লাভের পথে যাত্রা। সাফল্য তখন অনায়াসে ধরা দেয় আপনার হাতে।

দেখবেন, অল্পদিনেই আপনি হয়ে উঠছেন কেমন প্রোএকটিভ ও ডায়নামিক বিশেষ মানুষ; আপনার নানা সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি প্রতিভাদীপ্ত সম্ভাবনার দ্বার আপনি নিজেই উন্মোচন করে ফেলছেন। দেখুন, আপনার সাফল্যের সুযোগ কত অবারিত ও উন্মুক্ত। এরূপ সত্য ও সুন্দরের পথে সবাইকে স্বাগত।

মেডিটেশন করার উপায়ঃ মেডিটেশনের প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে ব্রেনকে আলফা লেভেলে নিয়ে যাওয়া। বিভিন্ন টেকনিক অবলম্বনে আলফা লেভেলে পৌঁছা যায়। যেমন- গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, কাউন্ট ডাউন করে (থ্রি টু ওয়ান মেথড বা টেন টু ওয়ান মেথড) অথবা মনের আইডিয়াল প্লেস অব রিলাক্সেশনে গিয়ে ইত্যাদি।

এভাবে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ব্রেনকে বারংবার আলফা লেভেলে নিয়ে যেতে থাকলে এবং দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করতে থাকলে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে আসে। একবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তারপর প্রতিদিন অন্ততঃ ১৫ মিনিট বা মাঝেমধ্যে ব্রেন ও মনের এ লেভেলে বিচরণ-চর্চা অব্যাহত রাখতে হয়। নিয়মিত ধ্যান চর্চায় যেকেউই প্রথমে নিজের ওপর, তারপর অন্য মানুষের ওপর এবং অতঃপর অন্যান্য প্রাণীর ওপর, উদ্ভিদের ওপর, শেষতক জড় পদার্থের ওপর প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে সহজেই কাঙ্খিত সাফল্যলাভে সক্ষম হয়।

বিনাব্যয়ে এরূপ আত্মোন্নয়ন-চর্চায় আগ্রহী হলে প্রতিমাসের ১ম ও ৩য় শনিবার বিকালে ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে আসুন। বিনামূল্যে পরিচালিত ধ্যান বা মেডিটেশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করুন। হতাশামুক্ত, উদ্যমী, কর্মযোগী, উজ্জ্বল-উচ্ছল, আলোকিত জাতি গড়ার লক্ষ্যে ক্যাম্পাস বিনামূল্যে এ সার্ভিস প্রদান করছে দীর্ঘদিন থেকে। অতীতের দুঃখ-হতাশা ঝেড়ে ফেলে নব উদ্যমে জীবন রাঙাতে, জীবনকে ভেঙে নতুন করে গড়তে এবং আপনার নিজের ভেতরের আপনাকে নিত্য নবরূপে আবিষ্কারের ক্ষেত্রে সহযোগিতা দানে সদা প্রস্তুত ক্যাম্পাস সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র।

আসুন, হেলা-ফেলায় এ সুযোগ আর না হারাই। এক্ষুণি উদ্যোগী হয়ে নিজ চিন্তাশক্তি দিয়ে প্রিয় এ জীবনকে বদলে দিই। গড়ে তুলি উন্নত জীবন; হয়ে উঠি এক মহাশক্তিশালী ডায়নামিক মানুষ, উন্নততর বিশেষ মানুষ।