Sun Sun Sun Sun Sun
English

ওয়াটার থেরাপীর মাধ্যমে রোগ নির্মূল করুন, সুস্থ থাকুন

|| ড. এম হেলাল ||
আমার মেয়ে আনতারা রাইসা, এখন ভিকারুননিসার একাদশের ছাত্রী। সে স্কাউট লিডার ও শিশু-কলামিস্ট। অর্থাৎ গঠনমূলক জীবনাচারী হওয়া সত্ত্বেও এসএসসি পরীক্ষা-পূর্ব প্রস্তুতির পড়ালেখায় সে একনাগাড়ে বেশিক্ষণ বসতে চেয়েও পারছিল না। তাই কিছুদিন ধরে তাকে অবজার্ভ করছিলাম।

রাতে লেখালেখির বিরতিতে ছেলে-মেয়ে এবং বৃদ্ধা মায়ের শয়নকক্ষে ঘুরে আসা আমার অভ্যাস। রাইসার ঘরে গেলে বুঝতাম সে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু দেখতাম সে অবিরাম পা নাড়াচ্ছে। একদিন তার সাথে আলাপ করলাম, ঘুমের মধ্যে পা নাড়ার বিষয় নিয়ে। সে বলল তার ঘুম গভীর হয় না, অনেকটা জেগে জেগে ঘুমায়। ফলে দিনের বেলায় মাথা ব্যথা করে। মাঝে মাঝে কানেও প্রচন্ড ব্যথা করে। হোমিও ঔষধ খেলে কান ব্যথা সাময়িক ভালো হয়ে আবার তথৈবচ।

সব শুনে তাকে বললাম, তুমি শীঘ্রই ওয়াটার থেরাপী শুরু কর। অর্থাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে দুই গ্লাস, বেলা ১২টা পর্যন্ত প্রতিঘন্টায় এক গ্লাস এবং ১২টার পর ৫/৬টা পর্যন্ত প্রতি দু’ঘন্টায় অন্তত এক গ্লাস পানি খেতে বললাম। তার মাকে বললাম বিষয়টি মনিটরিং করতে এবং তাদের উভয়কে বললাম এক সপ্তাহ পর ফলাফল জানাতে।

তিন দিনের মাথায় মেয়ে জানায়- আগে যেখানে সে দৈনিক ৪/৫ গ্লাস পানি খেত, সেখানে এ ক’দিনে খেয়েছে দৈনিক ৮/৯ গ্লাস। ফলে তার ঘুম বেড়েছে, মাথা ব্যথা কমেছে, কানে ব্যথা করছে না। তাকে আপাততঃ দু’সপ্তাহ আরো ২/৩ গ্লাস বাড়িয়ে অর্থাৎ দৈনিক ১০/১১ গ্লাস পানি পানের পরামর্শ দিলাম। তবে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি নয়, ফিল্টারিং করা স্বাভাবিক পানি এবং সম্ভব হলে কুসুম গরম পানি। ঠান্ডা পানি এ কারণে নয় যে, আমাদের পেটের ভেতরটা সর্বদা গরম থাকে। তাই গরম পেটে ঠান্ডা পড়লে একশনের চেয়ে রিএকশন হয় বেশি।

সে কারণেই রোদ বা গরম থেকে ঘরে ফিরে ঠান্ডা পানি খেলে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সর্দি-কাশি বা জ্বর হয়ে থাকে। অনেকে খাওয়ার পরপরই ঠান্ডা পানি খায়। অথচ ঠান্ডা পানি তৈলাক্ত খাদ্যকে জমাট বাঁধায় এবং পরিপাক ক্রিয়াকেও বিলম্বিত করে। তাই খাওয়ার পর স্যুপ বা হালকা গরম পানি পানই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। এজন্যই চীনারা খাবারের সঙ্গে ঠান্ডা পানির বদলে গরম চা পান করে।

আমরা অনেকেই বোতলজাত পানিকে বেশি নিরাপদ মনে করি, যা ভুল ধারণা। ব্রিটিশ গবেষকদের মতে- যেসব উপাদান দিয়ে বোতল তৈরি হয়, তা পানিতে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান ছড়িয়ে দেয়, যা পরে সংক্রমণ ছড়ানোর কারণ হয়ে উঠতে পারে। ট্যাপের পানিতে এই ঝুঁকি থাকে না।

আমার পরামর্শ অনুযায়ী দিনে ১০ গ্লাস পানি পানের অভ্যাস রপ্ত করার পর রাতে রাইসার একনাগাড়ে ঘুম হয়। মাথা বা কান ব্যথাতো চলেই গেছে, উপরন্তু চেহারায় লাবণ্য বেড়েছে, মুখের হাসিও বেড়েছে; সে এখন দিব্যি আরামে।

মেয়ের ওপর ওয়াটার থেরাপীর এ সাফল্য ছাড়াও এযাবৎ যতজন আমার পরামর্শমতো ওয়াটার থেরাপী করেছে, তাদের সবারই অনেক জটিল ও ক্রনিক রোগ ভালো হয়ে গেছে স্রষ্টার কৃপায়। এ বিষয়ে ‘নিজেই বৃদ্ধি করতে পারেন নিজের মানসিক শক্তি’ কলামসহ বিভিন্ন লেখায় বলেছি।

আসলে পানি হচ্ছে এক অমিয় সুধা। পানি কম খেলে যেমনি বহুরোগ তৈরি হয়, তেমনি যথেষ্ট পরিমাণে পানি খেয়ে বিশেষত ওয়াটার থেরাপী করে নানাক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ এবং আরোগ্যলাভ সম্ভব। পানির যে কত রকমারী ব্যবহার এবং কত বেশি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তা বলে শেষ করার নয়। আবার এ পানিই যদি বিশুদ্ধ না হয়, তাহলে তা কত যে জীবনঘাতী - তার হিসাব কে রাখে? তাইতো বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন, আর দূূষিত পানির অপর নাম মরণ।

জীবন রক্ষায় অক্সিজেনের পরই সর্বাগ্রে প্রয়োজন পানির। আমাদের দেহের ৬০ শতাংশই পানি। তাই দেহের গঠন ও অভ্যন্তরীণ কাজ পানি ছাড়া চলতে পারে না। তারপরও পিপাসা না পেলে এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় পানির ভূমিকা না জানার কারণে আমরা পানি পানে অবহেলা করি। পানি হলো প্রাকৃতিক ‘বিউটি ক্রিম’। পানি পানে ত্বককোষ হয় জলসিঞ্চিত, এরা ফুলে ওঠে, মুখাবয়ব হয় তরুণ। পানি ধুয়ে নিয়ে যায় মল, ময়লা, বর্জ্য; উন্নত করে রক্ত চলাচল ও প্রবাহ। তাই মুখাবয়ব হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও উদ্দীপ্ত।

মানবদেহের কোষে অক্সিজেন পৌঁছানোর বাহক পানি। বিপাক ক্রিয়া, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ও দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখে পানি। দেহের বর্জ্য পদার্থ দূর করতে, চামড়া ও মাংসপেশীর টান নিয়ন্ত্রণে, ওজন কমাতে, কিডনির কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে পানি। বুকজ্বলা, আলসার, গ্যাস্ট্রিক, মাইগ্রেনের মাত্রা কমাতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য, পানিশূণ্যতা, দুশ্চিন্তা, ঘুম কম হওয়া, ক্যান্সার, পিঠে ব্যথা, হাত-পা জ্বালা-পোড়া, আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগ, কিডনিতে পাথর, রক্তের তারল্য কমে যাওয়া ইত্যাদি প্রতিরোধে সাহায্য করে পানি। চোখ, নাক ও গলার সুস্থতায়ও পানির ভূমিকা অনেক। শক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি রোধে পানি অপরিহার্য। এত্তসব কারণে শেষতক ওয়াটার থেরাপী সম্পর্কে লিখতে বসে গেলাম। তাছাড়া ১৪ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখের দৈনিক কালের কন্ঠের একটি রিপোর্টও এ লেখায় আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

রিপোর্টটি ছিল সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ফলের ওপর। নেদারল্যান্ডসের মাসট্রিখ্ট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখতে পান- যেসব রোগী মাথা ব্যথা ও তীব্র মাথা ধরা তথা মাইগ্রেনের মতো সমস্যায় ভুগছেন, দৈনিক ৭ গ্লাস পানি পান করলে তাদের মাথা ধরার সমস্যা কমে যায় এবং বেশ আরাম বোধ হয়। এরূপ নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত পানি পানের অভ্যাসে তাদের জীবনযাত্রারই পরিবর্তন ঘটে যায়।

দলটির প্রধান গবেষক ও বিজ্ঞানী ড. মার্ক স্পিজৎ এবং তাঁর সহকারীরা এ গবেষণায় ১০০ জন রোগীকে বেছে নেন। এদের কেউ হালকা মাথা ব্যথা এবং কেউ কেউ তীব্র মাথা ধরা রোগে ভুগছিলেন। এদের মধ্যে অর্ধেক রোগীকে তিন মাস ধরে স্বাভাবিক পানি ও তরল গ্রহণের অতিরিক্ত হিসেবে দৈনিক দেড় লিটার পানি পান করার পরামর্শ দেয়া হয়। দেখা যায়- যারা নিয়ম করে অতিরিক্ত পানি পান করেছেন, তাদের বেশির ভাগেরই মাথা ব্যথা ছাড়ার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে।

পত্রিকায় উক্ত গবেষণা ফল দেখে মনে মনে হাসলাম- এ বিষয়ে আমার মেয়েইতো বহু আগে দারুণ অভিজ্ঞতালাভ করেছে। তাই ঐ বিজ্ঞানীদের সাধুবাদ দেয়ার পাশাপাশি স্রষ্টাকে এবং মেয়েকেও ধন্যবাদ দিলাম। ওয়াটার থেরাপীতে রোগ নির্মূলের আরও বহু বাস্তব ঘটনা আমার অভিজ্ঞতায় রয়েছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুর নিবাসী মনোয়ারা বেগম নামে আমার এক ভাবী আছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহীদ হন। শহীদ পরিবার হিসেবে ৩ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে কাটাচ্ছিলেন কঠিন দিন।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছি- তিনি কেবল চার ছেলেমেয়েরই দায়িত্ব পালন করেননি, পুরো সমাজের দায়িত্বই যেন তাঁর; ঘুরে ঘুরে মানুষের উপকারে ও সাহায্যে কাজ করে যেতেন। এভাবে অন্যকে সাহায্য করতে করতে বিত্ত-বৈভবহীন ভাবীর সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও বিত্তশালী। বর্তমানে দুই ছেলে কানাডায় এবং এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে ভাবীকে নিয়ে কানাডায় ও অস্ট্রেলিয়ায় এমন টানাটানি - তিনি যেন এ জগতের সবচেয়ে সুখী মানুষ।

এই সার্বিক সমৃদ্ধির সাথে তাঁর স্বাস্থ্যসুখের একমাত্র উপায় ও অবলম্বন হচ্ছে পানি। আমার কিশোর বয়সে তাঁর সাথে পরিচয়ের পর থেকে দেখেছি, তাঁর নিত্য ডায়াবেটিস ও গ্যাস্ট্রিক সমস্যা। হবেই না বা কেন, পারিবারিক টানাপড়েনের পাশাপাশি মানুষের খেদমতে দিবানিশি হন্যে হয়ে ছুটে চলাদের এ ধরনের রোগ থাকাটাইতো স্বাভাবিক। বহু ঔষধ খেয়েছেন, কিন্তু শেষতক বারডেম হাসপাতালই হয়ে উঠল তাঁর স্থায়ী নিবাস। হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গিয়ে কত যে হতাশার কথা শুনেছি আমার শেষকাল, আমাকে তোরা মাফ করে দিস, আর বেশিদিন বাঁচব না--। কিন্তু আশ্চর্য টনিক ওয়াটার থেরাপী শুরু করলেন যখন থেকে, তখন থেকেই তাঁর সকল নিরাশার অমানিশা কেটে যায়; তিনি হয়ে ওঠেন অনেকটাই সুস্থ। সেই থেকে স্বাস্থ্যসুখের পাশাপাশি সুস্থচিন্তার কারণে তাঁর ছেলেমেয়েরাও সুখী-সুন্দরভাবে আত্মোন্নয়ন করতে থাকে। পানি যেন তাঁদের সকল আশা-ভরসা ও উন্নতির সোপানরূপে আবির্ভূত হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও পানি পান একটি জনপ্রিয় স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি। ভারতে প্রাচীন ঋষিরা তাদের সাধনায় খালি পেটে পানি পানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান দিতেন। জাপানেও চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে খালি পেটে পানি পান বহুল প্রচলিত। তাই প্রতিবেলা খাবারের আগেই এক গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কথায় আছে, খালি পেটে জল আর ভরা পেটে ফল। খালি পেটে পানি পান আমাদের অনেক রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখে। সুস্থ ও সবলভাবে বেঁচে থাকার খুব সহজ একটি উপায়- প্রতিদিন অনেক বেশি পানি পান করা। এভাবে পানি পানের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। পর্যাপ্ত পানি বহুরোগের আক্রান্তির প্রতিরোধক, প্রতিষেধক এবং ঔষধ ও দাওয়াইয়ের প্রয়োজনীয়তাকে বহুক্ষেত্রে হ্রাস করে দেয়।

কর্মব্যস্ত নগরজীবনে আমাদের অনেকেরই পরিমাণ মতো কিংবা নিয়মমাফিক পানি পান করা হয়ে ওঠে না। সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত ও পরিমিত পানি পানের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। পানি পানকে প্রাত্যহিক জীবন-যাপনের অংশ করে নিন, শরীর অনেক ফুরফুরে লাগবে। গরমকালেতো বটেই, শীতকালেও পানি পানের চর্চা অব্যাহত রাখলে শীতকালটা শরীরের জন্য ভালো কাটবে।

এভাবে নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি পান তথা ওয়াটার থেরাপী হতে পারে আমাদের সবার সকল সুখের আধার। তাই আসুন, সুস্থ অবস্থায় নিয়মিতভাবে প্রতিদিন অন্তত ৮/১০ গ্লাস এবং আক্রান্ত হলে ১০/১২ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করি; সুস্বাস্থ্যের সুখময় সমৃদ্ধ জীবন গড়ি।