Sun Sun Sun Sun Sun
English

সন্তানের সাফল্যের জন্য মা-বাবার করণীয়

|| ড. এম হেলাল ||
মা-বাবা হবার পর থেকেই প্রত্যেক নারী-পুরুষের অন্যতম ও প্রধান স্বপ্ন থাকে তার সন্তানকে ঘিরে। সন্তানের জীবন, ভবিষ্যৎ ও সাফল্য নিয়ে সবসময়ই বাবা মা চিন্তা করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রার্থনা করে যান সন্তানের সুন্দর জীবন ও সাফল্যের জন্য।

সন্তানের জন্য চিন্তা, প্রার্থনা ছাড়াও মা-বাবা সন্তানের সাফল্যের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যান। সন্তানকে সফল দেখতে, তাদের সাফল্যে ভূমিকা রাখতে সন্তান ছোট থাকতেই মা-বাবাকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই সন্তান একজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে, হয়ে উঠবে সফল।

মূল্যবোধের শিক্ষা
টাকা-পয়সা, নাম, যশ, খ্যাতিকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা জীবনের সফলতা ভাবি। অনেকের মতে, এগুলো হয়তো জীবনের সফলতাও। কিন্তু আমার মতে জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে ভালো ও আলোকিত মনের মানুষ হওয়া এবং এর জন্য সাধনা করে যাওয়া। মা-বাবাকে বুঝতে হবে- ভালো চাকরি, পর্যাপ্ত টাকা জীবনের জন্য দরকার। কিন্তু তার আগে মানুষ হতে হবে তার সন্তানকে। নয়তো কোনো কিছুর দাম থাকবে না। তাই ছোট থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। সত্য-মিথ্যার পার্থক্য, ন্যায়পরায়ণতা, বিনয়, লজ্জা বুঝাতে হবে। পরিবার যে সন্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষালয়, আর মা-বাবা সবচেয়ে বড় শিক্ষক এটা ভুললে চলবে না। ।

সন্তানের রোল মডেল বা আদর্শ হওয়া
জীবনে যারা সফল হয়েছে, তারা কোনো না কোনো সময় কারো না কারো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। কখনো সেটা হয়েছে প্রত্যক্ষভাবে, কখনোবা পরোক্ষভাবে। আর সে সকল মানুষ আমাদের কাছে আমাদের আদর্শ, আমাদের রোল মডেল। কিন্তু একজন শিশু বা সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় রোল মডেল তার বাবা-মা। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা সবসময় তাদের বাবা-মাকে আদর্শ ভাবে এবং তাদের সবকিছু অনুকরণ করে তাদের মতো হতে চায়। এই কারণে বাবা-মাকে বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রকৃত পক্ষেই সন্তানের সুন্দর আগামীর জন্য সন্তানের সামনে নিজেদেরকে রোল মডেল হিসেবে তৈরি করে উপস্থাপন করতে হবে।

- পরিবারের কেউ ভুল করলে, একে অপরের কাছে দুঃখ প্রকাশ করুন।
- কারো ব্যক্তিগত বা ব্যবহার্য জিনিস নেয়ার আগে অনুমতি নিন। হোক পরিবারের অন্য সদস্যের জিনিস, তাও জিজ্ঞেস করে নিন। সন্তান তবে কখনো কারো জিনিস না বলে ধরবে না। পরিবার বা বাইরের কারো জিনিস না বলে নেয়াটা লজ্জার, এটা অনেক ক্ষেত্রে চুরির পর্যায়ে পড়ে তা সন্তানকে বুঝতে ও শিখতে দিন।
- পরিবারের কেউ কাউকে উপকার করলে ধন্যবাদ দিন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। ঘরের মানুষ বলে তাকে ধন্যবাদ দেয়া যাবে না, এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন। আপনার এই ছোট পদক্ষেপ সন্তানকে কৃতজ্ঞতাবোধ শিক্ষা দিবে।
- কেউ আসলে বা কল দিলে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে দিয়ে আমরা মিথ্যা বলাই। `বলে দাও, বাবা বাসায় নেই।` এই ধরনের মিথ্যা কথা সন্তান যদি মা-বাবার কাছ থেকে শিক্ষা পায়, সেই সন্তান বড় হলে মা-বাবাকেও এভাবেই মিথ্যা বলতে পারে।
মোট কথা সন্তান হবার পর থেকে নিজের খারাপ স্বভাব, অভ্যাসগুলো বর্জন করে সন্তানের কাছে আদর্শ হতে হবে।

সামাজিকতা শিক্ষা
অসামাজিক মানুষ সহজে সফল হতে পারে না। কারণ জীবনের প্রতিক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি অন্যের সাহায্য বা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ আমাদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। তাই ছোট থেকেই সন্তানকে সামাজিক হবার সুযোগ করে দিতে হবে। তার সমবয়সি বাচ্চার সঙ্গে খেলতে দেয়া, কোনো সমস্যা হলে মা-বাবার সাহায্য না নিয়ে তার বন্ধুদের নিয়ে তার সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহ দেয়া। কিন্তু অবশ্যই মা-বাবাকে দেখতে হবে সন্তান সামাজিকতা শিখতে গিয়ে যেন ভুল পথে কিংবা বিপথে না চলে। কিছুক্ষেত্রে দূর থেকেই নজর রাখতে হবে। বাড়ির ছোট ছোট কাজ করতে দেয়া সন্তানকে ৫ বছরের পর থেকেই বাড়ির ছোট ছোট দায়িত্ব দিতে হবে। এর মাধ্যমে তার দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে। এই দায়িত্ববোধের জ্ঞান তাকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে সফল হতে সাহায্য করবে। দায়িত্বশীল মানুষ একদিন না একদিন জীবনে সফলতা পায়। তাই শিশুকে তার বয়স অনুপাতে দায়িত্ব দিন। যেমন খেলার পর খেলনা গুছিয়ে রাখা, পড়ার টেবিল পরিষ্কার রাখা, জুতার ফিতা বাঁধতে শেখা ইত্যাদি।

কম মানসিক চাপ
ছোট থেকেই দায়িত্বজ্ঞান শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে দেখতে হবে কোনো কিছুই যেন সন্তানের মানসিক চাপের কারণ না হয়। পড়াশুনা নিয়ে কখনোই সন্তানকে চাপ দিবেন না। তাছাড়াও বাবা-মায়ের মাঝে মানসিক দোটানা থাকলে সন্তানও মানসিক চাপে পড়ে, যা আগামীতে তার জীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। মা-বাবা নিজেদের মধ্যে আলাপ করে দু`য়ের মধ্যকার সকল সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারেন। মা-বাবার মধ্যকার আলাপ বন্ধ হয়ে গেলেই বিপত্তি; এর প্রতিক্রিয়ায় ও প্রভাবে সন্তান ইচঁড়েপাকা হবার সুযোগে অপরিণামদর্শীর কুফল তৈরি হয়, তা মা-বাবাকে ভোগ করতে হয়। সংসার বা অন্য কারণে মা-বাবা মানসিক চাপে থাকলে তা সন্তানকে বুঝতে দেয়া উচিত নয়। বাবা কিংবা মা কেউই একে অপরের দোষত্রুটি নিয়ে সন্তানের সাথে আলাপ করবেন না। এমনকি সন্তান সম্পর্কিত দু`য়ের মধ্যকার আলোচনা বা সিদ্ধান্ত একে অপরের অনুপস্থিতিতে সন্তানের সাথে কিছুতেই শেয়ার করবেন না।

সাধনা ও উচ্চাকাক্ষা গড়ে তোলা
জীবনে সফল হতে হলে লক্ষ্য থাকতে হয়, সেই সঙ্গে থাকতে হয় সাধনা আর উচ্চাকাক্সক্ষা। সন্তানকে লক্ষ্য অর্জনের প্রতি আগ্রহী করতে হবে মা-বাবাকে। বুঝাতে হবে সাধনার গুরুত্ব ও ভূমিকা। সেই সঙ্গে তাকে উচ্চাকাক্সক্ষী করে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে উচ্চাকাক্সক্ষা যেন এমন পর্যায়ে চলে না যায়, যেখানে সাফল্য পাবার জন্য সন্তান মিথ্যা বা অসৎ উপায় গ্রহণ না করে।

মা-বাবার পুষ্টিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা
সন্তানের সুন্দর জীবন ও সাফল্য এর জন্য ছোট থেকেই তার শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেজন্য তার খাদ্য তালিকা হওয়া উচিত পুষ্টিসমৃদ্ধ। তাই খাবারের পুষ্টিজ্ঞান সম্পর্কে মা-বাবার সঠিক জ্ঞান থাকা দরকার। সেই অনুসারে সন্তানকে খাবার দিলে সন্তানের সুস্বাস্থ্য যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি আগামীও হবে সুন্দর।

মা-বাবার উচ্চশিক্ষা
সন্তানের সাফল্যে মা-বাবার অনেক বড় ভূমিকা আছে। তাই মা-বাবা যদি উচ্চশিক্ষিত হয়, সন্তানও সঠিক শিক্ষা পাবে। সেই সঙ্গে সন্তানেরও ইচ্ছা জাগবে মা-বাবার মতো উচ্চশিক্ষা লাভ করতে ও জীবনে সফল হতে।

সন্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক
মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক যেন সুন্দর আর স্বাভাবিক হয়, এর জন্য মা-বাবাকেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তানের সুষ্ঠু সুন্দর বিকাশের জন্য মা-বাবার সঙ্গে বন্ধনটা থাকতে হবে মজবুত। সন্তানের সবচেয়ে ভালো সাপোর্ট হচ্ছে মা-বাবা।

মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের নিবিড় বন্ধন সন্তানের ভবিষ্যৎ সাফল্যের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্ব বহন করে। সন্তানের সাফল্য কামনা করাই শুধু মা-বাবার দায়িত্ব নয়। সেই সাফল্য লাভের জন্য সন্তানকে যোগ্যভাবে গড়ে তুলতে নিজেদেরও প্রস্তুত হতে হবে। অর্জন করতে হবে ইতিবাচক নানা গুণ। মা-বাবার এই সাধনা শুধু তাদের সন্তানকে সাফল্যের মুখ দেখাবে না, জাতিও পাবে যোগ্য উত্তরসূরি।