Sun Sun Sun Sun Sun
English

পরিবার ভাঙ্গন-বিশৃঙ্খলার দায় সন্তানের বেড়ে ওঠার বয়সে
বাবা ও মা এর ভালোবাসার তারতম্য

|| ড. এম হেলাল ||
সন্তানের অবারিত কল্যাণ এবং সুউন্নত জীবন চান সকল বাবা-মা। তাই সকল সম্পর্কের শীর্ষে বাবা ও মা এর অবস্থান। বাবা এবং মা দু`জনেই সন্তানকে নিজ স্নেহ-মমতার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ভালোবাসেন। আমার দেখা-জানা ও বোঝায় এটুকু উপলব্ধি হয়েছে যে, বাবা-মা দু`জনেই সন্তানকে প্রায় সমানভাবেই ভালোবাসেন। এক্ষেত্রে দু`জনের ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য তথা একান্ত আবেগ-অনুভূতি ও জ্ঞান-বিদ্যা-বুদ্ধির তারতম্যের কারণে সন্তানের প্রতি ভালোবাসায়ও তারতম্য দেখা যায়। বাবা-মা এর জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশেষত ভালোবাসার প্রকাশ ও প্রদর্শনের ধরনে এমনকি তাদের Extrovert-Introvert Character এর কারণেও একই সন্তানের প্রতি দু`জনের আচরণ ও ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গি দু`রকম দেখা যায়। তবে সাধারণত কেউই কারুর তুলনায় তাদের সন্তানকে কম ভালোবাসেন না।

সন্তানের শিশু অবস্থায় বাবা-মা`র এ ভালোবাসার তারতম্য কম থাকে। তবে শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাবা ও মায়ের ভালোবাসার রকম-সকমে তারতম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর প্রধানতম কারণ সাধারণত শিশুর বাড়ন্ত বয়স থেকেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাবা সন্তানকে Ethics-Manner-Behaviour-Ambition এরূপ বিষয়ে বলতে থাকেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনড় তথা Uncompromising থাকেন; আর মা এসব বিষয়ে কম বলেন অথবা কোমল ও Compromising থাকেন। একদিকে মায়ের এই কোমলতা ও Compromising Attitude এর সুযোগ নিয়ে সন্তান মায়ের প্রতি অধিক আকৃষ্ট হতে থাকে, অন্যদিকে Ethical বিষয়াদিতে বাবার অধিক সম্পৃক্ততার কারণে এবং প্রশ্রয়ের ক্ষেত্রে কঠোরতার কারণে বাবার প্রতি সন্তানের আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে কম বৃদ্ধি পায় কিংবা শৈশবে-সৃষ্ট আকর্ষণ হ্রাস পায়। তবে এ আচরণ উল্টো হতে থাকে তখন, যখন ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে উপরে বর্ণিত বাবার Uncompromising আচরণগুলো মা করতে থাকেন এবং মায়ের Compromising আচরণগুলো বাবা করতে থাকেন। অবুঝ-সবুজ শিশুসন্তান এমনই হয়, সে যার কাছে প্রশ্রয় পাবে তার কাছেই বেশি ঘেঁষবে, তার প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হবে এটিই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে স্বভাবতই মা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকেন।

এ কথার প্রমাণে কেউ আগ্রহী হলে নিম্নোক্তরূপ জরিপ পরিচালনা করেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে বিশ্বাস।

এক্ষেত্রে যেকোনো একটি সমাজ থেকে ১০০ পরিবারকে আপনার অবজারভেশনে নিতে পারেন, যে পরিবারে মা-বাবা এবং ছোট-বড় ৩/৪জন সন্তান আছে। তবে জরিপ পরিচালনার জন্য পরিবার নির্বাচনে একটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে যে, বাবা-মা দু`জনেই শিক্ষায় প্রায় সমান অবস্থানে এবং আচার-আচরণেও স্বাভাবিক। অর্থাৎ দু`জনেই মোটামুটি যুক্তিগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এরূপ ১০০ পরিবারকে কয়েক বছর ধরে অবজারভ করলে আমার উপরোক্ত মতামতের সত্যতা মিলবে বলে বিশ্বাস। এমনও ফলাফল আসতে পারে যে, সন্তানের দৈনন্দিন চালচলনে মায়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়জনিত ভালোবাসা অত্যধিক ও অপরিমেয় হলেও সন্তানের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধিতে এবং Ethics-Manner-Ambition সংক্রান্ত চরিত্র গঠনে বাবার ভালোবাসা দূরদর্শী, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অতুলনীয়। এক্ষেত্রে একটি বাস্তব উদাহরণ দিতে চাই।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন ৮০`র দশকের শেষদিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রজ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের প্রাজ্ঞ সচিব ও নজরুল সঙ্গীত শিল্পী জনাব আসাফ-উদ-দৌলার সাথে দেখা করতে যাই। তখন তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং Strong Personality এর কঠিন-নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। এখনকার এ সচিবালয়েই মন্ত্রী ও সচিবদের রুমগুলো ছিল তখন অনেক বড়, পরবর্তীতে সেগুলো ভেঙে ছোট করে রুমসংখ্যা বাড়ানো হয়।

সচিব মহোদয়ের বিশাল রুমে ঢুকতেই প্রথমে নজর পড়ল তাঁর ঠিক পেছনের দেয়ালে আমার অচেনা একটি ছবি। আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে তিনি ফাইল সই করছিলেন। ইত্যবসরে আমি কৌতূহলী হয়ে সচিব-কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। দেখলাম, তাঁর পেছনে থাকা আমার অচেনা ছবিটির মতোই আরেকটি ছবি তাঁর সম্মুখ দেয়ালে। যতই সময় গড়াচ্ছে তাঁর পেছন-দেয়ালে ও সম্মুখ-দেয়ালে রাখা এ দু`টি ছবির প্রতি আমার কৌতূহলও বেড়েই চলছে। মিনিট পাঁচ এর মধ্যে তিনি ফাইল শেষ করে আমার দিকে তাকাতেই আমি একরকম সাহস নিয়ে বলে ফেললাম স্যার, এ ছবি দু`টি কার?

তিনি ছবির দিকে অপলকনেত্রে তাকিয়ে থেকে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি খুব বিব্রত হলাম। ভাবলাম কড়া মেজাজের এ সচিবকে কেন যে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে ফেললাম। তার চেয়ে সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ তথা সাক্ষাৎকার নেয়ার প্রশ্ন শুরু করলেইতো পারতাম!

এক পর্যায়ে দেখলাম, তাঁর চশমার দু`পাশ দিয়ে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। অবশ্য তৎপূর্বে আমি আরো কয়েক সচিবের বিশেষত বিদ্বান-গবেষক ও গণমানুষের কল্যাণকামী সচিব-ব্যক্তিত্ব ড. এম এ সাত্তার (বাড়ি চাঁদপুর) এর অশ্রু দেখেছি সচিব-চেয়ারে তাঁর আসীন অবস্থায়। এরূপ দেখতে অভ্যস্ত বলে জনাব আসাফ-উদ-দৌলার অশ্রু দেখে প্রথমে নিজকে সামলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার চোখের পানিও ধরে রাখতে পারিনি তখন, যখন তিনি পেছনে চেয়ার ঘুরিয়ে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন...।

এরপর কান্না কমিয়ে আমাকে আবেগতাড়িত ধমকের স্বরে বললেন আসাফ-উদ-দৌলার রুমে এভাবে কার ছবি থাকতে পারে, তা তুমি কেন বুঝতে পারোনি? বাবা-মা ছাড়া আর কার ছবি আসাফ-উদ-দৌলার সামনে ও পেছনে থাকতে পারে? এরপর চোখ মুছতে মুছতে তিনি বললেন তুমি চা খেয়ে চলে যাও, আজ আর সাক্ষাৎকার দিতে পারব না। বেল টিপে পিওনকে বললেন ওকে চা-নাস্তা দাও। বললাম স্যার, চা-নাস্তা লাগবে না, আমি আজ আসি; তবে যাবার আগে একটি কৌতূহল মেটাতে ইচ্ছে করছিল বাবার ছবিটি পেছনে আর মায়ের ছবিটি সামনে কেন! এর উল্টোটিওতো হতে পারত কিংবা দু`জনের ছবি একই স্থানে কিংবা পাশাপাশি থাকতে পারত।

তখন একটু সম্বিত ফিরিয়ে কিঞ্চিৎ মুচকি হেসে বললেন কেন, তুমি কি ভাবছ যে, বাবার ছবি পেছনে রাখায় বাবার প্রতি অবহেলা হচ্ছে? এরপর শুরু করলেন প্রাসঙ্গিক গল্প মা হচ্ছেন আমার সকল মায়া-মমতা ও স্নেহের প্রতীক; আর বাবা হচ্ছেন আমার কর্তৃক জনস্বার্থ সংরক্ষণের যেকোনো ক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যার সুকঠিন দ্বন্দ্বে সরকারের সচিব হিসেবে আমার নিরপেক্ষ মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত প্রদানে কঠোরতার প্রতীক। আজকে সচিব-চেয়ারে বসতে পারার ক্ষেত্রে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমার বাবার নীতি-আদর্শ ও দূরদর্শী কঠোর ভূমিকার কথা আমি পালন করছি এভাবে বাবা যেন আমার মাথার উপর থেকে আমাকে নীতিনিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন..। একথা বলে তিনি আবারও কেঁদে উঠলেন।

অফিসের সময় গড়িয়ে তখন ৬টারও বেশি। আমাকে তিনি সময় দিয়েছিলেন ৫টায়, যাতে সরকারি কাজের দায়িত্ব সেরে তারপর ব্যক্তিগত ঐ সাক্ষাৎকার দেয়া যায়। কান্নার মধ্যে চোখ মুছতে মুছতেই বললেন Ethics এর ক্ষেত্রে বাবার সাথে আমার রয়েছে শত স্মৃতি আর গভীর অনুভূতি। একদিন বাবা অফিস থেকে ফিরলেন। জামা-কাপড় খুলতেই বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আমি (কিশোর আসাফ) আবেগ-আহল্লাদের জোয়ারে বাবাকে বললাম, আজ পাড়ার ফুটবল খেলায় আমরা জিতেছি। বাবা আমাকে কোনো উত্তর না দিয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ও পড়াশুনা করেছে? মা সরলভাবে সত্যিকথা বলে দিলেন ও আজ পড়ার টেবিলে বসেনি। তখন বাবা রাগান্বিত হয়ে আমার পিঠে সজোরে থাপ্পড় মেরে দিলেন। আমিতো ফ্লোরে পড়ে গেলাম। মা সেখান থেকে উঠিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে বিছানায় শোয়ালেন এবং নিজেই আমার পাশে শুয়ে ঘুমালেন।

রাতে টের পেলাম আমার পিঠে কে যেন মালিশ করছে। চোখ খুলে অন্ধকারে কিছু দেখছিলাম না। কেঁদে উঠে মাকে বললাম মা, মশারি উঠিয়ে কে যেন আমার পাশ থেকে চলে গেল। এ ঘটনার অনেকদিন পর, না জানি বাবার ইন্তেকালের পর বাবার সেদিনের Tragedy মা আমাকে বলে দিলেন। এতদিন বলেননি, কারণ বাবা নাকি মাকে নিষেধ করেছেন রাতে আমার বিছানায় এসে আমার শরীরে তেল মালিশ করার কথা আমাকে না জানাতে, যাতে আমি প্রশ্রয় পেয়ে না যাই...।

মা আরও বললেন তোর বাবা তোর গায়ে হাত তুলে সেই সন্ধ্যায় ঠিকমতো খাননি, আমরা সবাই ঘুমিয়ে গেলেও তিনি ঘুমোতে পারেননি। তাই সবাই ঘুমানোর পর তিনি তোর পাশে বসে পিঠে মালিশ করছিলেন, তুই জেগে যাবার পর মশারি উঠিয়ে চুপিচুপি পালিয়ে গেলেন; কারণ, নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করলে তুই যদি আবার প্রশ্রয় পেয়ে যাস্...।

প্রিয় পাঠক, সন্তানের কোনো বয়সেই মা তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা চেপে রাখতে পারেন না এটিই মা`র বৈশিষ্ট্য। আর বাবা তাঁর সন্তানের শিশু অবস্থায় কোলে নিয়ে স্নেহ-ভালোবাসা প্রকাশ করেন ঠিকই, কিন্তু সন্তানের বেড়ে ওঠাকালীন বাবা তাঁর ভালোবাসা অত্যন্ত সযতনে আড়াল করে তদস্থলে Ethics-Manner-Ambition শেখানোর নিরন্তর প্রচেষ্টায় নিবিষ্ট থাকেন। তাই শিশু-কিশোর আসাফদের প্রাথমিক জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধিকালীন বাবার সঙ্গোপন সেই ভালোবাসা বোঝার আপাত ক্ষমতা হয় না, তবে তারাই বিদ্যা-বুদ্ধিতে বড় হয়ে কিংবা বাবা হয়ে কিংবা বাবাকে হারিয়ে অতঃপর বাবার সুপ্ত-অমিয় ভালোবাসাগুলো স্মৃতিকাতর অনুভবে আবিষ্কার করতে থাকে।

আমার পারিবারিক জীবনেও আমি সন্তানদেরকে বুকের গহীনের স্নেহ-ভালোবাসার সবটুকু না দেখিয়ে তথা Balanced & Controlled ভালোবাসায় অভিষিক্ত করে তাদের বেড়ে ওঠার সন্ধিক্ষণে তাদের আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, কথাবার্তা, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সম্পর্কে গাইড করেছি। ছোটবেলা থেকেই এরূপ স্বপ্ন লালন করেছি আমার স্ত্রী হবে বিদুষী-মহীয়সী, বিনয়ী-নিরহংকারী বিশেষ মানুষ; আর সন্তানরা হবে দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সেবক ও সম্পদ। তাইতো বহু কষ্ট করে ছোট্ট শিশু-সন্তানদেরকে নিজের কাছে রেখে স্ত্রীকে বিলেতে ও হল্যান্ডে উচ্চ শিক্ষায় বিকশিত হতে উদ্বুদ্ধ করেছি, আর পারিবারিক কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে পরিবার-সদস্যদের ভুল-ত্রুটি শুধরে দিয়ে তাদেরকে বিশেষ মানুষরূপে গড়ে ওঠার চেতনা যুগিয়েছি; তাদের মনুষ্যত্ব ও মানবতাবোধের বিকাশে প্রতিদিনই কোয়ালিটি-টাইম দিয়েছি। তারা যাতে উন্নততর বিশেষ মানুষরূপে গড়ে উঠতে পারে, তজ্জন্য বিভিন্নভাবে পারিবারিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-ধর্মকর্ম, এমনকি বিশেষ দিনে স্ত্রী-সন্তান, আয়া-বুয়াসহ সবাইকে সাথে নিয়ে পারিবারিক জামাতে নামাজ, দোয়া-দুরুদ-যেকের-মিলাদ, মেডিটেশন ইত্যাদি পরিচালনা করেছি আমি। Ambition-Ethics-Manner-Behaviour শেখানোর ক্ষেত্রে সর্বোত প্রচেষ্টা সার্বক্ষণিক চালিয়েছি; প্রশ্রয় দিইনি এসবের উল্টোপথে কিংবা ফেসবুক, ফোন, ইন্টারনেটের অপব্যবহারে। কারণ শিশু-কিশোর বয়সে ঐসবে দুর্বলতা দেখালে তারা সঠিক মান-হুঁশ রূপে গড়ে উঠতে পারবে না। ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে উৎকর্ষ জীবন সাধনায় উদ্বুদ্ধ করতে ভালো কাজে পুরস্কার ও মন্দ কাজে তিরস্কার ব্যবস্থা চালু রেখেছি। আমার এসকল প্রয়াস কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিংবা কারুর মতে নিষ্ঠুরতার মতো মনে হতে পারে। অথচ তাদের গড়ে ওঠার এ বয়সে Balanced & Controlled ভালোবাসা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আমার ৩ সন্তানের মধ্যে বড় দু`ছেলেমেয়ে ক্ষুদে কলামিস্ট হিসেবে বহুল পরিচিতি পেয়েছে। তাদের সেসব লেখা নিয়ে তাদেরই নামে দু`টি বইও আমি প্রকাশ করে দিয়েছি, অর্থাৎ শিশু-কিশোর বয়সেই তারা গ্রন্থকারও বটে। এসবই তাদেরকে ঘিরে বাবা হিসেবে আমার সুদীর্ঘ শ্রম-সাধনার ফসল। ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যেকোনো উন্নয়ন-উৎকর্ষ ও আধুনিকতার উৎসস্থল হচ্ছে পরিবার। অধিকাংশ শিশুই জন্মের পর থেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিমূলক আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং উচ্ছৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল নানা বিষয় তার মস্তিষ্কে গেঁথে যায় বা প্রোগ্রামিং হয়ে যায়; পরবর্তীতে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে।

অসৎ কিংবা বাড়তি উপার্জনে গড়ে ওঠা বিত্তশালী পরিবারে বেড়ে উঠছে অবুঝ-সবুজ শিশু-কিশোররা; তাদেরকে কোয়ালিটি টাইম কিংবা পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে তাদের পেছনে কেবল অঢেল টাকা ঢেলে মাতা-পিতার আপাত অনুগত করে গড়ে তোলা হচ্ছে। স্কুল কিংবা কলেজ পড়–য়া ছেলে-মেয়েদেরকে স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ফ্রি ওয়াইফাই, অবারিত ইন্টারনেট, ফেসবুক ইত্যাকার অবাধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদেরকে গঠনমূলক ও নৈতিক শিক্ষা থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। শিশু-কিশোর বয়সকে রঙিন-চাকচিক্যে বিভোর রেখে ভবিষ্যতের লক্ষ্য কিংবা Ambition থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। পরিণামে তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কাছে পরাজিত হয়ে অভিভাবককেই মেনে নিতে হচ্ছে সন্তানের সকল অন্যায় আবদার। বিত্তের প্রতি মা-বাবার উন্মত্ত আসক্তি এবং অর্থের কাছে স-ক-ল নৈতিকতার পরাজয় দেখে দেখে সন্তানদের মাঝে জেগে উঠছে রঙিন চটকদার লোভের নেশা। নীতি-আদর্শ-বিবেক কোনোকিছুর স্থান নেই এ অন্ধ নেশার কাছে। গন্তব্যহীন এক সর্বনাশা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছি আমরা। তাই কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মাথায় পড়ালেখার বিষয়টি কিঞ্চিৎ কাজ করলেও কল্যাণকর জ্ঞান কিংবা সৃজনশীলতার বিষয় কাজ করে না মোটেও।

আমাদেরকে ফিরে আসতে হবে সৌন্দর্যের কাছে, পারিবারিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধগুলোর কাছে। সন্তানদেরকে দিতে হবে অনন্ত সৌন্দর্যময় জগতের সন্ধান; দেখাতে হবে স্থায়ী আনন্দের জগৎ, নিয়ে যেতে হবে সুদূর আনন্দালোকে, শেখাতে হবে দেশপ্রেম, ভালোবাসার মাধুর্য ও ত্যাগের আনন্দ। তবেই তারা হবে পরিপূর্ণ মানুষ। দেশ যাদের নিয়ে গর্ব করবে এবং যারা গর্ব করবে দেশ ও জাতিকে নিয়ে। আজকের শিশু-কিশোররাই আপনার দুঃখ-হতাশা এবং দেশ ও জাতির দুর্যোগ-দুর্গতি-দারিদ্র্যসহ সকল অন্ধকার দূর করে দেবে; যদি তাদের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং যুক্তি ও ন্যায়ের চর্চা গড়ে তুলতে পারেন; যদি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেন মানব-চরিতের বেস্ট প্র্যাকটিস বা সর্বোৎকৃষ্ট চর্চাগুলো, যদি শিশু-কিশোরদের মনে জ্বালাতে পারেন আলোর বহ্নিশিখা (Igniting mind).

এসব ক্ষেত্রে পিতা-মাতা পরস্পরের প্রতি সহনশীল কম্প্রোমাইজ এবং সহজ-সরল বোঝাপড়ার মধ্যে থেকে সন্তানের ভবিষ্যৎ কল্যাণে সুদূরপ্রসারী চিন্তায় ও কর্মে নিবেদিত থাকা অতীব জরুরি। পরিবার-প্রধান হিসেবে পিতার দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী মায়ের সার্বক্ষণিক চৌকস তদারকি সন্তানের বড় হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য। এরূপ পারিবারিক শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে মা কিংবা বাবার মধ্যে কেউ যদি নিজ জ্ঞান-গরিমার অহংকারে ও একক ইচ্ছায় কিংবা অর্থ-ঔদ্ধত্যে সন্তানদেরকে নিজ অনুগত করে তুলতে চান তখনই হয় বিপত্তি-বিসংবাদ কিংবা পারিবারিক ভাঙ্গন। এরূপ ভাঙন-পরিবারের বিশৃঙ্খলা-উচ্ছৃঙ্খলার বোঝা ও অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি কাল থেকে কালান্তরে বয়ে যেতে হয় সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি সমগ্র বিশ্বকে।

মহাপবিত্র কোরআন এর সুরা নিসায়ও বর্ণিত আছে, জায়েজকৃত সকল কর্মের নিকৃষ্টতম হচ্ছে বিবাহবিচ্ছেদ তথা পরিবার ভাঙন। আরও বর্ণিত আছে আত্মঅহংকারী দাম্ভিকদেরকে আল্লাহ কখনো পছন্দ করেন না। তাই সকল ধর্ম ও সৃষ্টি জগতের বেঁধে দেয়া নিয়মের বাইরে গিয়ে আত্মঅহংকারের একক ইচ্ছায় কিংবা ভঙ্গুর পরিবার প্রথায় যারা বিশ্বাসী -তারা ইহকালে দায়ী থাকবেন সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে, আর পরকালে স্রষ্টার বিচারের মুখোমুখি হওয়াতো স্বাভাবিক।