Sun Sun Sun Sun Sun
English

অকৃতজ্ঞ হইওনা; উপকারীর ক্ষতির চেষ্টায়
নিজের ধ্বংস ডেকে এনো না

|| ড. এম হেলাল ||
অন্যের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা পোষণ নিজের সহজতা, উদারতা ও সুস্থতার জন্যই প্রয়োজন। উপকারীর উপকার স্বীকার না করা এবং তাকে কৃতজ্ঞতা না জানানো কিংবা অন্যের নিকট নিজ ঋণের কথা স্বীকার ও প্রকাশ না করা মানসিক সংকীর্ণতার পরিচায়ক। অন্যকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো মানে দায় পরিশোধের সার্টিফিকেট তথা স্বস্তিলাভ।

নিজের বিবেককে যদি বলা যায় যে আমি যার কাছ থেকে যে সুযোগ-সুবিধা-সহযোগিতা, কর্ম ও সেবা গ্রহণ করে দায়ে পড়েছি, তজ্জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় থেকে, ধন্যবাদার্হ হয়ে দায়মুক্ত হতে পেরেছি তাহলে আপন অন্তর্জগত ভারমুক্ত হবে। পিছুটানহীন এই সহজ-সরল, স্বস্তিকর অনুভূতি মস্তিষ্কে ও মননে আনন্দ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্ক থেকে সে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেহ-মনে; যে আনন্দের আতিশয্যে শারীরিক-মানসিক জ্বালা-যন্ত্রণা, ব্যথা-বেদনা দূর এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধের শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তৈরি হতে থাকে নিজের ভেতরে।

দৈনন্দিন জীবন-যাপনের প্রতি পদে পদে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে এবং স্রষ্টা ও প্রকৃতি থেকে আমরা কত রকমের সার্ভিস যে গ্রহণ করে চলেছি, তার হিসাব কষতে গেলে কাগজ-কলম ফুরিয়ে যাবে। অন্যের সেবা গ্রহণ করতে আমাদের অনেকেরই লজ্জা হয় না, অথচ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে লজ্জিত হই কিংবা কুণ্ঠিত হই; এটি হীনম্মন্যতা তথা এক ধরনের মানসিক রোগ। আমরা নিশ্চয়ই নিজকে মানসিক রোগী বা নির্বোধ বলে পরিচিত করতে চাই না। মহাকবি শেখ সাদীও বলেছেন যার বুদ্ধি নেই, তার থেকে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা আশা করো না। যে সেবাটি যে মানুষকে আমি দিতে পারব না কিংবা যে কাজটি করার সক্ষমতা আমার নেই সেই সেবা, সেই কাজ ঐ মানুষ থেকে গ্রহণ করা বা ভোগ করা মানে তার কাছে আমার ঋণগ্রস্ত হওয়া নয় কি? তাই অন্য অনেকের পাশাপাশি সুইপার বা ক্লিনারের কাছেও কি আমি ঋণী নই? তার বা তাদের কাছে ঋণ স্বীকার নাইবা করলাম, কিন্তু নিজের মধ্যে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা এবং মানবিক গুণ তৈরি ও লালনে অসুবিধা কোথায়? সেই গুণ অর্জনে অনীহা ও ব্যর্থতা মনুষ্যত্বহীনতার পরিচায়ক নয় কী? মনুষ্যত্বহীন মানুষ অবিরাম সাফল্যের পথে এগুবে কী করে?

কেবলই অর্থের বিনিময়ে এ ঋণ শোধ করার মানসিকতা কিন্তু অমানবিকতা বলে পরিগণ্য। এটি স্বার্থপরতা, ঔদ্ধত্য, গোঁড়ামি ও অবৈজ্ঞানিক মানসিকতার পরিচায়ক। এত্তসব সেবা যাদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়ত গ্রহণ করে যাচ্ছি তাদের সবার কাছে গিয়ে ঋণ পরিশোধের বা দায় মোচনের কিংবা কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি নাইবা করলাম; অন্তত নিজের ভেতরে কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি বা বিনয়বোধ জাগাতে সমস্যা কোথায়? এসব সেবা-সংশ্লিষ্টদের জন্য মনে মনে Wish বা শুভকামনা জানাতে সমস্যা কী? আমার ঋণ স্বীকারে ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপনে তাদের লাভ হোক বা না হোক আমার দায়মোচন তথা আমার প্রশান্তি ও আমার লাভ নিশ্চিত হয়ে গেল। কারণ তাদেরকে শুভ ইচ্ছা জানানোর আকাক্সক্ষা আমার মস্তিষ্কে তৈরি হলে, তা মস্তিষ্ক থেকে আমারই দেহ-মনে সঞ্চারিত হয়ে তাদের উছিলায় আমার সবকিছুতে শুভ ও কল্যাণ ঘটতে থাকবে। অন্যদিকে নিজকে দায়মুক্ত, ভারমুক্ত ও ব্যালেন্সড মনে হবে। এতে আমার মানবিক গুণ তৈরি হলো, আমি উন্নত মননের স্তরে পৌঁছে গেলাম, আমি আলোকিত হলাম এবং সে আলোয় আমি সুস্থ ও সমৃদ্ধ হলাম; আমার আশপাশের মানুষদেরও ঐ আলোয় আলোকিত ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হল। কারণ চিন্তা ও মননের উচ্চ পর্যায়ে যারা পৌঁছাতে সক্ষম হন, তারা যা চান তাই হয়ে যায়। স্রষ্টার নিকট তাদের চাওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পূরণ হয়ে যায়।

কি আরাম, কি শান্তি, কি সহজ-সরল পথ এগুলো! অথচ এ সরল পথে না গিয়ে এবং নিশ্চিত শান্তি ও সমৃদ্ধি থেকে আমরা বঞ্চিত হয়ে নিজের স্বাস্থ্যহানি ও আয়ুক্ষয় করে চলেছি, সমাজকে করছি বিভ্রান্ত ও কলুষিত সে ধারণা আমাদের ক`জনের বোধে আসে? যাদের বোধে আসে, তারা এ দর্শন বা নীতি কতটা মান্য করছি? অন্যদেরকে এ সত্য-সুন্দরের পথে কতখানি উদ্বুদ্ধ করছি? এরূপ দৃঢ়কণ্ঠের দাবিদার এ সমাজে পাওয়া যাবে কতজন? যদি পাওয়া না যায়, তাহলে এ সমাজ বা জাতির গন্তব্য কোথায়? কারণ এসবই আমাদের স্বাস্থ্যসুখের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণ এবং জাতিগত সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্ববহ বিবেচ্য বিষয়। তাইতো কারও উপকার করার পর তিনি উপকার পেয়ে ধন্যবাদ দিক বা না দিক, উপকার গ্রহণের জন্য তাকে আমরা ধন্যবাদ দিয়ে নিজে আরো বড় হতে বাধা কোথায়? আমার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পাস`র বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-যুবকদেরকে এরূপ চর্চায় আমরা উদ্বুদ্ধ করি। রবী ঠাকুরের একটি রোমান্টিক বন্দনার সাথে ক্যাম্পাস`র এ দর্শনের বেশ মিল রয়েছে।

তোমারে যা দিয়েছিনু, সে তোমারই দান গ্রহণ করেছ যত, ঋণী তত করেছ আমায়।

অতীতে যাই করে থাকি না কেন, এখন থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের দর্শনে সবাই নিজ নিজ মানবিক গুণাবলি তৈরি ও বৃদ্ধির মাধ্যমে সুস্থ, নিরোগ, আলোকিত, সমৃদ্ধ জীবনের পথে পা বাড়াই। যার কাছ থেকে যা পাই, তজ্জন্য তাকে ধন্যবাদ দেই; স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। সবাই সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজের অহংকার ও ঔদ্ধত্যজনিত অসুস্থতা ঝেড়ে ফেলি। নিজ সুস্থতা ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করি, সমাজে-জাতিতে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনি।

তাছাড়া পরিবারের মধ্যেও পরস্পরকে ধন্যবাদ দেয়া এবং পরস্পরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মানসিকতা গড়ে তোলা দরকার। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি যাদের ত্যাগ ও সহযোগিতাকে আমরা নিশ্চিত প্রাপ্য বা Taken for granted বলে মনে করি এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করি। এরূপ হীন মানসিকতা ঝেড়ে ফেললে পারিবারিক শান্তি বৃদ্ধি পাবে। তাই আসুন, সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আমরা যাদের ওপর নির্ভরশীল এবং যাদের কাছে ঋণী, তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মানসিকতা তৈরি করে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হই।

আর দেখুন না, এই আমিওতো ঋণী আপনাদের সবার কাছে নিশিত নিদ্রা ত্যাগ করে লেখা আমার এ কথাগুলো পড়ার জন্য। তাই এ ভবঘুরের সহজ-সরল চেতনাকে লালন করার জন্য আগাম ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। এ লেখা শেষ করব অকৃতজ্ঞতার পরিণামের দু`টি উদাহরণ দিয়ে। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আধুনিক কালের এক দম্পতির অকৃতজ্ঞতার দ্বন্দ্ব; অন্যটি হচ্ছে বণি ইসরাইল যুগের একটি উপাখ্যানে স্বামীর প্রতি এক নারীর অকৃতজ্ঞতার সকরুণ কাহিনী।

আধুনিক কালের দু`উচ্চশিক্ষিত পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে ভালোবেসে নিজেদের পছন্দে কাজী অফিসে গিয়ে সবার অলক্ষ্যে বিয়ে করে। বিয়ে করার পর স্ত্রী জানায়, এ বিয়ের আগে আরেক ছেলের সাথে তার দীর্ঘদিনের সকল প্রকার সম্পর্ক ছিল। স্ত্রীর এরূপ স্বতঃপ্রণোদিত সত্য কথায় স্বামী মুগ্ধ হন এবং স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেন তোমার এসব কথায় আমার কোনোরূপ খারাপ লাগছে না বরং অকপটে সত্য কথা বলার কারণে তোমার প্রতি অধিক ভক্তি কাজ করছে। এর ক`বছর পর স্ত্রী স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে যাবার সুযোগ পান। সে সুযোগের কথা শুনে স্ত্রীর বড় বোনের মন বেজায় খারাপ। কারণ, বোন যদি স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আসে, তখন তাদের পরিবারে ও সমাজে তার নিজের তুলনায় এ ছোট বোনের কদর ও আকর্ষণ বেড়ে যাবে; নিজের গুরুত্ব কমে যাবে। তাই Negative belief system এর ঐ বোন নিজে প্রভাব খাটিয়ে ব্যর্থ হয়ে তার স্বামীর মাধ্যমে বোনের স্বামীকে বলাতে থাকেন যে ওরতো মাত্র বিয়ে হলো, সুন্দরী মেয়ে বিদেশে গিয়ে বিপথগামী হতে পারে, দেশে আর ফিরে নাও আসতে পারে।

কিন্তু নদী বাধা পেয়ে যেমনি সরোবর হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি স্ত্রীর বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাবার বিষয়ে সংষ্কারমুক্ত, উদারপ্রাণ স্বামীর ইচ্ছাও কঠিন শপথে রূপ নেয়। তাই স্বামী বলল কেবল কমনওয়েল্্থ স্কলারশিপই নয়, যেকোনো সুযোগেই সে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে; তাতে স্বামী হিসেবে আমার বাধা দেয়া বিবাহগত চুক্তি ভঙ্গের অপরাধ, বৈবাহিক সিদ্ধান্তের বরখেলাপ। স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণেœর পাপ রয়েছে এতে, যা আমি কোনোক্রমেই করতে পারি না। অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কেবল স্ত্রী বা সন্তানকে নয়, যে কাউকেই সহযোগিতা দান সবারই সর্বতোভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য। অধ্যয়নকে অগ্রাধিকার না দিলেতো সত্যকে অবহেলা করা হবে। এভাবে স্ত্রীর বিদেশে অধ্যয়নের সকল বাধা-বিপত্তি দূরিভূত করার সকল দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে তাকে বিমান বন্দরে নিয়ে যায় এবং ব্রিটিশ প্লেনে তুলে দিতে গিয়ে নববধূর প্রতি স্বামীর শেষ কথা ছিল Don`t hesitate to enjoy anything around your world..

এভাবেই শ্বশুরালয়ের উক্ত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল ঐ স্বামীকে। শ্বশুর পরিবারের ঐ সদস্যদের নেতিবাচক বিশ্বাসের পাল্লায় সেদিন যদি তিনি পড়ে যেতেন তাহলে স্ত্রীর জীবনের Major turning point দুর্বল হয়ে যেত এবং তাদের সংশ্লিষ্ট সবার পরিণতি যে কী হতো, তা সহজেই অনুমেয়। সেক্ষেত্রে শ্বশুর পরিবারকে দোষারোপ করে হয়ত পার পাওয়া যেত, কিন্তু নিজের বেঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তথা Negetive belief system এর পাপের ফল থেকে কি রেহাই পাওয়া যেত?

এর ক`বছর পর সেই স্ত্রী অনুরূপভাবে স্বামীর ঐকান্তিক সহযোগিতায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় ইউরোপ থেকে পিএইচডি করে আসেন। দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন মানুষ মাঝে মাঝে তাকে স্ত্রী সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলে। কিন্তু স্বামী সেসব কথায় কর্ণপাত না করে স্ত্রী বিদেশে থাকাকালীন সন্তানদের নিয়ে দেশে অতীব কষ্ট সহ্য করে এবং নিঃসঙ্গতায় ধৈর্য ধরে স্ত্রীর বিদেশে থাকাকালীন বছরের পর বছর সময় পার করেন। এমনকি স্ত্রীর ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে উদার-ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখেন। এভাবে দু`যুগের বিবাহিত জীবনে ১ মেয়ে ও ২ ছেলের গর্বিত জনক-জননী হন তারা। Self-made man বাবার ব্যতিক্রমী ধ্যান-ধারণায় তিনি সন্তানদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যে, স্কুল-জীবনেই ছেলে-মেয়েরা হয়ে ওঠে লেখক, কলামিস্ট, গ্রন্থকার, স্কাউট লিডার, উপস্থাপক এবং স্ত্রী দ্রুতগতিতে সমাজের শীর্ষস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে ওঠেন। নিজের এরূপ উচ্চ-আসনের জন্য বিভিন্ন সময়ে স্ত্রী তাঁর কর্মস্থলসহ বিভিন্ন ফোরামে অকপটে বলেছেন যে, তার এত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সব সঞ্চয়ন হয়েছে তার সুদক্ষ ও দূরদর্শী স্বামীর কাছ থেকে। তাছাড়া বিবাহের ২০তম বছরের এক সন্ধ্যায় তিনি তার নিজের একটি লেখায় স্বামীকে উপস্থাপন করেন এভাবে যা তারই ভাষায়, এবং তারই লেখনিতে তুলে ধরা হলো

তার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ২০ বছর আগে। বিদেশে পড়তে যাওয়া; তারপর বৃত্তি নিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রিলাভ এইসব ধাপে দেখেছি নানা জাতের নানা মানুষ। কর্মজীবনে দেশে-বিদেশে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে জ্ঞানী-গুণী অনেককে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫টি দেশে গিয়েছি আমি। নানান পরিবেশে, নানান কর্মে মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ লক্ষ্য করেছি অপার কৌতূহলে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, চিন্তা, আদর্শ, সততা, সৃজনশীলতা সব মিলিয়ে এক চমৎকার ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্বের আমার প্রিয় এ স্বামীর সঙ্গে আমি জীবনের তরী বেয়ে চলেছি।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর সম্পর্কে কিছু কথা এখানে তুলে ধরছি।
- কঠোর পরিশ্রমী, সৃজনশীল, কৌশলী, ধৈর্যশীল, সৎ এবং অন্যায়ের সাথে আপোশহীন আমার স্বামী।
- যেকোনো পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলা করার তার জুড়ি মেলা ভার।
- যেকোনো অবস্থায় অত্যন্ত Tactful; লক্ষ্য অর্জনে ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিমত্তা তার মধ্যে Naturally কাজ করে।
- সত্যবাদিতার প্রতি অপরিসীম অনুরাগ এবং মিথ্যাচারের প্রতি ভীষণ বিরাগ। তাই সর্বদাই ভালো কাজকে Welcome করেন, আর মন্দ কাজকে Resist করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে ও পরিবারে তাই ভালো কাজের জন্য রয়েছে পুরস্কার, আর মন্দ কাজে রয়েছে তিরস্কার।
- সমাজের অনেক অনিয়ম-অধিকার ভঙ্গের বেদনা যখন প্রায় সকলেই নীরবে সহ্য করে যান, সেখানে সমাজের বিবেক হিসেবে বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তাঁর মজ্জাগত। অনেক সময়ই অন্যের চাপিয়ে দেয়া অন্যায় শর্ত যখন আমরা অবশ্য-পালনীয় বলে মেনে নেই, তিনি সেখানেও খেয়াল করেন মানুষের অধিকার খর্ব হচ্ছে কি হচ্ছে না। অধিকার খর্ব হলে তার সংশোধনের উদ্যোগ নেন।
- স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। তাঁর খাদ্যাভ্যাস অনন্য। আমাদের সাধারণ বিচারে কোনো খাবার মজাদার নাকি স্বাদহীন, সেটা মুখ্য বিবেচ্য হলেও তার নিকট বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে খাবারের পুষ্টিগুণ। সবজি, মাছ, স্যুপ, সালাদ, মধু, দুধ, ফল -এসব খাবারই তার প্রিয়। স্বাস্থ্যসম্মত বা পুষ্টিগুণসম্পন্ন হলে স্বাদহীন খাবারও তিনি আগ্রহভরে খেয়ে নেন। বিয়ে-বাড়ির রোস্ট-পোলাও রেখে ঘরে ফিরে লাউ তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া তার জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। পরিমিত খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত মেডিটেশন, ইয়োগা -এসব তার জীবনের অপরিহার্য অংশ।
- তিনি একজন Simple মানুষ। তাই Simplicity কে স্বাগত জানান সবসময়। চলাফেরায় সিনিয়র-জুনিয়র সবার সাথে তিনি সহজভাবে মেশেন, সহজ-সরল কথা বলেন, সহজভাবে মনের কথা প্রকাশ করেন। তাতে কেউ রুষ্ট হলো না তুষ্ট হলো, তা তিনি আমলে নেন না। বিবেক-বুদ্ধিতে যা ন্যায়সঙ্গত মনে করেন, তা বলতে বা পালন করতে তিনি পিছপা হন না। তিনি জনপ্রিয়তার মোহে ভোগেন না, জনকল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার দর্শনই তাঁর জীবন-দর্শন।
- তিনি চমৎকার লেখক। খুবই সাবলীল ভাষায় যুক্তির মাধ্যমে গভীর জীবনদর্শনকে সহজভাবে যেমন বোঝাতে পারেন, আবার সামাজিক-রাজনৈতিক নানা বিষয়কে অন্য দৃষ্টিতে উপস্থাপনে তাঁর তুলনা নেই। জীবনে সফলতার শিখরে ওঠার জন্য, জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধির জন্য তথা নিজেকে উন্নততর মানুষরূপে গড়ে তোলার জন্য তার প্রকাশিত বইগুলো সবার জন্য অবশ্য পাঠ্য।
- আমার স্বামী সহজ-সরলপ্রাণ মানুষ। গরিব-দুঃখী সাধারণ মানুষের জন্য ভীষণ সহানুভূতিপ্রবণ তিনি। ঈদ-শবেবরাত ইত্যাদি নানা সামাজিক ধর্মীয় উৎসবে তিনি সর্বপ্রথম আপ্যায়ন করেন বাড়ির দারোয়ান-গার্ড-পিয়ন-বুয়া-ঝাড়–দার -এদের; তারপর অন্য অতিথি আপ্যায়ন এবং অতঃপর নিজের খাবার।
- পরিশ্রমী, উদ্যমী ব্যক্তিত্ব তিনি। কঠোর পরিশ্রম, হাজার রকম কাজের ঝামেলায় পারিবারিক অনেক দৈনন্দিন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সময় দিতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি তার বিশেষ মনোযোগ সর্বদাই থাকে। যখনই সময় পান পরিবারের সদস্যদের সাথে একত্রে বসে নানান বিষয়ে পর্যালোচনা করেন; সর্বোপরি আদর আর শাসনের এক চমৎকার ব্যালেন্স কাজ করে তার মাঝে।
- আমার স্বামী আগাগোড়া একজন আধুনিক চিন্তার মানুষ। তিনি জীবন-জগৎ নিয়ে নতুন নতুন উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ। সেই উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ কখনও কোমল, কখনও কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এমন একজন মানুষের অনেক কাছে থাকলেই বোঝা যায় এ মানুষটি দারুণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যার আলো নেয়ার ক্ষমতা অনেকের থাকে না বলেই তাঁকে ভুল বুঝতে পারে; কিন্তু তাঁর দর্শনগুলো বুঝতে পারে যারা, তারা নিজেরাও আলোকিত হয়ে যায়।
- আপ্যায়ন প্রিয় মানুষ তিনি। অফিসে কিংবা বাসায় -মানুষকে যতœ করে আপ্যায়ন করতে তিনি খুবই ভালোবাসেন। ব্যতিক্রমী কিন্তু স্বাস্থ্যসম্মত খাবারে, ব্যতিক্রমী উপস্থাপনায় অতিথিদের মুগ্ধ করায় তাঁর সুবুদ্ধি ও উপস্থাপনা কৌশল অতুলনীয়।
- এই সমাজে আমরা যখন অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভারসাম্যহীন আচরণ করতে থাকি, তখন তাকে আমি দেখেছি নিজের বিশ্বাস আর আদর্শে অটল থেকে সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকতে। তিনি অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন না কখনও। যুক্তিকে গ্রহণ করেন সহজ-স্বাভাবিকভাবে।
- মানুষের অদম্য চিন্তাশক্তি এবং প্রকৃতির বিচার তথা প্রকৃতির প্রতিশোধ সম্পর্কে তাঁর বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস যেকোনো চিত্তকে আন্দোলিত করে। তার সরলতা, চিন্তার গভীরতা, দূরদৃষ্টি, অদম্য মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও অসাধারণ ধীশক্তির সমন্বিত কারিশমা আমি বহুক্ষেত্রেই দেখেছি। যার ফলে তাঁর সাথে কথার বরখেলাপ করে, মিথ্যা বলে, কিংবা লুকোচুরি করে তথা কোনো অন্যায় করে প্রাকৃতিকভাবেই অসুবিধায় কিংবা পেরেশানিতে পড়তে দেখেছি বহুজনকে-বহুভাবে। প্রকৃত-প্রাকৃত-সত্য-সুন্দর ও স্রষ্টার প্রতি তার মোহাবিষ্ট আকর্ষণ তাকে দৃঢ়প্রত্যয়ী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।
- এভাবেই বিজ্ঞানমনষ্ক, যুক্তিবাদী, অন্যের অধিকার সচেতন, সংবেদনশীল, সৃজনশীল একজন মানুষের সাথে আমার জীবনকে সংযুক্ত করতে পেরে আমি আমার জীবনাদর্শও সমৃদ্ধ করেছি।

স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনার এইরূপ ব্যতিক্রমী এ বিশাল মানুষটির প্রতিই স্ত্রী ক্রমান্বয়ে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন তার নিজ উত্থানের সাথে সাথে। তার সন্দেহের সুদীর্ঘ জালে কোনো মাছ কখনো ধরা না পড়লেও দু`একবার হয়ত কচ্ছপ ধরা পড়ে। স্বার্থান্ধ ও ইবলিশরূপী বিভিন্ন মানুষের উস্কানিতে ও প্ররোচনায় পড়ে স্ত্রী ধীরে ধীরে অহংকারী ও উচ্ছৃঙ্খল সন্দেহবাতিকের রোগীতে পরিণত হন।

বিভিন্ন মানুষের কানকথায় ও সামাজিক ইবলিশদের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেন। বাড়তে থাকে স্বামীর সাথে দূরত্ব। নিজ Negative belief system এ অনুসরণ করতে থাকেন স্বামীকে। তার সন্দেহের বেড়াজালে কচ্ছপ মিললেও কোনো মাছ মেলেনি। অবশেষে ঐ কচ্ছপকেই মাছ মনে করে তিনি নিজকে পাকা জেলেরূপে আত্মতুষ্ট করে নিজ সন্তানদের সাথে এবং অফিস-আদালত ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বামী-বিরোধী কথাবার্তা বলতে বলতে একসময়ে ঐ সন্দেহ-ইবলিশের ভুত তাকে ব্যাপক আছর করে ফেলে। ওদিকে স্বামীর কাছেও তার সেলিব্রেটি জাঁদরেল স্ত্রী সম্পর্কে নেতিবাচক বিভিন্ন খবর আসতে থাকলেও স্ত্রীর উপর অন্ধভক্ত স্বামী স্বভাবসুলভ সরলতায় এবং স্ত্রীর উপর অগাধ বিশ্বাস ও মমতার কারণে সেসবে কর্ণপাত করেননি এবং স্ত্রীকেও বাইরের ঐসব কথার কোনোকিছু বলেননি কিংবা জিজ্ঞাসা করেননি কোনোদিন।

সন্তানদেরকে উন্নততর মানুষরূপে গড়ে তুলতে স্বামীর বিভিন্ন পরামর্শকেও তার স্বভাবসুলভ সন্দেহের বেড়াজালে আবদ্ধ করে ঐসব পরামর্শ সন্তানদের নিকট এমনভাবে বলতে থাকেন, যাতে বাবার প্রতি সন্তানদের ভক্তি-শ্রদ্ধা কমতে থাকে; অন্যদিকে তার উপর অবুঝ কিশোর-কিশোরী সন্তানদের নির্ভরতা যাতে বাড়তে থাকে। এভাবে কয়েক মাসের ব্যবধানে তিনি সন্তানদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলেন তাদেরই জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধে।

অনুরূপ লক্ষ্য অর্জনে তিনি স্বামীকে না জানিয়ে এমনকি স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও সন্তানদেরকে লেটেস্ট ফোন, ফ্রি ওয়াইফাই, ল্যাপটপ ইত্যাদি দিয়ে তাদের নিজের প্রতি নির্ভরশীল ও মোহাবিষ্ট করে তোলেন এবং সন্তানদেরকেও তার স্বভাবসুলভ সন্দেহবাতিকের ধ্যান-ধারণায় সন্তানদের দিয়েও বাবার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। স্কুল-পড়–য়া যে ছেলেকে বাবা ফোনের Security lock কিংবা ড্রয়ারের চাবি উন্মুক্ত করে রেখেছিল সেই সুবোধ, সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী প্রতিভাদীপ্ত কলামিস্ট ও গ্রন্থকার কিশোর বয়সি ছেলেকে ও কিশোরী মেয়েকে বাবার অগোচরে প্ররোচিত করে গভীর রাতে স্বামী নিদ্রায় গেলে কিংবা বাথরুমে গেলে তার ড্রয়ার, ফোন, পকেট কিংবা ব্যাগ চেক করাসহ বিভিন্ন নেগেটিভ কার্যক্রম চালাতে থাকেন। অথচ এ ছেলে সর্বদাই ছিল বাবাভক্ত, বাবারও অতিপ্রিয় এবং সর্বজনের বিবেচনায় এ সমাজের এক শ্রেষ্ঠ সন্তান। এভাবে স্ত্রী একদিকে স্বামীর প্রতি চরম নেগেটিভ চিন্তা-কথা ও আচরণের ভূমি দ্রুত উর্বর করতে থাকেন হাইব্রিড পদ্ধতিতে।

অথচ এই স্বামীই তার কঠোর পরিশ্রমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়ে কেনা জীবনের প্রথম ফ্ল্যাট নববিবাহিতা বধূর নামেই রেজিস্ট্রি করে দেন এবং বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় স্ত্রীর নামে জমি কিনে দেয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্ত্রী ও সন্তানদের দীর্ঘমেয়াদি সুখ-শান্তি নিশ্চিত করতে এবং শেষ জীবনে সুখ ও আরাম-আয়েশের পরিকল্পনায় নিজকে দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রমে নিবেদিত রাখেন।

ক্রমান্বয়ে পেশাগত দ্রুত উন্নতি হতে থাকে স্ত্রীরও এবং তিনি ক্ষমতাবান হতে থাকেন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের সাথে তার বিভিন্নরূপ ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে; স্বামীর প্রতি ভালোবাসাতো দূরের কথা, তাকে আর পছন্দই হয়ে উঠতে চায় না। তাই স্বামী যা কিছু বলে, যা কিছু করে সবই তার কাছে খারাপ ও বৈরি বলে মনে হয়।

বাইরের জগতে স্ত্রী এতই সম্পৃক্ত যে, সন্তান-পরিবার-স্বামীকে গুণগত সময় দেয়া হয়ে উঠছে না। স্বামীর প্রতি বৈরি আচরণের প্রেক্ষিতেও গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা স্বামী কখনো কোনোরূপ বিশ্বাস হারাতে পারেন না ইউরোপে পড়াশুনা করা পশ্চিমা সংস্কৃতির স্ত্রীর উপর। তাই স্ত্রীর বিরাট পরিবর্তনেও কিংবা স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাইরের মানুষের সমালোচনায়ও তিনি কখনো স্ত্রীকে প্রশ্ন করার নেতিবাচক মনও তৈরি করেননি। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অবারিত উৎসর্গে স্ত্রী আরও অহংকারী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয়ে ওঠেন এবং নিজকে Single করে ফেলার দৃঢ়সংকল্পে সন্তান ও আয়া-বুয়াকে স্বামীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে থাকেন। স্ত্রীর রিএকটিভ ও নেগেটিভ আচরণের ২/১টি Hit of moment এ প্রেমের অনুপম আবেগের ও প্রচন্ড ভালোবাসার স্ত্রীকে অগত্যা রাগত কথা বলে তার ঔদ্ধত্য, উচ্ছৃঙ্খলা ও তর্কাতর্কি থামানোর চেষ্টা করেন। এরূপ এক সকালে সন্তানদের প্রতি মনোযোগী হবার পরামর্শ দিতেই স্ত্রী ক্ষেপে যান এবং পূর্ব-পরিকল্পনায় সাজানো ছকে ফেলে সন্তান ও বুয়ার সহায়তায় এক ট্রাজিক ও অকল্পনীয় পরিস্থিতিতে ফেলে দেন তার প্রতি উৎসর্গীকৃত ও উজাড় করা ভালোবাসার ঐ স্বামীকে।

এরপর একা-অসহায়-নিরুপায় স্বামী অফিসে গিয়ে স্ত্রীর অকল্পনীয় ও অপ্রত্যাশিত উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণ উদঘাটনে এবং সন্তান-সংসার ও স্বামীর প্রতি তার উদাসীনতার কারণ অনুসন্ধানে তার সাথে বিবাহপূর্ব অন্য পাত্রের সাথে সম্পর্কের স্বরূপ ও সঠিক তথ্য জানতে চিঠি পাঠান। দু`দিন অপেক্ষা করার পরও স্ত্রী সে পত্রের উত্তর না দেয়ায় বহুদিক বিবেচনায় পারিবারিক শান্তির স্বার্থে পূর্ব ঘটনার জন্য নিজেই স্ত্রীকে Sorry, Forgive me সব বলেন। সে সময়ে স্ত্রীও তাকে ক্ষমা করে দেন। এসবই ঘটেছে সন্তান ও বুয়ার উপস্থিতিতে।

স্বামী ভাবতে থাকেন, এখন থেকে তিনি স্ত্রীর প্রতি আরও ভালোবাসা এবং সেক্রিফাইস করে হলেও সন্তানদের ও পারিবারিক মঙ্গলের প্রয়োজনে তাদের সকল কর্মেও কম্প্রোমাইজ করবেন এবং নিজ আদর্শ-উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে হলেও তাদের সাথে Match & Adjust করবেন। কিন্তু বিধি বাম। ঐ দিনের মধ্যেই স্ত্রী ঘরের ভিতরের কথা বাইরের ফোরামে ও বিভিন্ন মানুষের কাছে একচেটিয়া বলে তাদের ইন্ধন ও প্ররোচনায় স্বামীকে বলে দেন আর বাসায় এসো না এবং আমি ডিভোর্স চাই। স্ত্রী-সন্তানের কাছে নিজকে ছোট করেও উদার মনে ক্ষমা চাওয়া স্বামী ক্ষমা করে দেয়া স্ত্রীর কাছ থেকে বিনামেঘে বজ্রাঘাতে পড়ে হতবিহ্বল হয়ে কাটাতে থাকেন মানবেতর জীবন, গৃহহারা-সংসারহারা হয়ে ভাত-মাছ-মাংস না খেয়ে এবং কোনো খাট-চাদরের বিছানায় না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেন মাসের পর মাস। অপেক্ষা করতে থাকেন স্ত্রীর বোধোদয়ের, করুণার, মানবিক মূল্যাবোধের ও সেই কৃতজ্ঞতাবোধের তার স্বামী যেই উৎসর্গ, ধৈর্য ও ক্ষমার সুমহান আদর্শের সাথে স্নেহ ও মমতার এক অনুপম প্রেমে অভিষিক্ত করে এখন ক্ষমতাবান সেলিব্রেটিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন স্ত্রীকে।

প্রিয় পাঠক বর্তমান সময়ের এরূপ বাস্তব উপাখ্যানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে, স্ত্রীর বর্তমান ক্ষমতার উত্থানে স্বামীর সুদীর্ঘ দু`যুগ ধরে বিভিন্ন উৎসর্গের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের শিক্ষায় দীক্ষিত হতে না পেরে আত্মঅহংকারী স্ত্রী আজ নিজ ভুবনে অশান্ত, তার মনোরাজ্যের শান্তি ও স্বস্তির স্থলে সৃজিত হচ্ছে অহমিকা, বিশৃঙ্খলা, উচ্ছৃঙ্খলা, ন্যায়হীন, যুক্তিহীন, অশোভনীয় এমন আচরণ; যা সে নিজেও কিছুতেই টের পাচ্ছে না। মানুষের প্ররোচনার গ্যাড়াকলে পড়ে `পৃথিবীর সকল সমস্যার সহজ সমাধান` বইয়ের লেখক স্বামীর কোনো সমাধানের প্রস্তাবই তার কর্ণপাতে স্থান পাচ্ছে না কিছুতেই; স্বামী-স্ত্রী দু`জনার পথ দু`দিকে, ভেঙ্গেচুড়ে খানখান সংসার। সে ছিল কোথায়! আছে কোথায়!! যাচ্ছে কোথায়!!! সুপ্রিয় শুভানুধ্যায়ী, এবারে বনি ইসরাইলের যুগে হযরত মুসা (আঃ) এর একটি উপাখ্যান। এতে কৃতজ্ঞতাবোধের অভাবে মানুষের পরিণতি-পরাজয় যে কত ভয়ঙ্কর হয়, তা দিয়ে এ লেখা শেষ করছি। এটি এমনই এক উপাখ্যান, যা আগ্রার তাজমহলকেও হার মানায়।

এক লোক তার স্ত্রীকে এতই ভালোবাসত যে, স্ত্রীর ইন্তেকালের পর তিনি স্ত্রীর কবরে গিয়ে দিবারাত্রি পড়ে থাকতেন। ঐপথে হযরত মুসা (আঃ) এর যাতায়াত ছিল। একদিন মুসা (আঃ) থমকে দাঁড়ান ঐ কবরের পাশে। সে ব্যক্তির আহাজারি দেখে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে বলেন। আল্লাহ তাঁকে বলেন এরূপ ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ মৃত্যুর বিধানে নেই। তবে যদি এ ব্যক্তি তার আয়ুষ্কালের কিছু সময় তার স্ত্রীকে দিয়ে দিতে রাজি হয়, তাহলেই তা সম্ভব। তখন ঐ ব্যক্তি রাজি হয় যে, তার আয়ুষ্কালের অর্ধেক তার স্ত্রীকে দিয়ে হলেও তিনি তার প্রিয়তমাকে পেতে চান।

এভাবে পুনরায় পেয়ে যান তার স্ত্রীকে এবং চলে যান লোকালয় থেকে নিভৃতে, বনজঙ্গলে। সেখানে তাদের প্রণয়-ভালোবাসাময় জীবন দিব্যি কাটছিল। কিন্তু এখানেও বিধি বাম। একদিন স্ত্রীর জন্য খাবার সংগ্রহ করতে স্ত্রীকে রেখে একটু দূরে যান স্বামী। এমনি সময়ে ঐ স্থান দিয়ে শিকারে যাচ্ছিলেন রাজপুত্র। হঠাৎ ঐ সুন্দরী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে ফুসলিয়ে ঘোড়ায় উঠিয়ে নিয়ে যান রাজবাড়িতে। স্বামী খাবার নিয়ে এসে দেখে, যথাস্থানে তার স্ত্রী নেই। হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান পায়, রাজার ছেলের ঘোড়ার পিঠে ঐরূপ চেহারার এক নারীকে তারা দেখেছে। দ্রুত চলে যায় রাজদরবারে। রাজার কাছে স্ত্রীকে ফেরত চাইলে রাজা অবাক হন। অবশেষে রাজা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, তার পুত্র ঐ নারীকে নিয়ে এসেছেন। তখন ঐ নারীকে ডেকে স্বামীর দ্বারা তাকে সনাক্ত করালেও স্ত্রী কিছুতেই রাজি হয় না রাজবাড়ি থেকে স্বামীর সাথে ফেরত যেতে। তখন রাজা ঐ লোকের কাছে স্ত্রীর দাবির পক্ষে সাক্ষ্য চান। কোনো উপায়ান্তর না দেখে অসহায় ও নিরুপায় স্বামীটি আবার ফিরে যায় স্ত্রীর ঐ কবরে। সেখানে আহাজারি করাকালীন মুসা (আঃ) পথিমধ্যে থেমে জিজ্ঞাসা করেন পুনরায় কী হয়েছে তোমার? তখন সব ঘটনা জেনে এবং তার স্ত্রীর দাবি রাজদরবারে প্রমাণের জন্য একজন সাক্ষীর প্রয়োজনের কথা শুনে মুসা (আঃ) বলেন, চলো আমি যাব সেই রাজার কাছে।

রাজদরবারে গিয়ে মুসা (আঃ) নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করলেও ঐ রমনী রাজপ্রাসাদ ও রাজপুত্রকে ছেড়ে প্রকৃত স্বামীর কাছে না যেতে অনড় অবস্থার কারণে রাজা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারছিলেন না। অবশেষে হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলেন, স্ত্রীর জন্য স্বামীর দেয়া আয়ুর অংশ স্ত্রীর থেকে নিয়ে স্বামীকে ফেরত দিতে। এতে ঐ রাজদরবারেই তাৎক্ষণিক পুনঃমৃত্যু হয়ে যায় সেই ঐতিহাসিক অকৃতজ্ঞ রমনীর।

প্রিয় পাঠক, আসুন আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাবোধের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে সহজ-সরল, আনন্দে ও সৃজনশীলতায় ভরপুর করি; স্রষ্টার ও সৃষ্টির অমোঘ বিধানকে উপেক্ষা না করে গড়ে তুলি সবার সাথে সুসম্পর্কের অমিয় বন্ধন, মহানন্দে অবগাহন করি ইহজগতের ও পরজগতের সর্বকিছুতে।