Sun Sun Sun Sun Sun
English

ক্ষমা ও ধৈর্য্যের মাধ্যমে সফল হওয়ার উপায়

|| ড. এম হেলাল ||
মানুষের মহৎ গুণাবলীর অন্যতম হচ্ছে `ক্ষমা`। অন্যকে ক্ষমা করা কেবল মহত্বের লক্ষণই নয়, আপন অন্তর্জ¡ালা ও দুঃখ-কষ্ট কাটিয়ে রোগমুক্ত, সুস্থ ও ব্যালেন্সড লাইফের প্রধান নিয়ামক ও শক্তি হচ্ছে ক্ষমা। ক্ষমা চাইতে পারা এবং ক্ষমা করতে পারা দু`টোই সহজ-সরল ও উদার মনের পরিচায়ক; যা বড় মাপের মানুষদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। 

`আমার আমি` এর সাথে অন্যের সৃষ্ট দুঃখ-কষ্ট যোগ করে যে অন্তর্জ্বালা, রোগ-ব্যাধি বা অসুস্থতা তৈরি হয় তা থেকে আত্মরক্ষা ও আত্মবিকাশের প্রধান অবলম্বন হচ্ছে ক্ষমা। ক্ষমার মানসিকতা তৈরি করতে না পারলে এবং অন্যকে ক্ষমা করে দিতে ব্যর্থ হলে অন্তরে লালিত দুঃখ-কষ্টের প্রতিক্রিয়ায় শরীরে তৈরি হয় অস্থিরতা, দেখা দেয় নানা রোগ-শোক। এজন্যই বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন

ক্ষমা করা ভালো, ভুলে যাওয়া আরও ভালো। 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর অমর উপন্যাস `শেষের কবিতা`র শেষে লিখেছেন
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি। 

অর্থাৎ বিশ্বকবি নিজকে বলি দিতে বা আত্মোৎসর্গ করতে চান তারই কাছে, যে তাঁকে দেখবে অসীম ক্ষমার দৃষ্টিতে।  ক্ষমা করতে পারেন তারা যাদের বুকের বারান্দা বিশাল এবং যে বুকে লালন করেন ততোধিক বড় হৃদয়, চিন্তা-চেতনায় যারা উদার ও অত্যাধুনিক, শান্তি ও সম্প্রীতি লালনে যারা বদ্ধপরিকর। তাই যারা অনেকাংশে ক্ষমাশীল, তারা মহৎ; আর যারা সম্পূর্ণ ক্ষমা করতে পারেন, তারা দেবতুল্য। তাই বলা হয়, অন্যায় করা মানবিক আর ক্ষমা করা দেবধর্ম। হাদীসে আছে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা তিনি, যিনি প্রতিশোধ নেয়ার মতো ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপরকে ক্ষমা করে দেন। অন্যদিকে আল্লাহর নিকট তিনি সবচেয়ে নিকৃষ্ট, যার অসদাচরণের কারণে মানুষ তার থেকে দূরে থাকতে চায়। 

আল্লাহ মহান এজন্য যে, তিনি সর্বদাই ক্ষমাশীল এবং ক্ষমার সৌন্দর্যে আপ্লুত। অন্যদিকে আমরা এজন্যই সাধারণ মানুষ, কারণ আমাদের মধ্যে ক্ষমার সৌন্দর্য কম। যার দৃষ্টি যত বেশি ক্ষমাসুন্দর, তিনি তত বেশি উন্নততর বিশেষ মানুষ।  প্রিয় পাঠক, ৩ বছর পূর্বে আমার বৃদ্ধা মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত কঠিন অসুখ হয়েছিল। হাসপাতালের আইসিইউ থেকে মাকে বাসায় এনে সেসময়ে যেসব কাউন্সেলিং করেছিলাম, তন্মধ্যে ক্ষমার মানসিকতা তৈরিই ছিল অন্যতম। মাকে বলতে থাকলাম মা, আপনি সবাইকে ক্ষমা করে দিন; আপনার ছোটবেলা থেকে এ পর্যন্ত যতজনের কাছ থেকে যত দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণা পেয়েছেন, তাদের সবাইকে একেবারে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে দিয়ে নিজকে জ্বালা-যন্ত্রণামুক্ত, সংশয়হীন, নিষ্কন্টক, স্বচ্ছ ও পবিত্র করে ফেলুন; দেখবেন অন্তর্জগতে কত আরাম, কত সুস্থতা, কত আনন্দ! এরূপ পরিচ্ছন্ন ও দ্বিধামুক্ত মনে স্রষ্টাকে ডাকতে পারলে আপনার সকল অসুখ-বিসুখ, বেদনা ও বিস্বাদ দূর হয়ে যাবে। 

এভাবেই নিজের সাথে নিজে কথা বলে, সকল অসুখ ও অসুবিধা তাড়ানোর ফলে স্রষ্টার মেহেরবানীতে ৩ বছর ধরে বৃদ্ধা মাকে তেমন ঔষধ খেতে হচ্ছে না।  অনেকের ধারণা, ক্ষমা করলে অন্যে লাভবান হয়ে যায়, আর নিজকে হতে হয় সুবিধাবঞ্চিত। ...ভুল, সবই ভুল। এভাবে জীবনের পাতায় পাতায় আমরা কত যে ভুল লিখে চলেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আত্মঅহংকার ও প্রবৃত্তির কারণে যে ভুল আর শোধরানো হয়ে ওঠে না।  

তাই ক্ষমা যত বেশি করতে পারবেন, তত বেশি লাভবান হবেন আপনি নিজে; অন্যদিকে যাকে ক্ষমা করলেন তিনি কতটুকু লাভবান হবেন, তা নির্ভর করে তার জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর। তবে নিশ্চিত করে বলা যায় যে তিনি লাভবান হোন বা না হোন, ক্ষমার মহিমায় আপনি কিন্তু লাভবান হয়ে গেলেন; স্বাস্থ্যে ও সুখে নিজ জীবনকে করলেন মহিমান্বিত। 

তাই আসুন আমরা সবাই ক্ষমাসুন্দর, সুস্থ ও নিরোগ জীবনযাপন করি। আমার শরীরে ততক্ষণই অন্যের কু-আচরণ ক্রিয়া করে বা প্রভাব বিস্তার করে, যতক্ষণ আমি অন্যের সৃষ্ট কষ্টকে নিজ চিন্তায় ও দেহ-মনে লালন করি।  তাই অন্যে যাই করুক না কেন, আমি যদি আমার শরীরে কোনো নেগেটিভ বা রিএকটিভ উপাদান নিজে প্রবেশ না করাই, তাহলে আমি সুস্থ ও স্বাভাবিক। আর যে জ্বালা-যন্ত্রণা ইতোমধ্যেই দেহ-মনে প্রবেশ করিয়ে ফেলেছি, তা দূর করতে অত্যাশ্চর্য টনিক ক্ষমার আদর্শে উজ্জীবিত হই। 

আর ধৈর্যের কথা? ধৈর্যহীনতা বা অস্থিরতা যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্য অর্জন বা সাফল্যকে বিঘ্নিত করে। কথায় বলে সবুরে মেওয়া ফলে। অর্থাৎ ধৈর্যধারণকারী তার ধৈর্যের সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পেয়ে যান। এটি কোনো আবেগী বিষয় বা কথার কথা নয়; এটি যুক্তি ও বিজ্ঞানের কথা। তাই অধৈর্য ও অস্থিরতার সকল আবেগকে ঢেকে দিতে হবে যুক্তি ও বিবেক দিয়ে। কারণ ধৈর্য হারিয়ে ফেললেতো Brain concentrate করা যায় না, মনোসংযোগ বা মন নিয়ন্ত্রিত থাকে না। ফলে লক্ষ্যস্থির, পরিস্থিতি মোকাবেলার কৌশল নির্ধারণ এবং গন্তব্যে পৌঁছা কষ্টকর হয়ে যায়;  Spiritual level বাধাগ্রস্ত হয়; কাঙ্খিত অর্জন বা সাফল্য আসে না। তাইতো বলা আছে, ধৈর্যের ফল স্রষ্টা নিজেই দিয়ে থাকেন।

আমাদের উচিত যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে টিকে থাকা এবং দেহ-মনকে স্থিরতা দান করা। এরূপ স্থির ও শান্ত মন আমাদের সুস্থতা ও সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।

আপনার সকল পরিস্থিতি নির্ভর করে আপনার নিজের স্থিতির ওপর। তাই ভাবুন আপনি কি ধৈর্য ও স্থিতি বজায় রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবেন, নাকি পরিস্থিতির দ্বারা আপনি নিয়ন্ত্রিত হবেন!  ইচ্ছা করলে আপনি দুধ বিক্রি করে মদ কিনতে পারেন; আবার এই আপনিই মদ বিক্রি করে দুধ খেয়ে সুস্থ-সমৃদ্ধ-ব্যালেন্সড ও ছন্দময় জীবন উপভোগ করতে পারেন। সবই আপনার নাগালে, সবকিছুই আপনার দ্বারা সম্ভব।