Sun Sun Sun Sun Sun
English

সার্বিক কল্যাণ ও সাফল্যের জন্য সর্বদা যুক্তিভিত্তিক
ও ন্যায়ভিত্তিক আচার-আচরণ করুন

|| ড. এম হেলাল ||
Man is rational animal. তাই মানুষের সকল আচরণই যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। যুক্তিবাদী হওয়াটা আধুনিক মানুষের বড় গুণ। যুক্তিভিত্তিক জ্ঞানের বদলে যিনি খাসলত, অন্ধবিশ্বাস কিংবা কুসংস্কারকে আঁকড়ে থাকেন, তিনি আধুনিক মানুষ নন। 

মানুষের কোনো আচরণই অযৌক্তিক বা অবৈজ্ঞানিক হওয়ার কথা নয়। যুক্তির বাইরে কোনো আচরণ থাকলে সেটি অসদাচরণ বলে পরিগণ্য। সেই অসদাচরণ তথা অন্যের সাথে অযৌক্তিক ও অন্যায় আচরণের কারণে নিজকে অসুস্থ করে তুললে অশান্তি ভোগ করতে হয়। এতে আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বা স্থিরতা নষ্ট হয়; মনোজগতে স্থিরতার পরিবর্তে উত্থিত হয় অস্থিরতার কম্পন। এ কম্পন অত্যন্ত মৃদু হলেও পরিণাম এতই ক্ষতিকর যা শরীরবৃত্তে ভূমিকম্পের চেয়েও মারাত্মক। এর ফলে নানারকম মানসিক রোগ তৈরি হতে থাকে; শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হতে শুরু করে এবং দেহাভ্যন্তরে প্রোথিত হয় রোগের বীজ। 

তাই আমাদের সকল কথা ও কাজ হতে হবে যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত। অর্থাৎ আমার কোনো কথা বা কাজ যেন অযৌক্তিক না হয় এবং আমার সকল কথা ও কাজের উদ্দেশ্য হবে কল্যাণ ও ন্যায়ের স্বার্থে। প্রথম প্রথম এরূপ চর্চা কষ্টকর হতে পারে, এমনকি এরূপ চর্চা শুরু করলে আপনি অন্যের নিকট দুর্বোধ্য বা কঠিন বলেও চিহ্নিত হতে পারেন। কিন্তু ধৈর্য ধরে এ চর্চা চালিয়ে যেতে পারলে একসময়ে আপনি হয়ে উঠবেন অন্যের নিকট প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়। উপরন্তু সর্বদা যৌক্তিক ও ইতিবাচক আচরণের ফলে আপনার মনে আনন্দানুভূতি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তা কাজ করবে। মন ভালো থাকলে, মনে আনন্দ থাকলে, স্বচ্ছতা থাকলে সে মনে হতাশা ভর করতে পারে না। আর হতাশামুক্ত মন যিনি লালন করেন, তার শরীরও ভালো থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তখন কর্মসাফল্য, শারীরিক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুলাভ অনেক সহজ হয়ে যায়।

তাই আমাদের সকল কাজকর্ম এবং আচার-ব্যবহার যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে করতে ও করাতে পারলে একদিকে আমরা সুস্থ-সবল ও দীর্ঘায়ু হয়ে উঠব, অন্যদিকে ন্যায়ভিত্তিক ও আলোকিত সমাজ এবং কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। 

তবে যুক্তির প্রয়োগ ও ব্যবহার কোনোক্রমেই এমন হওয়া উচিত নয়, যা খারাপকে বা নেগেটিভ বিষয়কে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। সুযোগসন্ধানী বা সুবিধাবাদীরাই এমনটি করে থাকেন। যেমনঃ কেউ তার বন্ধুদের বলল তোমরা আমার জন্য দোয়া করো, আমি চাকরি পেলে তোমাদের মিষ্টি খাওয়াব। বন্ধুদের আশীর্বাদে এবং স্রষ্টার কৃপায় চাকরির ইন্টারভিউতে তিনি টিকলেন, নিয়োগপত্র পেলেন, চাকরিতে যোগদান করলেন, মাসশেষে বেতন পেলেন, বৎসরান্তে বোনাসও পেলেন...।

এক্ষেত্রে চাকরি লাভের কোন্ পর্বে বন্ধুদের প্রতি তার দায় পরিশোধ হবে, এটি নির্ভর করে তার নিজস্ব ইচ্ছা ও যুক্তির ওপর। মাসশেষে বেতন পাওয়ার পর ঐ দায় পরিশোধ করলেও চলবে। এমনকি বৎসরান্তে প্রাপ্ত বোনাস দিয়ে দায় পরিশোধ করলেও কাজা নামাজ আদায়ের মতো দায়মুক্ত হওয়া যাবে। এরূপ প্রাসঙ্গিক নানা যুক্তিতে দায়মুক্তির শর্তপূরণ করা কঠিন নয়। অথচ এমন অনেকে আছেন, যারা চাকরিতে যোগদান করেই বা চাকরির নিয়োগপত্র পেয়েই বন্ধুদের প্রতি প্রতিশ্রুতির দায় শোধ করে ফেলবেন। আবার এমনও কেউ আছেন, যিনি ইন্টারভিউতে টেকার খবর শোনামাত্রই বন্ধুদের মিষ্টি খাইয়ে দিলেন।

এক্ষেত্রে সবার দায় পরিশোধের যুক্তি কি একইরূপ কল্যাণ ও বিচারিক চিন্তা থেকে উত্থিত? মোটেই না। অধিক স্বচ্ছ, সরল, সুস্থ ও সুবিচারিক উদার চিন্তার মানুষ হলে তিনি যত দ্রুত সম্ভব তার প্রতিশ্রুতি পূরণ বা দায় পরিশোধে তৎপর থাকবেন এবং দায়পালন শেষে ভারমুক্ত হবেন। এর ফলে তার কোনো পিছুটান থাকল না, Brain hang হওয়ার বা মানসিক জটিলতার কোনো সুযোগ থাকল না। সুস্থতা-সৃজনশীলতা ও সর্বক্ষেত্রে মনোযোগের মহানন্দে তিনি সম্মুখে ধেয়ে চলেন। নিজে এগিয়ে যান, সমাজ সংসারকেও ধাক্কা দিয়ে সম্মুখে এগিয়ে দেন। 

তবে সুবিধাবাদীদের স্বার্থপর যুক্তির ব্যাপারে অন্যদেরকে সচেতন থাকতে হবে এবং তাদেরকে মিথ্যা আত্মপ্রসাদ বা অহমিকার গন্ডি থেকে বের করে এনে বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিতে এবং প্রকৃত সত্য ও ন্যায়ের পথে উদ্বুব্ধ করতে হবে। অর্থাৎ নিজের মনগড়া ও একপেশে যুক্তির পরিবর্তে নিরপেক্ষ ও বিচারিক যুক্তি প্রয়োগে অনুপ্রাণিত করতে হবে। নিরপেক্ষ, বিচারিক এবং সংশ্লিষ্টদের জন্য কল্যাণকর না হলে তা আর যৌক্তিক থাকে না; তখন তা হয়ে যায় অযৌক্তিক, অসংগত ও অন্যায়।

একপেশে খামখা যুক্তি দিয়ে অকল্যাণ, অসুন্দর ও অন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বা চেষ্টা এক ধরনের অপরাধ। এ ধরনের সুযোগ সন্ধানীরা প্রতিপক্ষের নীরবতা, ভদ্রতা কিংবা দুর্বলতায় আপাত সুবিধা গ্রহণে সক্ষম হলেও স্থায়ী সুখ, সুস্বাস্থ্য ও শান্তি এদের জন্য সুদূরপরাহত। 

অর্থাৎ একপেশে বা স্বার্থপর যুক্তি দিয়ে এককভাবে নিজের কল্যাণ প্রতিষ্ঠা প্রকৃতই অন্যের প্রতি জুলুম ও জবরদস্তি। যুক্তি হতে হবে নিরপেক্ষ তথা দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক, একতরফা নয়। নিজের স্বার্থে প্রয়োগকৃত যুক্তির যাঁতাকলে যদি অপরের ক্ষতি বা অকল্যাণ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে সে যুক্তি প্রহসন ও অন্যায়।  অন্যের অধিকার ও কল্যাণ বিবর্জিত নিজের একতরফা যুক্তি প্রয়োগের প্রবণতা স্থায়ী শান্তি, সুস্থতা ও সমৃদ্ধি অর্জনে প্রতিবন্ধক। একতরফা যুক্তি অন্যের জন্য প্রহসন, নিজের জন্য আত্মপ্রবঞ্চনা এবং সমাজ-সংসারের জন্য অকল্যাণ, বিভ্রান্তি ও অশান্তির কারণ।

আর নিরপেক্ষ যুক্তি তথা কল্যাণ চিন্তার যুক্তি সর্বদাই সর্বজন গ্রহণযোগ্য এবং এরূপ যুক্তির মানুষকে বলা হয় বিচারিক বুদ্ধির মানুষ, নিরপেক্ষ ও ভালো মানুষ। এরূপ মানুষ বিধির সমতুল্য অর্থাৎ তিনি নিজেই আইন।

এভাবে পারস্পরিক কল্যাণের নিরপেক্ষ যুক্তির নিঃস্বার্থ উদার ব্যক্তিত্বরা স্রষ্টার আশীর্বাদপুষ্ট, মানুষের পূজনীয়, মানবতার অহংকার, সভ্যতার অলংকার। এরূপ বিচারিক চিন্তার সপ্রতিভ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ যে সমাজে যত বেশি থাকবে, সে সমাজ তত বেশি প্রাগ্রসর ও সুউন্নত হবে।    তাই আসুন, আমরা সবাই এরূপ যুক্তিভিত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের সদস্য হই। যুক্তিকে সর্বদা ব্যবহার করি ন্যায়ের পক্ষে; অবান্তর যুক্তি দিয়ে কল্যাণকে অকল্যাণের দিকে নিয়ে যাব না।