Sun Sun Sun Sun Sun
English

ছাত্ররাজনীতিঃ অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত

|| ড. এম হেলাল ||
সময়ের আবর্তনে বদলে যায় চেনা-জানা গণ্ডি। নতুনভাবে, নতুন উদ্যোগে পরিবর্তিত ঐ গণ্ডিতে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয় এবং আমরাও বিচার-বিশ্লেষণের ধার কাছ দিয়ে না চলে বরং ঐ অবস্থাকে মেনে নেয়াই সংগত মনে করি। বুঝতে পারি, জীবনের সব জায়গাতে এই একই ধারা। তাইতো যখন ইতিহাসের পাতা উল্টাই কিংবা বয়োবৃদ্ধ কোন লোকের স্মৃতিচারণের সামনে উপস্থিত থাকি, তখন চমকে উঠি। ভাবি, এতটা অসম্ভব কিভাবে সম্ভব হল? কিংবা এসব গাঁজাখুরি গল্প এরা কিভাবে তৈরি করে? কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল এবং পুরোমাত্রায় ছিল সে সম্পর্কে এ সংশয়ের সুযোগে বিশ্বাস করি না, তা নয়। কিন্তু কখনও কি সেই অতীতকে বর্তমানের পাশে দাঁড় করিয়ে তুলনা করতে চাই? চাই না। নাগরিক সভ্যতায় সে সুযোগ বা অবকাশই বা পাই কোথায়?

তাইতো কখনও দেখতে চাই না, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যে ভারত উপমহাদেশকে ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারত নামের দু’টো দেশ সৃষ্টি করা হল, তার সাথে বর্তমান অর্থাৎ সেই সময়কার রাজনৈতিক আবহাওয়ার সাথে বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়ার মধ্যে ফারাক কতখানি। কিন্তু ১৯৪৭ সালে আমরা দেখি রাজনৈতিক অঙ্গনে দু’টো ধারাকে কর্মময় ভূমিকা পালন করতে, তা হচ্ছে কংগ্রেস আর মুসলীম লীগের ধারা। অবশ্য এর মাঝে নতুন আদর্শ, নতুন ধারাকে সামনে রেখে যে ছোটখাট সংগঠন গজিয়ে ওঠেনি, তা নয়। উঠেছে। তবে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের আশা-আকাঙ্খার পূর্ণ প্রতিফলনকে সামনে রেখে এগুতে পারেনি, তাই আজ ওসব সংগঠনের নাম ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই স্থান পেয়েছে। জনমন থেকে ওদের অস্তিত্ব মুছে গেছে। তবে ঐসব সংগঠনের মধ্যকার অনেক ব্যক্তিত্ব এখনও আলোচনায় আসেন, আমরাও তাদের জন্য শ্রদ্ধায় মাথা নত করতে বাধ্য হই, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। কেননা তারাতো ঐ দু’টো প্রধান সংগঠন থেকে বেরিয়ে নিজেদের মতামতের ওপর ভিত্তি করেই দল গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু খুব বেশি দূর যে এগুতে পেরেছিলেন, তা নয়। তবে তাদের দ্বারা আবার বৃটিশ খেদাও আন্দোলন যে জোরদার হয়নি, তা-ও নয়। হয়েছে। কিন্তু পরিধির স্বল্পতা আর জন সমর্থনের অভাবহেতু তারা যে খুব বেশি দূর এগুতে পারেননি, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু ওই দুটো সংগঠনের কথা আলাদা, যেহেতু তারা জাতীয়তাবাদের ধ্বজা উড়িয়েছিলেন, বলেছিলেন স্বাধীনতার কথা তথা সার্বিক মুক্তির কথা। তাই ওদের দলে মানুষ জড় হতে দেরি করেনি, অর্থাৎ সাধারণ মানুষ সেদিন মনে-প্রাণে চেয়েছিল নিজেদের মুক্তি, তাই ঐ সংগঠনগুলো এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করুক আর না-ই করুক, জনগণের চাহিদার জন্য সংগঠন দু’টোকে কথা বলতে বাধ্য হতে হয়েছিল। যেমনটা আমরা এদেশের রাজনীতিতে খুব প্রকটভাবে দেখতে পাই। মূলত এদেশে ’৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল সাধারণ মানুষের দাবির ফলশ্রুতি, কোন ব্যক্তিবিশেষ বা কোন সংগঠনের দাবি ছিল না বরং কোন সংগঠন বা কোন ব্যক্তিবিশেষই ঐ সাধারণ মানুষের স্বপক্ষে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিল এবং বলেওছিল। কিন্তু ঐ ব্যক্তিবিশেষ বা ঐ সংগঠন কি একবারও চিন্তা করেছিল, এ স্বাধীনতা জনগণকে কতখানি উপকৃত করবে? কতখানি সংরক্ষণ করা হবে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ? ভাবেনি। ভাববার অবকাশও পায়নি। সংলাপ ব্যর্থ, কাজেই আন্দোলন ছাড়া গতি নেই, তাই আন্দোলন করতে বাধ্য হয়েছিল। আবার স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়? তা-ও যদি ছাত্র, জনতা, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা ওই সংগঠনগুলোর পাশে এসে না দাঁড়াত তবে কোথায় থাকত এই বিজয়? মূলতঃ পটপরিবর্তন যা-ই ঘটুক না কেন, জনতার ইচ্ছাকে রূপ দিতে সবসময়ই বাধ্য হয় রাজনৈতিক দলগুলো। অবশ্য না দিয়ে উপায় কই? জনতাকে নিয়েই যাদের কারবার, তাদের পাশেতো যেভাবেই হোক জনতাকে রাখতেই হবে। অবশ্য লাভ হয়েছে ঐ রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বা কোন নির্দিষ্ট সংগঠনের। কিন্তু জনতাতো কোন লাভ পায়নি। জনতা জনতাই রয়ে গেছে। মাঝখানে স্বজন হারানোর ব্যথাটা তাদের বুকে অনেকখানি শূন্যতার স্বাদ নিতে বাধ্য করেছে।

তারপরই স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখি শুধু ভাঙ্গনের খেলা। এ ভাঙ্গনের জোয়ারকে কোন সংগঠনই এড়াতে পারেনি। মূলতঃ এ ভাঙ্গন আজও রাজনৈতিক অঙ্গনকে হতাশাগ্রস্ত করে চলেছে। কতদিন চলবে তা-ও সঠিকভাবে বলা যায় না। এদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের কোন্দল আদর্শগত মতানৈক্য, ক্ষমতার লোভ ইত্যাদিই সংগঠনকে বিভক্ত করছে। তাই এহেন রাজনৈতিক অবস্থায় এসব সংগঠনের কাছ থেকে জাতীয় উন্নতি যে কতখানি আশাব্যঞ্জক তা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা কি আদৌ কষ্টকর? কষ্টকরতো নয়ই, বরং অনেকটা সহজ ও স্বাভাবিকভাবেই তা উপলব্ধি করা সম্ভব।

এমনকি রাজনৈতিক পরিমন্ডলে ছাত্র-রাজনীতির অবস্থান কোথায়, তা নিয়েও জনমনে যথেষ্ট বিভ্রান্তি দানা বাঁধে। মূলতঃ ছাত্র-রাজনীতিতে ছাত্র সংগঠনগুলো হচ্ছে ঐসব জাতীয় সংগঠনগুলোর সাহায্যকারী সংগঠন। আর ঐ জাতীয় সংগঠনগুলোর সব ধরনের কর্মসূচি সফল করার সার্বিক দায়-দায়িত্ব খুব বেশি তৎপরতার সাথে পালন করে আসছে এ ছাত্র সংগঠনগুলো। তাই বলা যায়, এদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তথা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পেছনে ছাত্র সংগঠনগুলোর ভূমিকাতো গৌণ নয়ই, বরং মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তারা জাতীয় সংগঠনগুলোর হাতিয়ার, অন্যদিকে তারাই যে আন্দোলনের ঝান্ডা সামনে রেখে এগিয়ে গেছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। ’৫২ এর আন্দোলন, ’৬২ এর শিক্ষানীতি বাতিলের আন্দোলন সবখানেই ছাত্র সংগঠনগুলোর অবাধ পদচারণা ঘটেছে। বলা যায়, এসব আন্দোলন ছাত্র সংগঠনগুলোর দ্বারাই পরিচালিত হয়ে পরবর্তীতে ব্যাপকতর রূপ নিয়ে জাতীয় আন্দোলনের সূচনা করেছে।

তবুও জাতীয় সংগঠনগুলো যখন ভাঙ্গনের মুখে পড়েছে তখন এই ছাত্র সংগঠনগুলো না ভেঙ্গে পারেনি। অনেক সময় ছাত্র সংগঠনের দ্বিধাবিভক্তির সুযোগ নিয়ে জাতীয় সংগঠনগুলোর ভাঙ্গন ত্বরান্বিত হয়েছে।

আবার জাতীয় সংগঠনগুলোয় যখন ফাটল ধরেছে তখন রাতারাতিই ছাত্র সংগঠনগুলো দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। মূলতঃ জাতীয় সংগঠন ছাড়া কোন ছাত্র সংগঠনের অস্তিত্ব অসম্ভব। অবশ্য অনেক ছাত্র সংগঠন দাবি করে তারা কোন জাতীয় সংগঠনের লেজুড় নয়। কিন্তু এ বক্তব্য, তাদের এ দাবি কতখানি সত্যতা বহন করে তা যথেষ্ট বিতর্কের বিষয়।

আবার এ জাতীয় রাজনীতির অনেক সংগঠনকে এদেশীয় প্রেক্ষিতে দেখা যায় ভিন্নতর বক্তব্য সামনে রাখলেও রাতের অন্ধকারে তারা ক্ষমতার সাথে দাঁতাতের নামে আঁতাত করছে। সেজন্যইতো দেখা যায়, আজকে যিনি চরম বামপন্থী, আগামী দিনই তিনি চরম ডানপন্থী বনে যাচ্ছেন। আবার চরম বামপন্থী বলে কথিত সংগঠনগুলোও চরম ডানপন্থী তথা বুর্জোয়া সংগঠনের সাথে হাত মেলাচ্ছে। অবশ্য এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাড়তি সুযোগ লাভ এবং আপোষকামী মনোভাবের জন্য এটা যে হচ্ছে, তা আর বলার অবকাশ রাখে না। আর এর প্রভাব যে ছাত্র রাজনীতিতে পড়ছে না, তা নয়। পড়ছেতো বটেই। কেননা এ জাতীয় সংগঠনগুলোতো ছাত্র সংগঠন নিয়েই পরিপূর্ণ এবং সম্পূর্ণ। তেমনিভাবে ছাত্রসংগঠনগুলোও এই মূল সংগঠনগুলোর পদচারণায় সচল।

তবে নৈতিক অবক্ষয় যা এদেশের জাতীয় সংগঠনগুলোকে ঘিরে ধরেছে, তা থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো এখনও কি মুক্ত? মুক্ততো নয়ই বরং অবক্ষয়ের তীব্র শিকার আজকের ছাত্র সংগঠনগুলো। মূলতঃ ছাত্ররাজনীতি আজ কিছুটা বাড়তি সুযোগলাভের প্রত্যাশায় মুখর হয়ে উঠেছে। আর এই সুযোগের প্রত্যাশায় ছাত্ররা রাজনীতিতে নাম লেখাচ্ছে। অবশ্য উৎসর্গীকৃতমনা কেউ কেউ যে এই ছাত্র রাজনীতিতে আসছে না তা নয়। আসছে, কিন্তু খুব অল্পই। নইলেতো এই সংগঠনগুলোকে টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়তো। এই উৎসর্গীকৃতরা সুযোগের প্রত্যাশী নয়। যারা সুবিধালাভের আশায় ছুটে আসছে তারাতো সবসময়ই নিজেদেরকে ংধভব ংরফব -এ রাখতেই ভালবাসে। তাদের নিয়েতো সংগঠন টিকিয়ে রাখা যায় না, সম্ভবও নয়।

তবু এ অবক্ষয়কে কাটিয়ে উঠতেই হবে। পাক আমলে জাতীয় যে চেতনা এই ছাত্রদের মাঝে অংকুরিত হয়েছিল, সে অংকুর যাতে বিনষ্ট না হয়ে যায়, সেদিকে দৃষ্টি দেয়া যেমন জাতীয় সংগঠনগুলোর কর্তব্য, তেমনিভাবে ছাত্র নেতৃবৃন্দেরও কর্তব্য শুধুমাত্র সুযোগের লোভে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা আর উৎসর্গীকৃত মনোভাবটা সযত্নে জন্ম দেয়া। নইলে এ অবক্ষয় ছাত্ররাজনীতিকে গ্রাস করবে এবং পুরোপুরি গিলে ফেলবে। ঠিক একইভাবে সমগ্র ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ঘিরে ধরবে। তাই মতাদর্শগত বৈষম্য তুলে এখন প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীকে হতে হবে আদর্শের বলে বলীয়ান এক উদ্যোগী কর্মী। অবক্ষয়ের বিষবাষ্পে দূষিত এ রাজনৈতিক আবহাওয়াকে রোধ করার লক্ষ্যে প্রত্যেককে হতে হবে চেতনার মশালবাহী অগ্রসৈনিক।

কাজেই অবক্ষয়ের এ যুগসন্ধিকালে আবর্তনের পথ ধরে আসা ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে সাধারণ মানুষের উপযোগী এক সুন্দর সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রত্যেকটা ছাত্র সংগঠনকে সুসংগঠিত হতে হবে এবং মানুষকে রাজনৈতিক ও দেশের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কেননা একজন যোগ্য ছাত্র সংগঠকই হতে পারে আগামী দিনের যোগ্য রাষ্ট্র পরিচালক এবং দেশ ও দশের যোগ্য সেবক।

(১৯৮৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার আগস্ট-সেপ্টেম্বর সংখ্যায় মুদ্রিত)