Sun Sun Sun Sun Sun
English

ব্যাংক-চেয়ারম্যান ও এমডি’র খেজুর ও বই উপহার
এবং দারিদ্র্যমুক্ত অত্যাধুনিক বাংলাদেশের গল্প

|| ড. এম হেলাল ||
ছাত্রজীবনে বিশিষ্টজনদের সাথে আমার সম্পৃক্ততা এবং শহরময় ঘুরে বেড়ানো দেখে সহপাঠী এক বন্ধু লিখেছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী-সচিব, রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত যার যাওয়া-আসা, ভবিষ্যতে তার যাওয়ার মত আর বাকি রইলোইবা কী? আসলে বন্ধুর সে কথায় একেবারে অতিরঞ্জন ছিল না। ছাত্র-সংসদ নির্বাচন করতে গিয়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন করার সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই ঢাকা শহর চষে বেড়িয়ে অতঃপর দেশের প্রতিটি জেলা ৫/৬ বার করে ঘুরে এখন আমি ঘরকুনো।

খাদ্যে ভেজাল ও বিষ-প্রয়োগের হোলিখেলা চলার কারণে বিয়ের অনুষ্ঠান বা কোন খাবারের দাওয়াতে যাওয়া হয় না। অফিসিয়াল এপয়েন্টমেন্টেও খুব কম যাওয়া হয় মূলতঃ দু’টো কারণে; প্রথমতঃ দুর্বিষহ যানজটে পড়ে রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এবং দৈনিক ৩/৪ কর্মঘন্টা সময়ের অপচয়; দ্বিতীয়তঃ মানুষের মধ্যে প্রাণের উষ্ণতার অভাব তথা মানবিক মূল্যবোধের দুর্ভিক্ষ। তবু কোথাও না যাওয়ার এ আকালে সেদিন গেলাম ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দপ্তরে।

বছরখানেক আগে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ -এর চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুজ জাহের এসেছিলেন ক্যাম্পাস পত্রিকা কার্যালয়ে, ফ্রি কম্পিউটার ট্রেনিংয়ের ১০৩তম ব্যাচের সার্টিফিকেট বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে। সে অনুষ্ঠানে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-যুবকদেরকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে নিজ জীবনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে বক্তৃতায় বলেছিলেন- সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনের সাথে কর্ম যোগ করলে আর পেছনে যেতে হয় না; বরং সৎকর্মের সে পুঁজি দিয়েই বাকি জীবন সাফল্যের সরোবরে এবং মানুষের ভালবাসায় অবগাহন করা যায়।

ধন-সম্পদের প্রতি নির্লোভ এবং সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার কারণে জনাব জাহের সুদীর্ঘ ৬ মেয়াদে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে এমন একটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক-প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন, সুদবিহীন যে ব্যাংকে বর্তমানে ২৫৪টি শাখায় ১১,০০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন; বার্ষিক মুনাফা ১১৪০ কোটি টাকা; ৬৭.৫০ মিলিয়ন টাকার মূলধনে কার্যক্রম শুরু করে বর্তমানে ১০,০০৭.৭১ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছে।

প্রফেসর জাহের সে বক্তৃতায় ক্যাম্পাস’র দেশ ও জাতি জাগরণী কার্যক্রম এবং ছাত্র-যুব উন্নয়নে নানামুখী কর্মপ্রয়াসকে অভিনন্দিত করেন। এরূপ কার্যক্রমের সাথে তাঁর কল্যাণকামী ব্যাংকের সম্পৃক্ততার আগ্রহ প্রকাশ করে আমাদেরকে তাঁর অফিসে নিমন্ত্রণও জানান। সে নিমন্ত্রণক্রমেই গেলাম তাঁর অফিস পরিদর্শনে। অফিস টাইমের পরে সন্ধ্যে ৬টার সে এপয়েন্টমেন্টে সাথে ছিলেন আমার স্ত্রী ও ক্যাম্পাস’র অনারারী রিসার্চ ডিরেক্টর ড. নাজনীন আহমেদ, ক্যাম্পাস’র অতিরিক্ত পরিচালক গিয়াস উদ্দিন এবং উপ-সহকারী পরিচালক রাজিব গুপ্ত। চেয়ারম্যানের সাথে আমাদের ঘন্টাখানেক সময়ের আলাপে উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের সুযোগ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, সিনিয়র ভিপি ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আতিউর রহমান প্রমুখ।

দীর্ঘদিন পর কোন অফিস পরিদর্শনে গিয়ে শিষ্টাচার, নীতি-নৈতিকতা, মানবতা, অতিথিপরায়ণতা এবং ইনস্টিটিউশনাল সিস্টেমের যে দৃষ্টান্ত আমার বোধগম্য হয়েছে -তা সর্বত্র চর্চা ও লালনের প্রয়োজনবোধ থেকে সুধী পাঠকের সাথে এ শেয়ারিং।

ইসলামী ব্যাংকের সদর দপ্তরে পৌঁছার পর চেয়ারম্যানের পিএস হাস্যোজ্জ্বল আবু হানিফ আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে চেয়ারম্যান মহোদয়ের কক্ষে নিয়ে যান। শুভেচ্ছা বিনিময় পর্বেই কক্ষে প্রবেশ করলেন বিশিষ্ট লেখক এবং ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট আতিউর রহমান। তাঁকে বয়োজ্যেষ্ঠ ভেবে সামনের চেয়ারে বসা আমার অনুজ সহকর্মী গিয়াস ও রাজিব দু’জনই চেয়ার ছেড়ে পেছনের সোফায় বসতে উদ্যত হলে চেয়ারম্যান সাহেব বললেন- আপনারা উঠবেন না, যেখানে বসেছেন সেখানেই থাকুন; কারণ আপনারা জুনিয়র হলেও মেহমান, আর উনি সিনিয়র হলেও আমার কলিগ অর্থাৎ হোস্ট। বুঝলাম- এঁরা অতিথি বা মেহমানের প্রতি যথাযথ কদর ও সম্মান দেখিয়ে নিজেরাও সম্মানিত হন এবং হতে জানেন।

একটু পরই মাগরিব নামাজের আযান শোনা যায় এবং তাঁদের সাথে আমরাও নামাজের প্রস্তুতিতে; ইতোমধ্যে এলেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নান। তিনি নিজেও একজন সাংবাদিক ও গ্রন্থকার। প্রায় ৮ বছর পূর্বে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয় লন্ডনে। ইউকে ভ্রমণ উপলক্ষে লন্ডনস্থ বাংলা মিরর পত্রিকার চেয়ারম্যান এম এ আজিজ তাঁর পত্রিকা অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমাদের দু’জনকে সংবর্ধিত করেছিলেন। জনাব মান্নানের সাথে দীর্ঘদিন পরের সাক্ষাতে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেই চেয়ারম্যান মহোদয় একটি চেয়ার টেনে তাঁর পাশে বসার ব্যবস্থা এমন দ্রুত করে ফেললেন, যেন অতিথিদের নড়চড় করতে না হয়।

চেয়ারম্যানের ফ্লোরে বোর্ডরুমের পাশেই নামাজের নির্ধারিত স্থান। চেয়ারম্যান এবং এমডি’র সাথে সেখানে গিয়ে দেখি জামাত প্রায় শেষ। ঊর্ধ্বতনের অপেক্ষায় না থেকে নামাজের সময় ও নিয়ম অনুযায়ী জামাত বাঁধা হয়ে গেছে। চেয়ারম্যান, এমডি জামাতের পেছনে অপেক্ষা করলেন দ্বিতীয় জামাতের জন্য। এতে বোঝা গেল, ব্যক্তির বড়ত্বের চেয়ে নিয়ম ও পদ্ধতির গুরুত্ব যে বেশি -সে চর্চা এখানে চালু আছে।

নামাজ শেষে চেয়ারম্যানের রুমে ফিরে আলাপচারিতায় জানলাম ইসলামী ব্যাংকের অগ্রগতি ও সাফল্যের পেছনে সিস্টেম ডেভেলপমেন্টের নানা কথা। চেয়ারম্যান বললেন- আমি ব্যাংকে আসি মিটিং থাকলে অথবা আমাকে প্রয়োজন পড়লে; এখানকার প্রয়োজন না থাকলে আমি আসি না। তাঁর এ কথা শুনে বললাম, কোন কোন ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে প্রায়দিনই এবং অনেক ক্ষেত্রে সারাদিন যে অফিস করতে দেখা যায়? এর উত্তরে তিনি যা বললেন, তাতে বুঝলাম- হয়ত ব্যক্তিগত কাজে, কিংবা তদবির বা দেনদরবারে প্রতিদিন সর্বক্ষণ অফিস করতে হয়। তাঁর মতে- চেয়ারম্যান যদি ব্যাংকের নিজস্ব গতি ও সিস্টেমে চলতে এবং চালাতে চান, তাহলে তাঁর নিত্য উপস্থিতি নিষ্প্রয়োজন। নীতি-নির্ধারণী কাজ ছেড়ে চেয়ারম্যান ব্যাংকের দৈনন্দিন কর্ম পরিচালনায় জড়িয়ে পড়লে অধস্তনদের কাজের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ব্যাহত হয়, তাদের দক্ষতা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ কম থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক শৃংখলা ও সুশাসন বিঘ্নিত হয়; তাছাড়া চেয়ারম্যানের দপ্তর পরিচালনায় ব্যাংকের ব্যয়ও বেড়ে যায়। চেয়ারম্যান নিয়মিত ও সর্বক্ষণ অফিস করলে সরকারি-বেসরকারি ঊর্ধ্বতনরা চেয়ারম্যানের কাছে বিভিন্ন তদবিরের সুযোগ পেয়ে যেতে পারে। এরূপ বিভিন্ন অসুবিধা সৃষ্টি করা ছাড়া সুবিধার কোন কিছু আমি দেখি না, চেয়ারম্যানের নিয়মিত অফিস করার পেছনে। আলোচনায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা বললেন, ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে বনানী-বারিধারায় বাসাবাড়ির সুবিধা নেয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমাদের স্যার থাকেন মিরপুর উপশহরে, সাধারণ এক বাড়িতে।

এরূপ বিভিন্ন আলোচনায় বোঝা গেল- ইসলামী ব্যাংকের অগ্রগতি ও সাফল্যের পেছনে বিরাট ভূমিকা রয়েছে ব্যাংক-প্রধানের সততা, নিষ্ঠা এবং যথোপযুক্ত দায়িত্ব পালনে; অযাচিত ও মাত্রাতিরিক্ত কর্তব্যে নয়। আসলে প্রতিষ্ঠান-প্রধান, সরকার-প্রধান অথবা দেশ-প্রধানসহ যেকোন অঙ্গনেই প্রধানজনের সততা, নিরপেক্ষতা ও দূরদর্শিতার ওপরই সে অঙ্গনের সাফল্য ও সমৃদ্ধি র্নিভর করে প্রায় ৯০%।

নাস্তা এল অনেক কিছু, তাতে ফলও বাদ পড়েনি। ব্যাংকের প্রকাশনা ও স্যুভেনির দিলেন আমাদের ৪ জনকে আলাদাভাবে; এরপর একটি প্যাকেট হাতে নিয়ে চেয়ারম্যান বললেন- এটি বিশেষ উপহার, যা সবাইকে দিতে পারছি না; তাই এটি দিতে চাই মা’র প্রতিরূপ হিসেবে উপস্থিত ড. নাজনীন’র হাতে; এগুলো সৌদি আরবের এমন এক বাগানের খেজুর, যে বাগানে ১০ লক্ষ গাছ আছে, কিন্তু একটি খেজুরও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিক্রয় করেন না ঐ বাগানের মালিক ইউসুফ আবদুল্লাহ আলরাজী। বরং সর্বসাধারণের ভোগের জন্য তা উন্মুক্ত থাকে এবং উপহার হিসেবে প্রেরিত হয় বিভিন্ন দেশে; তাই এ খেজুরের বরকত-রহমত অন্যরকম -এই বলে খেজুরের গিফট প্যাকেটটি ড. নাজনীন’র হাতে তুলে দিলেন।

বিদায়কালীন আমাদের তৈরি দু’টি মডেল- ‘জাতীয় সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধান’ এবং ‘এলাকাভিত্তিক স্কুলিং’ এর কপি চেয়ারম্যান, এমডিসহ উপস্থিতদেরকে দিয়ে অনুরোধ করলাম, জাতির সকল দুর্গতি থেকে মুক্তির সোপান হিসেবে এ মডেলগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে। বিদ্যুৎ-যানজট-দুর্যোগ-বেকারত্ব ও দারিদ্র্যসহ জাতীয় সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের গবেষণাধর্মী মডেলটি হাতে নিয়ে চেয়ারম্যান আমাদেরকে বললেন- তিনি এটি দেখবেন। তাঁর সহকর্মীদের বললেন, মডেলের আরও কপি সংগ্রহ করে ব্যাংকের গবেষণা সেলে পাঠাতে।

ব্যাংকের সিইও আবদুল মান্নান তাঁর লেখা বই ‘মাহাথিরের সাথে একশ পাঁচ মিনিট’ আমাদের প্রত্যেকের হাতে দিলেন। বিদায় নেয়ার সময়ে চেয়ারম্যান, এমডিসহ সব কর্মকর্তা আমাদের সাথে রুম থেকে বের হচ্ছিলেন। আমরা বললাম- আপনারা বয়োজ্যেষ্ঠ, আমাদের মত জুনিয়রদেরকে See off করতে হবে না। কিন্তু আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে শুধু লিফ্ট পর্যন্তই নয়, ফ্লোরে লিফ্ট এসে আমাদের নিয়ে দরজা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন।

শিষ্টাচার ও সদাচারের এরূপ দৃষ্টান্ত উন্নত দেশ ও জাতিতে অনেক দেখেছি বটে, কিন্তু আমাদের দেশে তা বিরল। তবে ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বার্ষিকী প্রকাশনার সময়ে লেখা সংগ্রহ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে গিয়ে তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে পড়ি এবং প্রায়ই তাঁর কাছ থেকে মৌলিক বিদ্যাশিক্ষা লাভের জন্য যাওয়া-আসা করি। দেশের প্রধান বিচারপতি এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি যা যা খেতেন, আমাদের ন্যায় চুনোপুঁটিদেরও তা তা খাইয়ে বাড়ির দরজা পর্যন্ত এগিয়ে বিদায় দিতেন। মহান এ ব্যক্তিত্বের বড়ত্ব ও মহত্ত্বের প্রেমে এমনই বিগলিত হয়েছি যে- এ লেখায় তাঁকে স্মরণে আসতেই বিরহ বেদনায় চোখ ছল ছল করে, কলম কেঁপে কেঁপে ওঠে। সততা-ন্যায়নিষ্ঠা-সরলতা ও সদাচার দিয়ে মানুষ মানুষকে আজীবনের জন্য প্রণয়ডোরে বেঁধে রাখতে পারে, যার অনুরূপ উদাহরণ আমার জীবনে শুধু এটিই নয়, রয়েছে আরো।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত (সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি) যখন সরকারের সচিব ছিলেন, তখন সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে তাঁর কাছে যেতাম। আমরা গিয়েছি জানলেই তিনি অফিস কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে তাঁর রুমে নিয়ে যেতেন। অভ্যাগত অতিথি ও অনুজের প্রতি শিষ্টাচার ও ভালবাসার অনুরূপ প্রমাণ দেখেছি পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক চীফ সেক্রেটারী মরহুম সফিউল আজম, সরকারের সাবেক সচিব মরহুম ড. এম এ সাত্তার, বিচারপতি মরহুম আবদুর রহমান চৌধুরী, সিএসপি আবদুর রব চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের কাছে।

ব্যাংক থেকে বেরিয়ে দেখি, সন্ধ্যা পেরিয়ে আঁধারে আচ্ছাদিত আকাশ মিটিমিটি তারায় খচিত। তারার আলোক থেকে বহু বহু দূরে আমরা, এ দূরত্ব যেন বাঙালির ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানসম। ব্যস্ত ও জনবহুল মতিঝিল তখন জনশূন্য; টোকাই এবং রাতের রাজা-রানীদের অভয়ারণ্য। লেটেস্ট মডেলের গাড়ির হেড লাইটের তীক্ষ্ণ আলো আছড়ে পড়ছে মানব সন্তানদের উদোম শরীরে। দু’একটি টাকার জন্য তারা গাড়ির দিকে এগিয়ে হাত পাতে...। দিবাবেলায় দুর্বিষহ যানজটের মতিঝিল রাতে খরার ফসলের মাঠের মত ফাঁকা, তাই গাড়িতো থামে না। হতাশার অমানিশায় বিদগ্ধ মানুষ আশায় বুক বেঁধে চোখ ফেলে পরবর্তী গাড়িতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা, কে বোঝে কার যন্ত্রণা...।

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না’ -একদিকে অন্তরে বেজে ওঠে ভূপেন’র সে সঙ্গীত-সুর, অন্যদিকে গাড়ি তোপখানা রোড অভিমুখী হতেই বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ থেকে ভেসে আসে এশার আযানের সুমধুর সুর। সে আযানের সাথে যেন ধ্বনিত হচ্ছিল হৃদয়গ্রাহী আহ্বান-

তোর যা কিছু আছে বিলিয়ে দে সবারে,
বেরিয়ে আয় সবার মাঝে ছেড়ে আপনারে;
ছড়িয়ে পড় প্রত্যেকে তোরা পরের তরে।

আযান-আহ্বানের সাথে ফুটপাথ এবং রাস্তায় উদোম ও ছিন্নবস্ত্রের বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও টোকাইদের তৎপরতার মাঝে আমি যেন গদ্য ভুলে অনুরূপ পদ্যে হয়ে গেছি কবি। মনে পড়ে যায় ক্যাম্পাস জনসচেতনতা কর্মসূচির প্রচারিত স্লোগান- অন্যকে সাহায্য করতে থাকুন, আপনার সমস্যাও কেটে যাবে। দেশকে ভালবাসুন, আপনার উন্নতি-সমৃদ্ধি ও শান্তি বেড়ে যাবে। আবার মনোরাজ্যে সর্বক্ষণ অনুরণিত ক্যাম্পাস’র জাতি জাগানিয়া গানের ভলিউম সজোরে বেড়ে ওঠে-

দূর করবো দুঃখ-দারিদ্র্য-বেকারত্ব, আর যত হাহাকার
থাকবে না এদেশে ঘুষখোর-চাঁদাবাজ-দুর্নীতি আর অবিচার।
অনাবিল শান্তির উৎসবে ভরে দেব, দূর করে রাহাজানি সন্ত্রাস।
............................ ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাস ॥

এভাবে ভাবনার আকাশে উড়ে উড়ে ক্ষমাহীন ক্ষমতার লাইসেন্সধারী ড্রাইভারের পেছনে বসে ক্ষমতাহীন আমি কখন যে চলে এসেছি তোপখানায় এবং এরই মধ্যে কত সময় যে পার হয়ে গেছে -তা মালুম করতে পারছিলাম না। গাড়ি থেকে নামার সময়ে স্ত্রীর জিজ্ঞাসা, খেজুর প্যাকেটটি কি করব? সৌদি দানবীরের উপহারের খেজুর আমার পরিবারের একার ভোগ করা ঠিক নয়; তাই তাকে বললাম- বাসার প্রত্যেককে ১টি করে দিয়ে বাকিগুলো অন্যদের দাও।

আমার পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতি হচ্ছে- সমঅধিকারে এবং সমানভাগে খাবার খাওয়া। অর্থাৎ ভোগ্যপণ্যে চাকর-চাকরানী, পিওন-দারোয়ানসহ সংশ্লিষ্ট সবার শেয়ার বা সমঅধিকার নিশ্চিত করা। তাই সৌদি দানবীরের উপহার এবং ইসলামী ব্যাংক চেয়ারম্যানের প্রদত্ত খেজুর আমাদের কর্তৃক যে মানসিকতায় গৃহীত হয়েছে, তা হচ্ছে- এ খেজুর ড. নাজনীনকে বা তার মাধ্যমে আমাকে প্রদান করা হলেও এগুলো আমাদের এককভাবে ভোগের অধিকার নেই, বরং আমাদের ওপর দায়িত্ব বর্তিয়েছে তা অন্যদের মাঝে বিতরণের। না হলে ইসলামী ব্যাংকে শত-সহস্র অফিসার থাকতে এবং চেয়ারম্যানের আশপাশে লক্ষজন থাকতে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ আমাদের হাতে কেন এ খেজুর? সেজন্য চাকর, ড্রাইভারসহ আমার পরিবারের ৮ সদস্যের প্রত্যেককে ১টি করে খেজুর দিয়ে বাকি প্রায় পুরো প্যাকেটই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ক্যাম্পাস অফিসে। ক্যাম্পাস’র স্টাফরা ১টি করে খেয়ে বাকিগুলো ৩/৪ দিন পর্যন্ত অফিসে আসা বিভিন্ন মেহমানকে খাইয়েছে ১টি করে। জাহের সাহেবের বর্ণিত বরকতের খেজুর যেন শেষ হয় না; তাঁকে ধন্যবাদ আর বরকত ও রহমতের জন্য স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা।

অন্যের ভোগ ও অধিকারের সচেতনতায় আমার ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠানের আন্দোলনে আরো আশান্বিত ও আন্দোলিত হলাম তখন, যখন দেখলাম এ তরতাজা ও লোভনীয় খেজুর সামনে পেয়েও আমার বৃদ্ধা মা কিংবা শিশু-সন্তানরা এমনকি অফিস স্টাফদের কেউ একটির বেশি খেতে লোভ দেখায়নি।

খেজুর, মধু, দুধ আমার সর্বাধিক প্রিয় খাদ্য। তাই আমার কাছে সারাবছরই খেজুর থাকে। প্রিয় বলেই হয়ত আল্লাহর রহমতে বিভিন্ন দেশ থেকে খেজুর ও মধু আসতে থাকে। আমার বিনীত বারণ সত্ত্বেও ইংল্যান্ড, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া থেকেও সুহৃদরা মাঝে মাঝে আরবের রাজকীয় খেজুর (Royal Date) পাঠিয়ে আমাকে তাদের নিকট ঋণী করে রাখেন। কিন্তু অতিপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও সেসব খেজুর একটির বেশি দু’টি খেতে আমার অসুবিধা হয়; কে যেন বিবেককে তাড়া করে- তোমার প্রিয় জিনিসটিই কিন্তু অন্যদের সাথে শেয়ার করতে হবে। বিবেকের সে তাগিদ মেনে চলার কারণে সর্বদা বোধকরি প্রবল আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি, আপন ভুবনে থাকি আনন্দে উদ্বেল; স্রষ্টাকে বলি- হে স্রষ্টা, তুমি যে আমাকে শেয়ারিং ও কেয়ারিংয়ের কঠিন প্রত্যয়-চেতনা দিয়েছ, তুমি যে আমাকে বিবেকের কাছে ছোট হতে দাওনি- সেজন্য শুকরিয়া।

আসলে খাদ্য বন্টন ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং Misconception -এর কারণেই কিন্তু পৃথিবীতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বসবাস। আমরা সবাই যদি বুঝতে পারতাম যে, আশপাশের মানুষগুলোকে ক্ষুধার্ত রেখে খাদ্য জমানো বা অপচয় কিংবা গচ্ছিত রাখা এক ধরনের অপরাধ! আমরা নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজ করব এবং পদ-পদবী বা সম্মান গ্রহণ করতে পারব ঠিকই; কিন্তু ভোগ-বিলাস বিশেষতঃ খাদ্য গ্রহণ করতে হবে সমানভাগে। যেহেতু ঊর্ধ্বতন-অধস্তন বা ধনী-গরিব প্রত্যেকেরই পেট বা পাত্র একটি করে, সেহেতু সবাইকে একইরূপে এবং যথাসম্ভব সমানভাগে খেতে হবে। খাদ্য ভোগের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র বা যোগ্যতা-অযোগ্যতার বাছ-বিচারের কোন যৌক্তিক কারণ নেই। আমার মনে হয়, সকল ধর্মদর্শনের মূলেও তা-ই রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে ফেরার ক’দিন পর আমার রোম সফর পড়ে যায়। প্লেনে সময় কাটানোর রিডিং মেটেরিয়াল্স হিসেবে ব্যাংকের এমডি মান্নান সাহেবের প্রদত্ত ‘মাহাথিরের সাথে একশ পাঁচ মিনিট’ বইটিও সাথে নিলাম। চটিবই, পড়তে ঘন্টাখানেক লাগার কথা; পড়েও ফেলেছি এক নিমিষে, কিন্তু চিন্তার খোরাক ও অনুপ্রেরণা হয়েছে সমগ্র কর্মজীবনের। বইয়ে মুদ্রিত গ্রেট মাহাথিরের কিছু কথা এরূপ-

i) আড়াইশ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন মালয়েশিয়ার জনগণকে নানাভাবে দুর্বল করেছে। এ শাসন আমাদের আত্মশক্তি ভুলিয়ে দিয়ে চিন্তাশক্তিকে সঙ্কুচিত ও কোণঠাসা করে রেখেছিল। ইতিহাস থেকে জেনেছি যে- আমাদের কিছু কিছু সময় এমন চলে গেছে, যখন উন্নয়নের চালিকা শক্তিরূপে এ জাতির শক্তিশালী কোন সংগঠন ছিল না। জনগণের সামনে কোন বড় স্বপ্ন বা বড় লক্ষ্য তখনও তুলে ধরা হয়নি।
ii) আমাদের রাজনৈতিক শক্তি খুব একটা সংহত ছিল না। রাজনৈতিক সংগঠন ছিল অত্যন্ত দুর্বল, আর তা ছিল দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন। আমরা সব কিছুকেই নতুনভাবে সংগঠিত করি। এভাবেই আমাদের দেশের উন্নয়নের চাকা ঘুরতে শুরু করে। ...আর এক্ষেত্রে আমি কিছু অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছি।
iii) অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি, সরকারি অফিসাররা বিদ্যমান অবস্থাকে কঠোরভাবে আঁকড়ে থাকতে চান; তারা সাধারণতঃ পরিবর্তনের পক্ষশক্তি হিসেবে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হন না। এ অবস্থায় জাতিকে উন্নয়ন ও গতিশীলতার পথে পরিচালনার জন্য নেতা বা মন্ত্রীদের নিজ নিজ বিষয়ে জ্ঞানী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতে হবে।
iv) যেকোন সিস্টেমেই নেতা নির্বাচন একটি দুরূহ কাজ। নেতার প্রতি আস্থা নষ্ট হলে সে নেতাকে পরিবর্তন করার সুযোগ থাকতে হবে। সামন্তবাদী, ঔপনিবেশিক কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থা থেকে কিছু দেশ অল্পদিন আগে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসেছে। মূলতঃ এ দেশগুলোতে নেতা বদলের কাজটি নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
v) একটি ভাল সরকার শুধু জনপ্রিয়তার পিছে ছুটবে না। ভালভাবে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারকে সঠিক কাজটি করতে হবে। একটি শক্তিশালী সরকারই অজনপ্রিয় কিন্তু সঠিক কাজ করে টিকে থাকতে পারে।

মালয়েশিয়ার স্থপতি মাহাথির মোহাম্মদের উক্ত বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট যে- দু’দশক পূর্বেকার মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমানের ইতিহাস-রাজনীতি-অর্থনীতি ও সরকার ব্যবস্থাপনায় হুবহু মিল রয়েছে। বিপর্যস্ত ও দরিদ্র মালয়েশিয়ার পট পরিবর্তনের শুরু হয় ডাঃ মাহাথিরের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে। মাত্র একজন দেশপ্রেমী ও বিচক্ষণ নেতা একটি দেশের আমূল পরিবর্তনে তথা গোটা জাতির ভাগ্যোন্নয়নে কি জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন, বিশ্ব পরিসরে সেই অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ডাঃ মাহাথির।

আমি বিভিন্ন সময়ে মালয়েশিয়া ভ্রমণকালীন মাহাথিরের অগাধ দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতার বহু দৃষ্টান্ত দেখেছি। তন্মধ্যে যেটি আমাদের জন্য বেশি শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়, তা হচ্ছে- স্বচ্ছতা, নির্লোভ ও নিরপেক্ষেভাবে রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্ব পালন। তাইতো তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন প্রাপ্ত সকল উপহারসামগ্রী দিয়ে নিজ গ্রামে এবং একেবারেই অজ পাড়াগাঁয়ে তৈরি করেছেন মিউজিয়াম। সুদীর্ঘ ২০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানগণ তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে যেসব উপহার বা উপঢৌকন দিয়েছিলেন, সে সবই তিনি চিরতরে দান করেছেন ঐ জাদুঘরে। এ ব্যাপারে মাহাথিরের দর্শন হচ্ছে- নেতা বা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বলতে কিছু নেই; সবই জনগণের, সবই রাষ্ট্রের।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট অবশ্য ভিন্ন; আমরা সবকিছুতেই উন্নতদের তুলনায় ব্যতিক্রম। তাইতো আমাদের এক প্রধানমন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহীর পদাধিকারে প্রাপ্ত উপহারসামগ্রী দিয়ে সাজিয়ে তোলেন ব্যক্তিগত নিবাস। তাঁর কাছে এরূপ কত উপহার ও উপঢৌকন ছিল, তা কস্মিনকালেও জনসাধারণ জানত না, যদি না ঐ প্রধানমন্ত্রী সরকারি জায়গায় অবৈধ বসবাস থেকে উচ্ছেদ হবার পর সেই উপহার সম্ভার বহনকারী সারি সারি ট্রাকের ছবি ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরায় বন্দি না হত।

সম্প্রতি লংকাইউ’র Galeria Perdana Museum পরিদর্শনকালীন বিশ্বনন্দিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথীর ও তাঁর স্ত্রীর মহামূল্যবান উপহার সামগ্রী দেখে বুঝতে পেরেছি- নির্লোভ, নিরহংকারী, ত্যাগী ও জনগণমূখী এ নেতা কর্তৃক মিউজিয়ামে উৎসর্গীকৃত উপহারসমূহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্যুরিস্টদের নিকট চিত্তাকর্ষক ও শিক্ষণীয়; আবার আমার ন্যায় ভবের হাটের ভবঘুরে বাঙালি ট্যুরিস্টের কাছে লোভনীয়ও বটে। ট্যুরিস্টদের কাছে গ্রামীণ জনপদকে আকর্ষণীয় করে তুলতে তথা গন্ডগ্রামকে ট্যুরিজম শিল্পে সমৃদ্ধ করতে এসব মূল্যবান সামগ্রীর প্রদর্শনী তথা জাদুঘর তৈরির এমনই প্রতিভাদীপ্ত মাহাথির-চিন্তা বাংলাদেশে খুব প্রয়োজন। তাছাড়া সরকারে বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে পরিবারের সদস্যদের অর্জিত সম্পদের হিসাব ক্ষমতা হস্তান্তরকালীন জনসমক্ষে প্রকাশ এবং ক্ষেত্রবিশেষে সে সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার সংস্কৃতি বা বিধি চালু হওয়াও অত্যাবশ্যক। বিশ্বশীর্ষ দুর্নীতির কালিমা লেপনের পাশাপাশি সমাজে ও জাতিতে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তায় এরূপ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ হবে যুগান্তকারী।

মাহাথির আরো বলেছেন-
vi) আমি সবসময় আমার জাতির জন্য বড় স্বপ্ন দেখেছি। জাতির মাঝে সে স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছি। সবসময় বড় পর্দায় চোখ রেখেছি; বড় ছবি দেখেছি। বড় ছবির সাথে জাতির অন্তর্দৃষ্টিকে জুড়ে দিতে কাজ করেছি।
vii) মালয়েশিয়াকে প্রায় শূন্য থেকে বর্তমান পর্যায়ে আনতে আমাদের অনেক বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন রচনা করতে হয়েছে। স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে হয়েছে। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অনেক কাজ করতে হয়েছে।
viii) যেকোন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি ভাল পরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর কাজ কিভাবে এগোবে, তার একটা নিখুঁত ফ্লো-চার্ট দরকার। কে কোন্ কাজটি করবে, তারও পরিকল্পনা থাকতে হবে। সে সাথে প্রয়োজন কাজে গতি সঞ্চালনের একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়া।

সুউন্নত দেশ ও জাতি গঠনের সুনিপুণ কারিগর জনাব মাহাথিরের মত আমার ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠানও বাঙালি জাতিকে অত্যাধুনিক বাংলাদেশের বাস্তব স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং সরকারকে দিয়েছে বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার মডেল। ক্যাম্পাস গবেষণা সেলের সুদীর্ঘ গবেষণায় প্রকাশিত দু’টি মডেল- জাতীয় সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং এলাকাভিত্তিক স্কুলিং (www.helal.net.bd/bangla/model.php)। এ মডেলগুলোতে এমন রূপরেখা দেয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন শুরুর ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তর করা সম্ভব।

জাতীয় মহাসড়কগুলো রিপেয়ারিং বা জোড়াতালির মত করে আমাদের জাতীয় সমস্যাসমূহের জোড়াতালি-সমাধানে আর বেশিদূর এগুনো যাচ্ছে না। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মকে বিষাক্ত ও ভেজাল খাদ্য খাইয়ে তথা জাতীয় স্বাস্থ্যকে রুগ্ন করে, লক্ষ্যহীন বা পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের বুলি শুনিয়ে শুধু কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। এরূপ অবস্থায় উন্নত বিশ্বের উন্নয়ন গতির সাথে তাল মেলানোতো দূরের কথা, বরং তাদের সাথে আমাদের উন্নয়ন বৈষম্য হয়ে উঠছে ক্রমবর্ধিষ্ণু।

রিলিফ সংস্কৃতির পরিবর্তে পাকা বাড়ি নির্মাণের ব্যবস্থা না করে যে দেশে নিত্য বয়ে যাওয়া ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে গ্রামীণ মানুষদের ঘর-বাড়ি ও গবাদিপশু ভেসে যাওয়াকে অদৃষ্টবাদ বলে চালিয়ে দেয়া যায়; যে দেশের সড়ক-মহাসড়কের অব্যবস্থাপনা, ক্ষমতার ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং যানবাহনের ত্রুটির কারণে সৃষ্ট সড়ক দুর্ঘটনাকে অদৃষ্টবাদ বলে নিহতের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে -সে সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানীদের দেশ বিশ্বউন্নয়ন গতিধারায় আসার কোন অদৃষ্টবাদ আছে কী? বাঙালি রাজনীতিকের কথিত অদৃষ্টবাদের এ কনসেপ্ট বিশ্বউন্নয়ন বিজ্ঞানে একেবারেই অচল।

তাই জাতীয় সকল সমস্যা ও দুর্গতি মোকাবেলার সোপান হিসেবে শীঘ্রই ক্যাম্পাস’র এ মডেল বাস্তবায়নে সকলের এগিয়ে আসা উচিত। সে লক্ষ্যে সীমিত সাধ্যের মধ্যেও ক্যাম্পাস উক্ত মডেল মুদ্রণ করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রী-সচিব এবং নীতি নির্ধারকগণকে পাঠিয়েছে।

কিন্তু হায়! আমাদের সরকার ব্যস্ত দৈনন্দিন সমস্যার জোড়াতালি সমাধানে ও বিরোধীদের সামলাতে; বিরোধী দল ব্যস্ত সরকার উৎখাতে ও ক্ষমতায় যাওয়ার দৌড়-ঝাঁপে; সুশীল সমাজ ব্যস্ত টকশোতে এবং তাঁরা মুখরিত সরকার বা বিরোধী দলের সমালোচনায়। জাতীয় সমস্যাসমূহ সমাধানের সমন্বিত পরিকল্পনা বা মডেল কেউ দিচ্ছেন না; ওদিকে ক্যাম্পাস’র তৈরি মডেল বাস্তবায়ন ভূমিকায়ও এগিয়ে আসছেন না, এমনকি পৃষ্ঠপোষকতায়ও না।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নাইজেরিয়া ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার দেড় ঘন্টার ১টি মাত্র ম্যাচে অর্থাৎ নিজ দেশে বিদেশী ফুটবলারদের খেলা দেখানোর ক্ষেত্রে একটি কোম্পানি একাই ২১ কোটি টাকা স্পন্সর করেছে। এক্ষেত্রে বিদেশী খেলোয়ারদের নিরাপত্তা বিধানসহ খেলা আয়োজনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের নানা এজেন্সী এবং বাফুফেসহ অন্যান্যদের মোট ব্যয়ের পরিমাণ যে কত, তা কে জানে! অন্যদিকে দেশীয় নামি-দামি শিল্পীদের বাদ রেখে বিদেশী নায়ক নায়িকার নাচ-গানের অনুষ্ঠান আয়োজনে এদেশীয় আরেক কোম্পানি নাকি ব্যয় করেছে শত কোটি টাকা। এরূপ ব্যয়ে এঁরা কুণ্ঠিততো ননই বরং এ ব্যয়ে বা স্পন্সর-প্রতিযোগিতায় তাঁরা অংশগ্রহণ করে থাকেন সগর্বে ও সদর্পে। অথচ জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে তথা জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন বা পরিকল্পনার পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে চান না; এমনকি এরূপ মডেলে চোখ বুলানো বা এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায়ও তেমন কাউকে আগ্রহী হতে দেখা যায় না।

তাই এ লেখার মাধ্যমে প্রিয় পাঠক ও দেশপ্রেমী বাঙালিদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ- আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা এবং বাস্তবের প্রিয় মাতৃভূমিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার সৃষ্ট জলে ডুবিয়ে না দিয়ে বরং আসুন, বুদ্ধিবলে তথা জ্ঞানের আলোয় জাতির সকল অন্ধকার ও দুর্যোগ-দুর্গতি বিদূরিত করে তিলোত্তমারূপে গড়ে তুলি এবং সে লক্ষ্য অর্জনে ক্যাম্পাস’র মডেলগুলোর যথাশীঘ্র বাস্তবায়নে সোচ্চার হই, এগিয়ে আসি।

আসুন, ১৬ কোটি জনতা প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউডে একযোগে উচ্চকিত কণ্ঠে বলে উঠি- আমরাও এ বিশ্বের গর্বিত নাগরিক; ছোট বলে হেলা করে আমাদের ওপর জটিল ভিসা পদ্ধতি, কঠিন ঋণ শর্ত এবং খবরদারি বা মুরুব্বিয়ানা করা যাবে না। আমরা কারও চেয়ে কম নই, আমরাও পারি...। আমাদের এই ১৬ কোটি বুদ্ধিদীপ্ত মাথা আর ৩২ কোটি কর্মের হাত দুর্দমনীয় এক বিশ্বশক্তি; যেকোন অন্যায়, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার কালো হাত গুঁড়িয়ে দিতে আমরা সক্ষম। চল্ চল্ চল্, চলরে চলরে চল্...।