Sun Sun Sun Sun Sun
English

কারাবন্দী জিয়াওবো`র নোবেল শান্তি পুরস্কারলাভে প্রতিক্রিয়া মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলুন

|| ড. এম হেলাল ||
চীনের ভিন্ন মতাবলম্বী নেতা কারাবন্দী লিউ জিয়াওবো ২০১০ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হওয়ায় একদিকে বিশ্ব রাজনৈতিক আলোচনায় ঝড় ওঠে, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আন্দোলনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। মানবাধিকার নেতার প্রতি এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চীনা জনগণকে সে দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও সেখানকার সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার দীর্ঘদিন থেকেই উপেক্ষিত। দেশটির সংবিধানে মানুষের বাক স্বাধীনতার কথা বলা থাকলেও সে দেশের জনগণ তা ভোগ করতে পারছে না। ফলে মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তার সংস্কৃতি তথা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সুখ বা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিশ্বের এক বিশাল জনগোষ্ঠী।

চীনে বাক স্বাধীনতাহীন বন্দীজীবন সংস্কৃতির কথা
২০০২ সালে নেদারল্যান্ড সফরকালে চীনা এক ছাত্রী লুই মিং -এর সাথে আমার পরিচয় হয়। সে নেদারল্যান্ডের একটি ইউনিভার্সিটিতে আমার স্ত্রী`র সাথে অর্থনীতিতে পিএইচডি করছিল। উচ্ছল ও প্রাণবন্ত লুই মিং তার দেশ চীনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে গল্প করত প্রায়শই। সেসব গল্পের সারমর্ম এরূপ

লুই মিং মেধাবী ছাত্রী, মাতৃভূমির প্রতি তার প্রচন্ড মমতা। কিন্তু মিং পড়ালেখা শেষে চীনে ফিরে যেতে চায় না। জন্মভূমে না ফেরার অন্যতম কারণ তার দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, যা তার মুক্ত চিন্তাপ্রসূত গবেষণাকে ব্যাহত করবে; জীবন-যাপনকেও করবে সীমাবদ্ধ এবং বাধা-বিপত্তিপূর্ণ।

লুই মিং`র কাছে জেনেছি চীনে সকল সুযোগ-সুবিধাই পাওয়া যায় প্রচ্ছন্ন শর্তের বিনিময়ে; যা হল ক্ষমতাসীন সরকারের পরিকল্পিত মত ও পথে চলতে হবে, কোন প্রতিবাদ বা সমালোচনা করা যাবে না, আইন-কানুন বা সিস্টেমের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা যাবে না। লুই মিংসহ অনেকের মতে চীন সরকার দেশের প্রবৃদ্ধির জন্য পরিশ্রম করছে ঠিকই এবং সে লক্ষ্যে অগ্রগতিও প্রভূত, কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকায় এ প্রবৃদ্ধির স্বাদ অনাকর্ষণীয় থেকে যাচ্ছে। খাঁচায় বন্দী পাখিকে অনেক লোভনীয় খাবার দেয়া হলেও সে খাবার তার স্বাধীন জীবনের বিকল্প হতে পারে না যেরূপ, সেরূপই অসহনীয় জীবন চীনাদের।

চীনে ইন্টারনেট ব্যবহারও স্বাধীন নয়; সরকার যে ওয়েবসাইটগুলো ব্রাউজ করার অনুমতি দেয়, শুধু সেসব সাইটেই ঢোকা যায়। আবার আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রেও চালানো হয় ব্যাপক সেন্সর। সরকারের পলিসি পছন্দ না হলে সে ব্যাপারে কোন প্রতিবাদ করা যায় না। সর্বত্রই চলে সদা নজরদারি। সারাক্ষণই ভয়, সরকারের বিরুদ্ধে বেফাঁস কিছু বলা হয়ে গেল নাতো!

এমন নজরদারির রাজনৈতিক সংস্কৃতি পছন্দ করে না সৃজনশীল ও স্বাধীনচেতা কোন মানুষই; বিশেষতঃ লুই মিংদের মত তরুণ সমাজ। কিন্তু প্রতিবাদের সুযোগ নেই। আধুনিক চীনের বিপুল প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় ব্যাপক হস্তক্ষেপ লুই মিং`র মত উচ্ছল আলোকিত তরুণীকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছে। ফলে পিএইচডি করেও সে নিজ দেশ তথা চীনে ফিরে যায়নি। বিয়ে-সংসার করে সে এখন স্থায়ী হতে যাচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতার তীর্থভূমি হল্যান্ডে।

সুধী পাঠক, ওপরের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ বাস্তব এবং সত্য হলেও চীনা ছাত্রীর প্রকৃত নাম ব্যবহার করা যায়নি বলে দুঃখিত। কারণ এটি আরেক ট্র্যাজেডি যে, সত্য কথা বলার দায়ে লেখক-কবি-সাংবাদিকদের যেমনি নাজেহাল হতে হয়, তেমনি যাদের অসহায়ত্ব ও অসন্তোষের কথা উঠে আসে লেখায়, তাদেরও হতে হয় অনাহুত বিপদ ও বিড়ম্বনার সম্মুখীন। এ শুধু ট্র্যাজেডিই নয়, স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা এবং শান্তিপূর্ণ অত্যাধুনিক বিশ্ব গড়ার পথে অন্তরায়ও বটে।

প্রিয় পাঠক, আমার বিশ্বাস, আপনাদের সচেতনতা ও সক্রিয়তায় কথিত এ আধুনিক বিশ্বে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অচিরেই এমনভাবে প্রতিষ্ঠা হবে, যে অধিকারে আমরা সবাই প্রাণ খুলে প্রাণের হাহাকার তথা প্রাণের কথা ও প্রাণের নাম উচ্চকিতে উচ্চারণ করতে পারব।

মানবাধিকারের প্রতি চীন সরকারের উদাসীনতা এবং অত্যাধুনিক বিশ্বের আইন ও বিচার
চীন সরকার যে কৌশলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রতি তাদের উদাসীনতা এবং অন্যের মতামত শোনায় অধৈর্য ও অসহিষ্ণুতার বিষয়টি এখন চীনা জনতার সাথে শুধু আমার মত নগণ্যকেই নয়, বিশ্ব বিবেককেও প্রতিবাদী করে তুলেছে। সরকারের একনায়কী চিন্তা বা কর্মের সাথে দ্বিমতী চীনাদেরকে শায়েস্তা করতে করতে চীন সরকার এখন অন্য দেশের স্বাধীন চিন্তা, মতামত ও স্বীকৃতির ওপরও কর্তৃত্ব করতে চাইছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য যখন কারাবন্দী লিউ জিয়াওবো`র নাম উচ্চারিত হচ্ছিল, তখনই চীন সরকার নোবেল কমিটিকে হুঁশিয়ার করে বলেছিল জিয়াওবোকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলে নরওয়ের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট হবে। নিরপেক্ষ ও নন্দিত নোবেল কমিটির প্রতি একটি নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রের তথা বিশ্বের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিভূর এ হুঁশিয়ারি হৃদয় বিদারক এবং তা বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতির জন্য হুমকি নয় কী?

চীনা কর্তৃপক্ষ একদিকে সে দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতা রুদ্ধ করে রেখেছে, অন্যদিকে অহিংস মানবাধিকার আন্দোলনের নেতাকে সুদীর্ঘকাল কারাবন্দী করে রাখছে। তদুপরি সে কারাবন্দীর প্রতি নোবেল পুরস্কার কমিটির মত সর্বজন গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি ও সহমর্মিতার বিষয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি বিরোধী। লিউ জিয়াওবো`র নোবেল পুরস্কার লাভের খবর চীনের জনগণের জানার ক্ষেত্রে মিডিয়া ও ইন্টারনেটের ওপর কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। চীনা এ নেতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিলাভ চীনাদের জন্য গৌরবের ব্যাপার হওয়া সত্ত্বেও সেই জনগণকে এতদসংক্রান্ত তথ্য ও খবরাখবর থেকে বঞ্চিত করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে চীন সরকার।

লিয়াওনিং প্রদেশের জিনঝু কারাগারে বন্দীদের সঙ্গে প্রতিমাসে নিকট আত্মীয়দের প্রত্যেককে একবার দেখা করতে দেয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু জিয়াওবো`র সাথে অন্যদের এমনকি তাঁর ভাইকেও দেখা করতে না দিয়ে কর্তৃপক্ষ নিয়ম-নীতির লঙ্ঘন করছেন। অন্যদিকে জিয়াওবো`র স্ত্রী সিয়াকে কোন অপরাধ ছাড়াই গৃহবন্দী করা হয় এবং তাঁর সাথে কাউকে দেখা করতে না দিয়ে আরেক অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। আবার শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পূর্ববর্তী কর্মসূচি অনুযায়ী চীনা মৎস্য উপমন্ত্রীর সাথে নরওয়ের মৎস্য মন্ত্রী বৈঠক করতে গেলে সে বৈঠকও বাতিল করে দেয় চীন।

নোবেল কমিটির মত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে চীনা কূটনীতি চীন সরকারের হস্তক্ষেপ নয় কী? নোবেল শান্তি পুরস্কারের মত মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ বিষয়ে অসৌজন্য ও ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ সুপ্রাচীন চীনা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে বেমানান নয় কী? লিউ জিয়াওবো বিশ্বমানের একজন অধ্যাপক, লেখক এবং অহিংস মানবাধিকার আন্দোলনকারী। তিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজের মত প্রকাশ এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন। তিনিতো দুর্নীতি-সন্ত্রাস বা সংঘাতময় কিছু করেননি, এমনকি ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত হীন স্বার্থ চরিতার্থের কোন কাজও করেননি। তাই অন্য সাধারণ কয়েদীদের সাথে তাঁর কারাবাস কারাগারের বাইরে থাকা আমাদের জন্য লজ্জাকর ও কষ্টদায়ক। তাঁর মত বিদ্বান ও কল্যাণকামী মানুষকে যদি আইন-শৃঙ্খলার জন্য বিপদজনক বলেই মনে করা হয়, তাহলে বড়জোর তাঁকে গৃহবন্দী করা যেত; কিন্তু বেইজিংয়ের দূরবর্তী নিম্নমানের কারাগারে সাধারণ কয়েদীদের সাথে কখনোই নয়।

যে আইনে জিয়াওবো কারান্তরালে নিক্ষিপ্ত হন, সে আইন কি সবার সমর্থিত? যে জনগোষ্ঠীর ওপর যে আইন প্রয়োগ হবে, সে আইন অবাধ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ঐ জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্তৃক প্রণীত বা অনুমোদিত হওয়া উচিত। আইন প্রণীত হওয়া উচিত মানুষ ও মানবতার কল্যাণের লক্ষ্যে; সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে। বিচার হওয়া উচিত সত্য-ন্যায় ও মানুষের অধিকার সমুন্নতের লক্ষ্যে; সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে এবং স্বচ্ছ আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। দ-াদেশ হওয়া উচিত আইন ও মানবতাকে সমুন্নত রেখে।

যে আইন মানুষের অধিকার ও মানবতা সংরক্ষণ করে না, যে আইন বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুণœ করে, যে আইন যুক্তি-ন্যায় ও কল্যাণের ওপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত নয় সেটিতো আইন নয়, বরং কালা কানুন। উদাহরণস্বরূপ কোন দেশের সরকারি ও বিরোধী দলসহ পার্লামেন্টের সকল মেম্বার মিলে একবাক্যে পার্লামেন্টে বললেন, সে দেশের একটি টোকাই বা স্ট্রীট বয়কে মেরে ফেলা হোক। হয়ত সে টোকাইয়ের কেউ নেই, কিছু নেই এবং তার পক্ষে কোন প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া নেই। তা সত্ত্বে¡ও পুরো পার্লামেন্ট ভবনসহ সকলে এক বাক্যে চাইলেও নিরপরাধ নগণ্য টোকাইয়ের একটি পশম ছেঁড়াও ন্যায়সংগত হবে না, হতে পারে না। যে আইনে মাননীয় বিচারক এরূপ নিরীহ ব্যক্তিকে হত্যার আদেশ দেন, সে আইনই বরং অন্যায় ও অবৈধ।

মানুষের অধিকার তথা ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাই হওয়া উচিত সকল আইনের মূল কথা। এমনকি আইন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা যদি যাচাই করতে হয়, তাহলেও তৎপূর্বে দেখা উচিত যে আইন মানবাধিকার বিরোধী হয়েছে কি না। যে আইনে মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা নেই সে আইন অকল্যাণকর, অযৌক্তিক ও পক্ষপাতদুষ্ট। গণতন্ত্রেও ব্যক্তি সার্বভৌম, মানবাধিকার সমুন্নত; গণতন্ত্র মানে হচ্ছে আলোচনা ও যুক্তিতর্ক; কথায় কথায় লাঠিপেটা বা জেল-জুলুম নয়। কারুর কথা, লেখা বা মতামত অপছন্দ হলে তা খ-াতে হবে যুক্তি দিয়ে। কিন্তু তা না খ-িয়ে এবং মত প্রদানকারীকে মতের ব্যাখ্যার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি মামলা-মোকদ্দমায় যাওয়া গণতান্ত্রিক রীতি ও আধুনিক সভ্যতার পরিপন্থী নয় কী?

গণতন্ত্রে কেউ নেতা-নেত্রী হতে পারেন, কিন্তু অধিকারের ক্ষেত্রে সাধারণের চেয়ে নেতা-নেত্রীর সুবিধা একতিলও বেশি নয়। এরূপ গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিষয়ে ঔদাসিন্য দেখিয়ে চীন সরকার যে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করছেন, তা কতটুকু ন্যায়, যুক্তিভিত্তিক ও আধুনিক এ বিষয়টি নিবিড়ভাবে ভেবে দেখার সময় এখনই। কারণ যে চীন এশিয়ানদের গর্ব, যে চীন এশিয়ান টাইগার থেকে ওয়ার্ল্ড টাইগার হবার পথে, যে দেশের প্রেসিডেন্ট এখন বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাবান ব্যক্তি, সেই চীনকে এখন বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার উজ্জ্বীবনের লক্ষ্যে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দর্শনের সংস্কারে এগিয়ে আসা উচিত বলে চীনের শুভাকাঙ্খীদের প্রত্যাশা।

জনগণকে বোকা বানানোর রাজনীতি অদ্যাবধি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকলেও আগামীর অত্যাধুনিক বিশ্বে এ রাজনীতি হবে অসার ও অগ্রহণযোগ্য। আদিম সে সমাজ ব্যবস্থা এখন আর নেই; প্রভাবশালী ক`ব্যক্তির নির্দেশ, নিয়ন্ত্রণ ও একচ্ছত্র শাসনে বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হবার বিষয়টি এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি (internet) -এর চরম উৎকর্ষের এ যুগে এখন সাধারণ মানুষরাও অনেক সচেতন ও স্বাধীনচেতা। সবাই চায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা, চায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন। মানুষের কথা বলার অধিকার তথা মৌলিক অধিকারের সাথে রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধা বা অন্যকোন বিষয়ের কম্প্রোমাইজ হতে পারে না। তাহলে সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার তথা বিশ্ব সভ্যতা হবে পর্যুদস্ত ও ভূলুন্ঠিত।

আইন প্রণেতাগণ অবাধ আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে জনস্বার্থে ও জন সমর্থনে আইন তৈরি করবেন, বিজ্ঞ বিচারকগণ সে আইনে বিচার করবেন এটি যাঁর যাঁর পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু মানবাধিকার সমুন্নতের উদ্দেশ্যে যেকোন নাগরিক কর্তৃক সে আইন ও সে বিচারের মূল্যায়ন বা মত প্রকাশ করার অধিকারে বাধা থাকবে কেন? এরূপ ন্যায়-অন্যায়ের সংঘর্ষে পড়ে জিয়াওবো দীর্ঘজীবন কাটাচ্ছেন কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। শান্তি পুরস্কার লাভের পর এবার তাঁর মুক্তির কথা চীন কর্তৃপক্ষ সুবিবেচনায় আনবেন বলে আমার বিশ্বাস। যে অপরাধে লিউ জিয়াওবোকে কারাদ-াদেশ দেয়া হয়েছে, অনুরূপ দোষ কি করেনি চীনা কর্তৃপক্ষ নোবেল কমিটিকে হুমকি দিয়ে এবং নোবেল পুরস্কার সম্পর্কে কূটনীতি চালিয়ে? চীনা কর্তৃপক্ষের সে দোষ খতিয়ে দেখা জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক কোন আদালতের উচিত নয় কী? যদি তা না হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বে সামাজিক ন্যায়বিচার কোথায়? বর্তমান বিশ্ব কি আধুনিক? কেউ যদি কথার কথায় বলেন এটি আধুনিক বিশ্ব; তাহলে আমি তাকে বলব, আসুন অত্যাধুনিক বিশ্বের সন্ধানে আরো বহুদূর এগোই। অভিধানে আধুনিকের ব্যাখ্যা যাই থাকুক না কেন, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে `আধুনিক` মানে তিনটি শব্দ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন।

একজন মানুষ একটি ক্লাব বা সমিতির সদস্য হলে তাকে সে ক্লাব বা সমিতির নিয়ম মেনে চলতে হয়। সেই মানুুষটিই আবার দেশের নাগরিক হিসেবে সে দেশের আইনে চলেন। তাহলে ঐ মানুষটি আবার বিশ্বের মানুষ (Global Citizen) হিসেবে বিশ্বের রীতি-নীতি বা আইনে পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হবার কথা নয় কী? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবাধে সেরূপ কার্যকর আইন ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। তা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও প্রান্তে মানুষ ও মানবতা কেঁদে মরতে থাকবে; যেমনি কাঁদছে লিও জিয়াওবো, অং সান সু কী`র আত্মা। মানুুষের মুক্তির জন্য নিজ জীবন উৎসর্গ করেও এমনকি নোবেল পুরস্কারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েও এসব মহান মানুষ যেভাবে অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে জীবন নিঃশেষ করছেন, তজ্জন্য বিশ্ব নেতাদের কিছু যায় আসে কি না, জানি না; নগণ্য আমি কিন্তু এ বিষয়টি ভাবতেই লজ্জাবোধ করছি।

খবরের কাগজে যখন আমি পড়েছি তিয়েন আন মেন স্কয়ারে নিহত ছাত্রদের উদ্দেশ্যে লিউ জিয়াওবো তাঁর শান্তি পুরস্কার উৎসর্গ করেছেন এবং এ উৎসর্গের বাসনার কথা স্ত্রীকে বলবার সময় তাঁর চোখ ছিল অশ্রুসজল, তখন তাঁর চোখের জল আমার এ দু`চোখকেও ছলছল করে তুলেছিল। তাঁর বুকের জ্বালা, তাঁর ট্র্যাজেডি আমার মর্মে এমনই গেঁথে গিয়েছে যে তাঁর মুক্তির কথা না শোনা পর্যন্ত মানব মুক্তির তৃষিত এ চাতক শান্তি পাবে না। তাই চীন থেকে সুদূরে বসে লিউ জিয়াওবো`র প্রতি হৃদয় ছোঁয়া ভালবাসার উৎসর্গে আমার এ লেখা।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইন ও বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, যে সম্পর্কে কিছু কথা বাংলাদেশ ও বিশ্ব অধ্যয়ন শীর্ষক কলামের ২২ নং পর্বে লিখেছি। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপুঞ্জ ও আন্তর্জাতিক সকল সংঘ শতভাগ স্বচ্ছ হলে এবং সে আইন প্রয়োগে নিশ্চয়তা বিধান করলেই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। শান্তি আকাশ থেকে আসবে না, অন্বে^ষণ করে আমাদেরকেই শান্তি আনয়ন করতে হবে এ বিশ্বে।

আমার সংশ্লিষ্ট ছোট্ট প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পাস সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্রের সদস্য ও স্টাফদের মধ্যে নিম্নোক্ত আচরণবিধি প্রয়োগ করে দেখেছি যে, এসব সুস্থ ও স্বাভাবিক আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে ব্যক্তি-পরিবার-প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক জীবন সুখময় ও ছন্দময় হয়ে ওঠে। যেমন

১। যুক্তিভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক আচার-আচরণ করা
২। অন্যের অধিকার ও নিজ দায়িত্বের প্রতি সচেতন হওয়া
৩। ন্যাচারাল হওয়া তথা সহজ-সরল ও স্বাভাবিক থাকা
৪। ক্ষমাশীল ও ধৈর্যশীল হওয়া
৫। Thankful & Grateful হওয়া
৬। ধর্ম-কর্ম পালন ও অন্যের ধর্মকে সম্মান করা।

আমার বিশ্বাস, বিশ্ব-নেতাগণ বিশেষতঃ দেশে দেশে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানকারী সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্বগণ যদি এ ক`টি বিষয় বিশ্ব পরিসরে অনুশীলন করেন, তাহলে বিশ্বশান্তি আসবেই আসবে। কথিত এ আধুনিক বিশ্বের বিচার ব্যবস্থা কিন্তু এখনও আধুনিক নয়। এখনো মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণী বিত্তের জোরে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করে, পক্ষান্তরে বিত্ত নেই বলে বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠী ভাল আইনজীবীর সার্ভিস থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখনো কোর্টে মামলার জট এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। মিথ্যাবাদী সনাক্তকরণ যন্ত্র না থাকায় আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে পার পাওয়া যায়। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর কারণে দরিদ্র দেশগুলো প্রয়োজনীয় বিচারক ও জুডিশিয়াল স্টাফ নিয়োগ করতে পারে না। এসব দেশে আদালতে কেস ওঠার কোন সুনির্দিষ্ট সময় থাকে না বলে বাদী-বিবাদীকে দিনভর কোর্ট চত্বরে উদ্বেগ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। ফলে বিচারপ্রার্থী ভদ্রজনরা কোর্টকে avoid করতে গিয়ে প্রার্থিত বিচারকেই এড়িয়ে চলেন। এতে আসামীর পোয়াবারো এবং ফরিয়াদীর বারোটা বেজে সামাজিক শৃঙ্খলার বাজছে তেরটা, বিশৃঙ্খলার ঘটছে বিস্ফোরণ।

এখনো অনেক দেশেই শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না বিচারালয় এবং শক্ত হাতে বিচারের নিক্তি বা পাল্লা সমান করে তুলে ধরতে চেষ্টা করেও সক্ষম হয়ে উঠছেন না মাননীয় বিচারকগণ। ফলে সেসব দেশে সরকার বা প্রভাবশালী আইনজীবীদের প্রভাবে কোন কোন ক্ষেত্রে বিচারের রায় পরিবর্তন হয়ে যায় বলে কোর্ট সংশ্লিষ্টদের অভিযোগেই প্রকাশ। কোর্টের এসব হালচাল জেনে আমরা সাধারণ জনগণ হয়ে পড়ি হতাশাগ্রস্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এরূপ বিভিন্ন কারণেই গড়ে উঠছে না বিশ্বব্যাপী প্রকৃত স্বাধীন বা নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা; মানবাধিকার-গণতন্ত্র এবং বিশ্ব শান্তিতো সুদূর পরাহত।

দেশ-কাল-পাত্রের সকল সংকীর্ণতা ভুলে আমাদেরকে আন্তর্জাতিক হতে হবে; ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ ত্যাগ করে মানবতাবাদী এবং অন্যের অধিকারের প্রতি দায়িত্ববান হতে হবে। তবেই সমাজ, দেশ ও বিশ্বে শান্তি-সমৃদ্ধি আসবে। ক্ষুদ্রত্বের গন্ডি থেকে বেরিয়ে আন্তর্জাতিক হতে না পারলে মানবতার জয়গান কোনকালেই ধ্বনিবেনা এ বিশ্বচরাচরে। আন্তর্জাতিক না হয়ে অগণতান্ত্রিক, অমানবিক ও স্বেচ্ছাচারের আবর্তে পড়ে যারা লিউ জিয়াওবো এবং অং সান সু কীদের বন্দী করে রেখেছে, তাদের বোধদয় হচ্ছে না যে কারার বাইরের চেয়ে কারাগারেই এঁরা বেশি শক্তিশালী, জনপ্রিয়, গ্রহণীয়, বরণীয়; এক জিয়াওবো বা সু কীকে অমানবিক আচারে বন্দী রেখে বিশ্বব্যাপী তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ-কোটি জিয়াওবো এবং সু কী, যারা বিশ্বে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করবেই করবে; এতে যত সময় ও সংগ্রামই লাগুক না কেন!

তাই গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি উদাসীন সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি সনির্বন্ধ আবেদন লিউ জিয়াওবো এবং অং সান সু কীসহ বিশ্বের সকল অহিংস ও মানবাধিকার আন্দোলনকারীদের অবিলম্বে মুক্তি দিন, মুক্ত করুন। তৎপরিবর্তে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী, যুদ্ধবাজ, তেল ছিনতাইকারী, লুটেরা এবং গণতন্ত্র ও মানবতা হন্তারকদের কারাবন্দী করুন। তাহলেই আসবে বিশ্বশান্তি ও সমৃদ্ধি। আর আপনারাও অভিষিক্ত হবেন ঐতিহাসিকভাবে। মানবতাবাদী বিশ্ববাসীর সে অভিনন্দন গ্রহণে যদিও দেরি হয়ে গেছে, তবুও better late than never, please...। তা না হলে অতীত ইতিহাসের ন্যায় আগামীর ইতিহাসও কাউকে ক্ষমা করবে না। কারণ মুক্তবুদ্ধির চর্চা তথা মানবমুক্তি বা মানুষের অধিকার (Freedom) প্রতিষ্ঠা চিরন্তন, স্বতঃসিদ্ধ ও প্রাকৃতিক; তা যত শত বছরে এবং যত সংগ্রামের বিনিময়েই হোক না কেন। শীঘ্রই হোক সকলের বোধদয়, মানবতা মুক্তি পাক সকল শৃঙ্খল থেকে; শুভ হোক সকল মঙ্গল প্রয়াস।