Sun Sun Sun Sun Sun
English

দায়িত্বশীল হওয়া এবং দেনা ও দায় মুক্ত থাকার সুফল

|| ড. এম হেলাল ||
সুস্থ ও সবল মননের পূর্বশর্ত হচ্ছে অন্যের সকল পাওনা পরিশোধ এবং নিজের ওপর অর্পিত সকল দায়-দায়িত্ব পালন করা। এই দায়িত্ব পালনকে সংক্ষিপ্তরূপে বা সংকীর্ণমনে দেখলে চলবে না। এক্ষেত্রে দায়িত্ব বলতে মা-বাবা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, চাকর-চাকরানী, সহকর্মী (ঊর্ধ্বতন-অধস্তন), প্রতিবেশী অর্থাৎ পরিবার-অফিস-সমাজ-জাতি এবং স্রষ্টার ও সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বের কথা বোঝানো হয়েছে। দুঃখজনক যে, কেবল মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি এবং স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনকেই আমরা জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকি এবং সেক্ষেত্রেও কতজন কতটা সক্ষম হই তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে; স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব পালন পর্যন্ত পৌঁছানোতো অনেক দূরের কথা। 

আমাদেরকে যেমনি পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনি সচেতন সুনাগরিক হিসেবে সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব পালন এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়িত্বও পালন করতে হবে। অর্থাৎ `বাসা-অফিস-বাজার-বাসা` এ সংকীর্ণ বৃত্তে আবর্তিত হওয়ার জন্যই যে আমরা পৃথিবীতে আসিনি, তা বোধে নেয়া খুবই জরুরি। ঘরে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান যেমনি জরুরি, তেমনি ঘরের বাইরে থাকা মানুষ এমনকি গাছগাছালির প্রতি দৃষ্টি রাখা, যত্ন নেয়া নিজ জীবনের সমৃদ্ধি ও সার্থকতার জন্য কম দরকারি নয়। এ প্রসঙ্গে আমার ছোটবেলার একটি ঘটনা বলছি। 

আমি গ্রামের স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাড়িতে একটি লিচু গাছ ছিল। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একদিন দেখলাম, সে লিচু গাছটির সব পাতা ঝরে গেছে; অর্থাৎ গাছটি মরে যাচ্ছে। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে এর মরে যাবার কারণ বোঝার চেষ্টা করলাম। এরপর বাড়িতে ঢুকে বই-খাতা রেখেই মাকে গিয়ে বললাম এ লিচু গাছ থেকে আমি আবার লিচু বের করব; কিন্তু লিচুর অর্ধেক আপনার, অর্ধেক আমার। মা সানন্দে রাজি হলেন। যে কথা সেই কাজ এবং তা কাল থেকে নয়, আজ থেকেই। খন্তা-বালতি নিয়ে প্রথমে লিচু গাছের চতুর্দিকে মাটির বাঁধ তৈরি করলাম। শুকনো গোবর ও কচুরিপানা যোগাড় করে গাছের গোড়ায় দিলাম। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে ৭/৮ বালতি পানি ঢালতে থাকলাম। গ্রীষ্মের খরায় পানি উঠাতে হতো খুবই নিচু তথা গহীন কুয়া থেকে।  ক`দিন পরই গাছে পাতা আসতে শুরু করল। ক`মাস পর গাছে ফুল এল, ফল এল; থোকায় থোকায় লিচু ধরল। রাতে পড়ালেখা করতাম আর লিচুখেকো বাদুড় তাড়াতাম। দিনে স্কুলশেষে লিচু বিক্রি করে পয়সা জমাতাম। 

ছোটবেলায় শুনতাম, আমাদের বাড়ির মাটি কাঁঠাল গাছ জন্মানোর অনুপযোগী প্রকৃতির ওপর এ দোষারোপ আমি মেনে নিতে পারিনি। তাই ৪টি জায়গায় মাটি উপড়ে ফেলে তদস্থলে গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাঁঠাল বীচি রোপণ করি। ৪টি জায়গা থেকেই অঙ্কুর হয়, গাছ হয়, ফুল হয়, ফল হয় আজ অবধি। সুদীর্ঘ ৪ দশক পর এখনও ঐসব গাছের কাঁঠাল কেউ ঢাকায় নিয়ে এলে কিশোর মনের সেসব শক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাসের নস্টালজিয়া পেয়ে বসে আমাকে। জীবনে বজ্রকঠিন শপথের সেইতো বীজ বপন; সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সেইতো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন; যার পথ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই এ বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয় Impossible is a word, I don`t believe; অসম্ভব বলে কোনো শব্দ আমার চিন্তার অভিধানে নেই; পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান নেই।

এরপর মায়ের কাছ থেকে আরও বড় কন্ট্রাক্ট নিলাম। সব নারিকেল ও সুপারি গাছের গোড়ায় অনুরূপ ব্যবস্থা নিলাম এবং চুরি হওয়া থেকে নারিকেল-সুপারি রক্ষার জন্য গাছে কাঁটাতার লাগিয়ে দু`তিন গুণ ফল ফলিয়ে তা বিক্রি করে ছোটবেলাতেই আমি বড়লোক। সেই থেকে অদ্যাবধি কোনো ছোটলোকী মনোভাব রইল না আমার মধ্যে। সৃষ্টির সেবা ও সাধনার ফল যে মেলেই মেলে এ পরীক্ষার ফলাফল আমার জীবনে বিরাট আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।  এতো গেল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে হাতে হাতে ফল পাওয়ার উদাহরণ। আর দেনা? দেনার ক্ষেত্রে এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে আমার নিকট কারুর কোনো পাওনা থাকেই না। সংশ্লিষ্টদেরকে বলা আছে, কেউ যদি যৌক্তিক দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে বিনা কারণে আমার কাছে কারুর পাওনা বাকি পড়ে আছে, তাহলে তার সব পাওনা পূরণসহ তাকে অন্তত ১০,০০০ টাকা পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হবে। 

সর্বপ্রকার দেনা ও দায় মুক্তির এরূপ নিশ্চয়তা নিজের প্রতি আস্থার ভিতকে মজবুত করে দেয়। দ্বিধাহীন, সংশয়হীন যাপিত জীবনের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমানের সংকট কাটানো সহজ হয়ে যায়। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান মন সম্মুখে চলার উদ্যম বাড়িয়ে দেয়; রাখে না পিছুটানের কোনো সুযোগ; তৈরি হয় সৃজনশীল মন। অসুখ-বিসুখ, বিপদ-আপদের পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়া সহজ হয়ে যায়। স্রষ্টার কৃপা চাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতের সুকীর্তি Point of reference হিসেবে কাজ করে, এরূপ আত্মবিশ্বাসী মানুষের সামনে কোনো বাধা এসে ভর করতে বা টিকতে পারে না। তাই উচ্ছল-উজ্জ্বল-আলোকিত মনের আলোকচ্ছটায় এরা উদ্দাম গতিতে ছুটে চলে সম্মুখে।  Power of positive thinking -এর আনন্দ সরোবরের এ জীবন ইহকাল ও পরকালের জন্য বড়ই আরাধ্য।  

প্রিয় পাঠক, সর্বক্ষেত্রে দায় ও দেনামুক্ত থাকার এ সুস্থ ও মহানন্দের জগতে সবাইকে স্বাগতম। আসুন, অন্তত এই একটি নীতি দিয়েই আমরা নতুন সভ্যতা এবং ন্যায় ও শান্তির বিশ্ব গড়ে তুলি।