Sun Sun Sun Sun Sun
English

স্বামী-স্ত্রী কেউ কারুর প্রতি অকৃতজ্ঞ হইও না
সম্পর্কের শুরুতে যে ছিল তোমার জন্য আরাধনা
তার ক্ষতির চেষ্টায় নিজ সন্তানের জীবন নষ্ট করো না

|| ড. এম হেলাল ||
দৈনন্দিন জীবন-যাপনের প্রতি পদে পদে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে এবং স্রষ্টা ও প্রকৃতি থেকে আমরা কত রকমের সার্ভিস যে গ্রহণ করে চলেছি, তার হিসাব কষতে গেলে কাগজ-কলম ফুরিয়ে যাবে। অন্যের সেবা গ্রহণ করতে আমাদের অনেকেরই লজ্জা হয় না, অথচ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে লজ্জিত হই কিংবা কুণ্ঠিত হই; এটি হীনম্মন্যতা তথা এক ধরনের মানসিক রোগ।

উপকারীর উপকার স্বীকার না করা এবং তাকে কৃতজ্ঞতা না জানানো কিংবা অন্যের নিকট নিজ ঋণের কথা স্বীকার ও প্রকাশ না করা সংকীর্ণতা ও নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। মহাকবি শেখ সাদী বলেছেন- যার বুদ্ধি নেই, তার থেকে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা আশা করো না।

অন্যকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো মানে নিজের দায় পরিশোধের সার্টিফিকেট তথা স্বস্তিলাভ। তাই অন্যের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা পোষণ নিজের উদারতা, সততা, সৃজনশীলতা ও সুস্থতার জন্যই প্রয়োজন। নিজের বিবেককে যদি বলা যায় যে- আমি যার কাছ থেকে যে সুযোগ-সুবিধা-সহযোগিতা, কর্ম ও সেবা গ্রহণ করে দায়ে পড়েছি; তজ্জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ থেকে, ধন্যবাদার্হ হয়ে দায়মুক্ত হতে পেরেছি -তাহলে আপন অন্তর্জগত ভারমুক্ত হয়ে যায়। পিছুটানহীন এই সহজ-সরল, স্বস্তিকর অনুভূতি মস্তিষ্কে ও মননে আনন্দ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্ক থেকে সে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেহ-মনে; যে আনন্দের আতিশয্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শারীরিক-মানসিক জ্বালা-যন্ত্রণা ও ব্যথা-বেদনা দূর হতে থাকে এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধের শক্তি তৈরি হতে থাকে নিজের ভেতরে।

যে সেবাটি যে মানুষকে আমি দিতে পারব না কিংবা যে কাজটি করার সক্ষমতা আমার নেই- সেই সেবা, সেই কাজ ঐ মানুষ থেকে গ্রহণ করা বা ভোগ করা মানে তার কাছে আমার ঋণগ্রস্ত হওয়া নয় কি? তাই অন্য অনেকের পাশাপাশি সুইপার বা ক্লিনারের কাছেও কি আমি ঋণী নই? তার বা তাদের কাছে ঋণ স্বীকার নাইবা করলাম, কিন্তু নিজের মধ্যে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা এবং মানবিক গুণ তৈরি ও লালনে অসুবিধা কোথায়? সেই গুণ অর্জনে অনীহা ও ব্যর্থতা মনুষ্যত্বহীনতার পরিচায়ক নয় কী? মনুষ্যত্বহীন মানুষ অবিরাম সাফল্যের পথে এগুবে কী করে?

কেবলই অর্থের বিনিময়ে এ ঋণ শোধ করার মানসিকতা কিন্তু অমানবিকতা বলে পরিগণ্য। এটি স্বার্থপরতা, ঔদ্ধত্য, গোঁড়ামি ও অবৈজ্ঞানিক মানসিকতার পরিচায়ক। যাদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এত্তসব সেবা প্রতিনিয়ত গ্রহণ করে যাচ্ছি- তাদের সবার কাছে গিয়ে ঋণ পরিশোধের বা দায় মোচনের কিংবা কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ তৈরি নাইবা করলাম; অন্তত নিজের ভেতরে কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি বা বিনয়বোধ জাগাতে সেবা-সংশ্লিষ্টদের জন্য মনে মনে ডরংয বা শুভকামনা জানাতে সমস্যা কী? আমার ঋণ স্বীকারে ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপনে তাদের লাভ হোক বা না হোক, আমার দায়মোচনের মাধ্যমে ব্রেনে ডায়নামিক পজিটিভ নিউরন তৈরি হয়ে আমার প্রশান্তি ও লাভ নিশ্চিত হয়ে গেল। কারণ তাদেরকে শুভ ইচ্ছা জানানোর আকাক্সক্ষা আমার মস্তিষ্কে তৈরি হলে, তা মস্তিষ্ক থেকে আমারই দেহ-মনে সঞ্চারিত হয়ে তাদের উছিলায় আমার সবকিছুতে শুভ ও কল্যাণ ঘটতে থাকবে। অন্যদিকে নিজকে দায়মুক্ত, ভারমুক্ত ও ব্যালেন্সড মনে হবে। এতে আমার মানবিক গুণ তৈরি হলো, আমি উন্নত মননের স্তরে পৌঁছে গেলাম, আমি আলোকিত হলাম এবং সে আলোয় আমি সুস্থ ও সমৃদ্ধ হলাম; আমার আশপাশের মানুষদেরও ঐ আলোয় আলোকিত ও সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হলো। কারণ চিন্তা ও মননের উচ্চ পর্যায়ে যারা পৌঁছাতে সক্ষম হন, তারা যা চান তাই হয়ে যায়। স্রষ্টার নিকট তাদের চাওয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পূরণ হয়ে যায়।

কি আরাম, কি শান্তি, কি সহজ-সরল পথ এগুলো! অথচ এ সরল পথে না গিয়ে এবং নিশ্চিত শান্তি ও সমৃদ্ধি থেকে আমরা বঞ্চিত হয়ে নিজের স্বাস্থ্যহানি ও আয়ুক্ষয় করে চলেছি, সমাজকে করছি বিভ্রান্ত ও কলুষিত- সে ধারণা আমাদের ক’জনের বোধে আসে? যাদের বোধে আসে, তারা এ দর্শন বা নীতি কতটা মান্য করছি? অন্যদেরকে এ সত্য-সুন্দরের পথে কতখানি উদ্বুদ্ধ করছি? এরূপ দৃঢ়কণ্ঠের দাবিদার এ সমাজে পাওয়া যাবে কতজন? যদি পাওয়া না যায়, তাহলে এ সমাজ বা জাতির গন্তব্য কোথায়? কারণ এসবই আমাদের স্বাস্থ্য-সুখের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণ এবং জাতিগত সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্ববহ বিবেচ্য বিষয়। তাইতো কারও উপকার করার পর তিনি উপকার পেয়ে ধন্যবাদ দিক বা না দিক, উপকার গ্রহণের জন্য তাকে আমরা ধন্যবাদ দিয়ে নিজে আরো বড় হতে বাধা কোথায়? আমার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পাস’র বিভিন্ন কর্মসূচির সাথে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-যুবকদেরকে এরূপ চর্চায় আমরা উদ্বুদ্ধ করি। রবী ঠাকুরের একটি রোমান্টিক বন্দনার সাথে ক্যাম্পাস’র এ দর্শনের বেশ মিল রয়েছে।

তোমারে যা দিয়েছিনু, সে তোমারই দান
গ্রহণ করেছ যত, ঋণী তত করেছ আমায়।

অতীতে যাই করে থাকি না কেন, এখন থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের দর্শনে সবাই নিজ নিজ মানবিক গুণাবলি তৈরি ও বৃদ্ধির মাধ্যমে সুস্থ, নিরোগ, আলোকিত, সমৃদ্ধ জীবনের পথে পা বাড়াই। যার কাছ থেকে যা পাই, তজ্জন্য তাকে ধন্যবাদ দেই; স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা জানাই। সবাই সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজের অহংকার ও ঔদ্ধত্যজনিত অসুস্থতা ঝেড়ে ফেলি। নিজ সুস্থতা ও আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি করি, সমাজে-জাতিতে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনি।


পরিবার থেকেই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার চর্চা
পরিবার-পরিজনের মধ্যে পরস্পরকে ধন্যবাদ দেয়া এবং পরস্পরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মানসিকতা ও চর্চা গড়ে তোলা দরকার। এমনকি জন্মের পর থেকে প্রথাগতভাবেই আমরা আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ আশপাশের অনেকের ত্যাগ ও সহযোগিতাকে আমরা নিশ্চিত প্রাপ্য বা Taken for granted বলে মনে করি এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে কুণ্ঠাবোধ করি। এরূপ হীন মানসিকতা ঝেড়ে ফেললে পারিবারিক শান্তি বৃদ্ধি পাবে। তাই আসুন, সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আমরা যাদের ওপর নির্ভরশীল এবং যাদের কাছে ঋণী, তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মানসিকতা তৈরি করে সুস্থ, ভারসাম্য ও শান্তিময় জীবনযাপনে অভ্যস্ত হই। আর দেখুন না, এই আমিওতো ঋণী আপনাদের সবার কাছে, নিশীথ নিদ্রা ত্যাগ করে লেখা আমার এ কথাগুলো পড়ার জন্য। তাই এ ভবঘুরের সহজ-সরল চেতনাকে লালন করার জন্য আগাম ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

এ লেখার সমৃদ্ধি ও সত্যতা প্রমাণে অকৃতজ্ঞতার পরিণামের দু’টি উদাহরণ দিচ্ছি। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে বণি ইসরাইল যুগের একটি উপাখ্যানে স্বামীর প্রতি এক নারীর অকৃতজ্ঞতার সকরুণ কাহিনী; অন্যটি হচ্ছে আধুনিক কালের এক দম্পতির মধ্যকার অকৃতজ্ঞতার বাস্তব চিত্র। দু’ক্ষেত্রেই রয়েছে সঙ্গীর প্রতি অকৃতজ্ঞতার পরিণাম এবং অন্যের প্ররোচনায় নিজের পরিবার ভেঙে দেবার নিদারুণ ট্র্যাজেডি।

সুপ্রিয় শুভানুধ্যায়ী, প্রথমে বনি ইসরাইলের যুগে হযরত মুসা (আঃ) এর একটি উপাখ্যান। কৃতজ্ঞতাবোধের অভাবে মানুষের পরিণতি-পরাজয় যে কত ভয়ঙ্কর হয়, এতে তা একেবারে সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছভাবে প্রস্ফূটিত হয়েছে। এটি এমনই এক উপাখ্যান, যা আরব্য রজনীর কাহিনীকেও হার মানায়।


প্রথমতঃ বনি ইসরাইল যুগে
পরিবারে অকৃতজ্ঞতার উদাহরণ

এক লোক তার স্ত্রীকে এতই ভালোবাসতেন যে, স্ত্রীর ইন্তেকালের পর তিনি স্ত্রীর কবরে গিয়ে দিবারাত্রি পড়ে থাকতেন। ঐপথে হযরত মুসা (আঃ) এর যাতায়াত ছিল। একদিন মুসা (আঃ) থমকে দাঁড়ান ঐ কবরের পাশে। স্বামীর আহাজারি দেখে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিতে বলেন। আল্লাহ তাঁকে বলেন, এরূপ ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ মৃত্যুর বিধানে নেই। তবে যদি এ ব্যক্তি তার আয়ুষ্কালের কিছু সময় তার স্ত্রীকে দিয়ে দিতে রাজি হয়, তাহলেই তা সম্ভব। তখন ঐ ব্যক্তি রাজি হয় যে, তার আয়ুষ্কালের অর্ধেক তার স্ত্রীকে দিয়ে হলেও তিনি তার প্রিয়তমাকে পেতে চান। এভাবে তিনি পুনরায় পেয়ে যান তার স্ত্রীকে এবং চলে যান লোকালয় থেকে নিভৃতে, গভীর বনে। সেখানে তাদের প্রণয়-ভালোবাসাময় জীবন দিব্যি কাটছিল। কিন্তু এখানেও বিধি বাম। একদিন স্ত্রীর জন্য খাবার সংগ্রহ করতে স্ত্রীকে রেখে একটু দূরে যান স্বামী। এমনি সময়ে ঐ স্থান দিয়ে শিকারে যাচ্ছিলেন রাজপুত্র। হঠাৎ ঐ সুন্দরী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে ফুসলিয়ে ঘোড়ায় উঠিয়ে নিয়ে যান রাজবাড়িতে। স্বামী খাবার নিয়ে এসে দেখেন, যথাস্থানে তার স্ত্রী নেই। হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান পান, রাজার ছেলের ঘোড়ার পিঠে ঐরূপ চেহারার এক নারীকে দেখা গেছে। স্বামী দ্রুত চলে যান রাজদরবারে। রাজার কাছে স্ত্রীকে ফেরত চাইলে রাজা অবাক হন। অবশেষে রাজা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, তার পুত্র ঐ নারীকে নিয়ে এসেছেন। তখন ঐ নারীকে ডেকে স্বামীর দ্বারা তাকে সনাক্ত করালেও স্ত্রী কিছুতেই রাজি হয় না রাজবাড়ি থেকে স্বামীর সাথে ফেরত যেতে। তখন রাজা ঐ লোকের কাছে স্ত্রীর দাবির পক্ষে সাক্ষ্য চান। কোনো উপায়ান্তর না দেখে অসহায় ও নিরুপায় স্বামীটি আবার ফিরে যান স্ত্রীর ঐ কবরে। সেখানে আহাজারি করাকালীন মুসা (আঃ) পথিমধ্যে থেমে জিজ্ঞাসা করেন, পুনরায় কী হয়েছে তোমার? তখন সব ঘটনা জেনে এবং তার স্ত্রীর দাবি রাজদরবারে প্রমাণের জন্য একজন সাক্ষীর প্রয়োজনের কথা শুনে মুসা (আঃ) বলেন- চলো, আমি যাব রাজার কাছে।

রাজদরবারে গিয়ে মুসা (আঃ) নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করলেও ঐ রমণী রাজপ্রাসাদ ও রাজপুত্রকে ছেড়ে প্রকৃত স্বামীর কাছে না যেতে অনড় অবস্থার কারণে রাজা তাকে ফিরিয়ে দিতে পারছিলেন না। অবশেষে হযরত মুসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলেন, স্ত্রীর জন্য স্বামীর দেয়া আয়ুর অংশ স্ত্রীর থেকে নিয়ে স্বামীকে ফেরত দিতে। এতে ঐ রাজদরবারেই তাৎক্ষণিক পুনঃমৃত্যু হয়ে যায় সেই ঐতিহাসিক অকৃতজ্ঞ রমণীর।


দ্বিতীয়তঃ আধুনিক যুগেও স্বামীর প্রতি
স্ত্রীর অকৃতজ্ঞতার আরেক ট্র্যাজেডি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুউন্নত বিষয়ে অধ্যয়ন করা আধুনিক দু’উচ্চশিক্ষিত পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে ভালোবেসে নিজেদের পছন্দে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে। সাধারণত এরূপ গোপন বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে পাত্রের ইচ্ছা বেশি দেখা গেলেও এ জুটির ক্ষেত্রে পাত্রীর আগ্রহ-ক্রেজ ও প্ররোচনাই ছিল বেশি। যার বহু প্রমাণের মধ্যে একটি এখানে তুলে ধরছি। পাত্রীর নিজ অভিলাষ বাস্তবায়ন হবার পর তথা বিয়ে-পরবর্তী সময়ে এ পাত্রীর স্বহস্তে লেখা ডাইরি তথা মনের একান্ত গোপন অনুভূতি ছিল এরূপ- “এক সন্ধ্যায় টেলিফোনের রিং শুনে নিতান্ত দায়সারাভাবেই রিসিভার তুলেছিলাম। অথচ এই ফোন কলটাই আমার জন্য এক অপার বিস্ময়ের দরজা খুলে দিল। ওর দারুণ ভরাট আর আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বর কেন জানি আমার হৃৎপিন্ডে মৃদু আঘাত করতে লাগল। ও ফোন করেছিল বাবার কাছে। বাবা বাসায় না থাকায় আমার সাথেই বেশ আলাপ হয়ে গেল। তবে সে শুধুই নিছক আলাপ; ওর পরিচয় জানলাম। সে রাতে কেন যে ভালো ঘুম হলো না..। আমার মতো ঘুমকাতুরে মেয়ের ঘুম কেড়ে নিতে পারে, এমন কী আছে ঐ কন্ঠস্বরে? চিনি না, জানি না -এমন একজনের জন্য কীসের এত ভাবনা!

আমাদের আলাপনের শুরুটা এমনই। তারপর মাঝে মধ্যে কথা হতো ফোনে। বুঝতে পারছিলাম না ওকে কেন জানি এত ভালো লাগছিল! নিজেকে শাসনের বেড়ি পরাতে চাইলাম। কিন্তু মন সেই বেড়িটাকে সুতোর মতো ছিঁড়ে ফেলে ওর কাছে ছুটে যেতে থাকল। 

খুব সাধারণভাবেই ওকে বাসায় নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম আমার জন্মদিনে। আর ওর নিয়ে আসা বিশাল ফুলের সমারোহ আমাদের প্রথম দেখার মুহূর্তটাকে দারুণভাবে সুন্দর করে দিল..। আমার বন্ধুদের আনা ততোধিক ছোট ফুলের বুকেট দেখিয়ে দলবদ্ধভাবে বন্ধুরা ওকে বলতে চেয়েছিল- Small is beautiful...। তাদের কথা শেষ না হতেই ও জবাব দিয়ে দিল- ভালো জিনিস যত বেশি বড় হয়, ততই ভালো; আর সে কথাতো আমাদের বিশ্বকবি এবং তোমাদের ঠাকুর দাদাই প্রমাণ করে গেছেন। এরূপ বিভিন্নভাবে তার চৌকস ব্যক্তিত্ব আমাকে যেন নিমিষেই পাগল করে দিল...। তারপরও আমি নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেছি। এই পাগল করা কণ্ঠের ব্যক্তিত্ববান পুরুষটিকে সরিয়ে দিতে চেয়েছি মন থেকে। নিজেকে নিজে নানান যুক্তি দেখিয়েছি ওর বিরুদ্ধে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

ইতোমধ্যে বাসা পাল্টানোর ঝামেলা গেল। বাবার কর্মস্থলের বাসা থেকে আমাদের নিজ এ বাসায় আসার ২/১ দিনের মধ্যেই কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে গেলাম ওর কাছে যাওয়ার জন্য। মনে হলো আর ফিরে আসার উপায় নেই। আপনি থেকে তুমিতে নামার আগেই আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি। দুর্বার এক আকর্ষণে ছুটে গেলাম ওর কাছে। 

প্রথমদিন স্পষ্ট করে কেউই তেমন কিছু বলতে পারছিলাম না। বনানীর একটি রেস্টুরেন্টে বসে আলাপ হচ্ছিল। হঠাৎ একটা গরম ডিশে আমার আঙুল লেগে আঙুলটা জ্বলে উঠল। হয়ত ওর স্পর্শ লাভের একটা সুযোগ করে দিলেন বিধাতাই। আমি উহু বলতেই ও আমার আঙুলটা ধরল। কি মায়া! কি ভালো লাগা! কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র। এরপর স্কুটারে বসে পরম মায়ায় আমার হাতটা ও ধরেছিল। কেউ তেমন কিছুই বলছিলাম না, অথচ কত কিছুই বলা হয়ে গেল।

ওকে না জানিয়ে পরদিনই শাড়ী পরে ওর দরজায় ছুটে গেলাম আবার। যেন সেই সাত সকালে নীরবে আমার মন বলছিল- আমি নিঃস্ব, রিক্ত। আমাকে তুমি পূর্ণ করো, ধন্য করো। আমাদের দাম্পত্যের পদযাত্রা সেদিন থেকেই। কেমন করে যেন চাওয়া না চাওয়ার মাঝে সব হয়ে গেল। আর কিছুদিনের মধ্যেই কাজী অফিসে গিয়ে কাগজে কলমে, ধর্মের বাঁধনে আমাদের বন্ধনটাকে আরো জোরালো করে নিলাম। ওর গভীর ভালোবাসার আদরে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে কখনও সরবে, কখনও নিঃশব্দে। কখনও অহংকারের পদভারে নত, কখনও অভিমানের ছোঁয়ায়। 

জানি না আরো নিজের করে কবে পাব ওকে। একদিকে পরিবারের স্বীকৃতি হয়নি, অন্যদিকে আমিতো বিধাতার কাছে অনেক অপরাধে অপরাধী। আর এই পাপিষ্ঠার এই সুখ বিধাতা কবে আরো সহজ করে দিবেন, তা তিনিই জানেন। ও যেমন চায়, তেমন কেন হতে পারি না আমি। এত চেষ্টা করি তারপরেও কোথায় কী জানি ভুল হয়ে যায়..।” প্রিয় পাঠক, আপনার কাছে আপাতঃ অবিশ্বাস্য মনে হলেও এসব কিন্তু শতভাগ বাস্তবিক সত্য; যার প্রামাণ্য দলিলাদি হাতে রেখেই তারপর পরিবার সম্পর্কে আপনাদের চিন্তা ঢেলে সাজানো এবং আরো সুখী-শান্তিময় করার প্রয়াসে নগণ্যের এ উপস্থাপন।

এতক্ষণ আপনারা জানলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠা সেই স্কলার মেয়েটির অনুভব-আকাক্সক্ষার কথা এবং গোপনে বিবাহ করা স্বামীর কাছে নিজ আবদারের কথা, তার স্বহস্তের লেখা থেকে। কাজী অফিসে গিয়ে করা বিবাহ সবার কাছে গোপন রেখে এবার তার বাবার বাড়িতে ঘরোয়া পরিবেশে পুনঃআক্্দ। অতঃপর একদিকে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের বিষয়টি সমাজে জায়েজ করে নেয়া এবং অন্যদিকে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের ও আর্থিক স্বচ্ছল স্বামী-ক্রেজ সহ্য করতে না পেরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সামাজিকভাবে বিবাহ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নিজ পরিবারে এবং স্বামীর পরিবারে সে বিভিন্ন কৌশলী চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।  

পারিবারিকভাবে বিয়ের পরপরই এ অভিলাষী নারীকে তার শাশুড়ি বলে- আমার এ ছেলে ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত সৎ, পরোপকারী, উদারমনা এবং আল্লাহ-রসুল ভক্ত। তার কাছ থেকে তুমি সারাজীবন সুখ-সাহায্য পেতে থাকবে। তবে ছেলেটার একটা সমস্যা হচ্ছে যে, সে কিছুতেই মিথ্যা কথা সহ্য করতে পারে না। তাই তুমি তার সাথে সারাজীবন সত্য কথা বলবে, তার কথা শুনবে। শাশুড়ির এ কথার সাথে তার নিজের অভিজ্ঞতা অর্থাৎ এ বিগত ক’দিনে স্বামী-চরিত্র সম্পর্কে তার নিজ অভিজ্ঞতা সে মিলাতে থাকে। এ বিয়ের পূর্বে অন্য ছেলের সাথে তার স-ক-ল সম্পর্কের কথা অন্য মানুষের কাছ থেকে কিংবা ঐ ছেলের পক্ষ থেকে স্বামী ভবিষ্যতে জেনে গিয়ে তার ওপর যেন ক্ষেপে না যায় -সে চতুর বুদ্ধির কৌশলে নতুন এ স্বামীকে পূর্বের সব বলে দিয়ে নিরাপদ থাকার চেষ্টা চালায়। তাই স্ত্রী তার স্বামীকে জানায়- এ বিয়ের পূর্বে আরেক ছেলের সাথে তার দীর্ঘদিনের সকল প্রকার সম্পর্ক ছিল এবং কোথায় কোথায় মিলিত হতো সেসব বাসা ও ছেলেদের হোস্টেল-রুমে তার যাতায়াতসহ সব স্থানের কথা আগাম জানিয়ে রাখে। 

স্ত্রীর এরূপ স্বতঃপ্রণোদিত সত্য কথায় স্বামী মুগ্ধ হন এবং স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেন- তোমার এসব কথায় আমার কোনোরূপ খারাপ লাগছে না বরং অকপটে সত্য কথা বলার কারণে তোমার প্রতি অধিক ভক্তি কাজ করছে। সরল চিন্তার উদারপ্রাণ, কল্যাণকামী ও ধর্মভীরু স্বামী তখনও বুঝতে পারেনি এরূপ বহমান চরিত্র কিন্তু দু’এক সঙ্গীতে তৃপ্ত হয় না। বারবার সঙ্গী পরিবর্তন কিংবা প্রণয়ের খোলস পরিবর্তনই এদের চরিত্র; এ কারণে তার প্রতি আপাত ক্রেইজি এ রমণী আবারও সঙ্গী পরিবর্তন করবেই এবং তার মীরজাফরী-বেঈমানী চরিত্র দিয়ে ভবিষ্যতে তাকে মহাবিপদে ফেলবেই -তা তখন মালুম করতেও পারেনি সরল বিশ্বাসী স্বামী।

এরূপ ক্রেইজি-কৌশলী বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে তাদের কন্যাসন্তান হয় এবং তার ১ বছরের মাথায় স্ত্রী স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে যাবার সুযোগ পান। সে সুযোগের কথা শুনে স্ত্রীর বড় বোনের মন বেজায় খারাপ। কারণ, বোন যদি স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আসে, তখন তাদের পরিবারে ও সমাজে তার নিজের তুলনায় এ ছোট বোনের কদর ও আকর্ষণ বেড়ে যাবে; নিজের গুরুত্ব কমে যাবে। তাই ঐ বোন নিজে প্রভাব খাটিয়ে ব্যর্থ হয়ে তার স্বামীর মাধ্যমে ছোট বোনের স্বামীকে বলাতে থাকেন- ওরতো মাত্র বিয়ে হলো, সুন্দরী মেয়ে বিদেশে গিয়ে বিপথগামী হতে পারে, দেশে আর ফিরে নাও আসতে পারে।

কিন্তু নদী যেমনি বাধা পেয়ে সরোবর হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি স্ত্রীর বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাবার বিষয়ে সংষ্কারমুক্ত, উদারপ্রাণ স্বামীর ইচ্ছাও কঠিন শপথে রূপ নেয়। তাই স্বামী স্বভাবসুলভ এটিচিউডে জানিয়ে দিলো- কেবল কমনওয়েলথ স্কলারশিপই নয়, যেকোনো সুযোগেই সে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে; তাতে স্বামী হিসেবে আমার বাধা দেয়া বৈবাহিক সিদ্ধান্তের বরখেলাপ; স্ত্রীর অধিকার ক্ষুন্নের পাপ রয়েছে এতে, যা আমি কোনোক্রমেই করতে পারি না। এভাবে স্ত্রীর বিদেশে অধ্যয়নের সকল বাধা-বিপত্তি দূরীভূত করার সকল দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে তাকে বিমানবন্দরে নিয়ে যায় এবং ব্রিটিশ প্লেনে তুলে দিতে গিয়ে নববধূর প্রতি স্বামীর শেষ কথা- Don`t hesitate to enjoy anything around your world..।

এভাবেই স্ত্রীর কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নে শ্বশুরালয়ের ও সমাজের বহু কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল ঐ স্বামীকে। শ্বশুর পরিবারের ঐ সদস্যদের নেতিবাচক বিশ্বাসের পাল্লায় সেদিন যদি তিনি পড়ে যেতেন, তাহলে স্ত্রীর জীবনের Major turning point দুর্বল হয়ে যেত এবং তাদের সংশ্লিষ্ট সবার পরিণতি যে কী হতো -তা সহজেই অনুমেয়।

এর ক’বছর পর সেই স্ত্রী আবারও একইভাবে স্বামীর ঐকান্তিক সহযোগিতায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় ইউরোপ থেকে পিএইচডি করে আসেন। দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন মানুষ মাঝে মাঝে তাকে স্ত্রীর বিদেশ-বিলাসের ও বিশেষ মানুষের সাথে একান্ত সম্পর্কের বিভিন্ন তথ্য দেয়ার চেষ্টা করে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বলে। কিন্তু স্বামী সেসব কথায় কর্ণপাত না করে স্ত্রী বিদেশে থাকাকালীন সন্তানদের নিয়ে দেশে অতীব কষ্ট সহ্য করতে থাকেন এবং বছরের পর বছর নিঃসঙ্গতায় ধৈর্য ধরে স্ত্রীর বিদেশে থাকাকালীন সময়গুলো পার করেন। এমনকি স্ত্রীর ক্যারিয়ার বিনির্মাণের ক্ষেত্রে উদার-ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় ভূমিকা রাখেন।

এভাবে দু’দশকের বিবাহিত জীবনে ১ মেয়ে ও ২ ছেলের গর্বিত জনক-জননী হন তারা। স্ত্রী নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যস্ত। কিচেন কিংবা রান্না-বান্নাতো দূরের কথা, সকাল কিংবা সন্ধ্যায়ও বাচ্চাদের কিছুই দেখার কোনোই ফুরসত নেই তার। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার অফিসে দৌড়। অফিস থেকে সেই রাত ১০টা/১২টা এমনকি মধ্যরাতেও টিভি-টকশো শেষ করে ঘরে ফিরে মেহমানের মতো খাবার খেয়ে ধূম ঘুম। আর গোবেচারা Self-made man স্বামী তার ব্যতিক্রমী ধ্যান-ধারণায় গড়ে তুলতে থাকেন সন্তানদের। নিজ অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংসার ও সন্তানসেবা করতে থাকেন নিয়মিত। প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বে বাবা হিসেবে সন্তানদের দিনের কার্যসূচি সম্পর্কে গাইড করেন। আবার রাতে বাসায় ফিরে পোশাক পরিবর্তনের পূর্বেই ছোট্ট সন্তানকে কোলে নিয়ে বড় দু’জনের সেদিনের কার্যসূচি মনিটরিং তার নিত্যদিনের কাজ। সন্তানদের বিশেষ কর্মকান্ডের ওপর রচনা লেখানো, নতুন নতুন জায়গা ঘুরে এসে সে বেড়ানোর বর্ণনা বাংলায় ও ইংরেজিতে বলানো, শেখানো, আত্মসমালোচনা ও পরস্পরের গঠনমূলক সমালোচনা করে সঠিকতায় ও সত্যে উন্নীত হওয়ার সংস্কার চর্চা -এসবই বাবা শেখাতে থাকেন। 

পরিবারের আয়া-বুয়াসহ সবাই সমান মর্যাদায় সমবেতভাবে খাবার গ্রহণ, মেডিটেশন-ইয়োগা-আকুপ্রেশার চর্চা, জেকের-মিলাদ-দোয়া পরিচালনা ইত্যাকার সর্বভালোর চর্চায় সবাইকে অভ্যস্ত করানোয় নিবেদিত থাকেন তিনি। এমনকি স্ত্রী-সন্তান ঘুমিয়ে গেলেও ছোট্ট শিশুকে কোলে-কাঁধে নিয়ে মৃদু জেকের করে তাকে ঘুম পাড়িয়ে, বড় দু’সন্তানের লেখা রচনার ভালো-মন্দ বিষয়ে মতামত লিখে কিংবা তাদের প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রুফ-এডিট করে, সবার রুমে রুমে গিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে তারপর হয়ত মধ্যরাতে না হয় শেষরাতে ঘুমাতে যেতেন। এসবের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে স্ত্রী-সন্তানদের বিভিন্ন লেখায় ও প্রকাশিত বইয়ে। 

এভাবেই তিনি স্ত্রী-সন্তানদেরকে এমন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গড়ে তোলেন যে- স্কুল-জীবনেই ছেলে-মেয়েরা হয়ে ওঠে লেখক, কলামিস্ট, গ্রন্থকার, স্কাউট লিডার, উপস্থাপক। আর স্ত্রী দ্রুতগতিতে সমাজের শীর্ষস্থানীয় নারী হিসেবে পরিণত হয়ে ওঠেন। নিজের এরূপ উচ্চ-আসনের জন্য স্ত্রী তার কর্মস্থলসহ বিভিন্ন ফোরামে নিজমুখে অকপটে বলেন- তার এত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সব সঞ্চয়ন হয়েছে সুদক্ষ, উদার ও মহৎপ্রাণ স্বামীর কাছ থেকে।

বিবাহের ২০তম বছরের এক সন্ধ্যায় তিনি কোথায়ও ছাপানোর উদ্দেশ্যে তার নিজের একটি লেখায় স্বামীকে উপস্থাপন করেন এভাবে, যা তারই নিজ হাতের লেখনীর ভাষায় হুবহু তুলে ধরা হলো-

তার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ২০ বছর আগে। বিদেশে পড়তে যাওয়া; তারপর বৃত্তি নিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রিলাভ -এইসব ধাপে দেখেছি নানা জাতের নানা মানুষ। কর্মজীবনে দেশে-বিদেশে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে জ্ঞানী-গুণী অনেককে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৫টি দেশে গিয়েছি আমি। নানান পরিবেশে, নানান কর্মে মানুষের চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ লক্ষ্য করেছি অপার কৌতূহলে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, চিন্তা, আদর্শ, সততা, সৃজনশীলতা -সব মিলিয়ে এক চমৎকার ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্বের আমার প্রিয় এ স্বামীর সঙ্গে আমি জীবনের তরী বেয়ে চলেছি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর সম্পর্কে কিছু কথা এখানে তুলে ধরছি।

-কঠোর পরিশ্রমী, সৃজনশীল, কৌশলী, ধৈর্যশীল, সৎ এবং অন্যায়ের সাথে আপোশহীন আমার স্বামী।
-যেকোনো পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে ঠান্ডা মাথায় মোকাবেলা করায় তার জুড়ি মেলা ভার।
-যেকোনো অবস্থায় অত্যন্ত Tactful; লক্ষ্য অর্জনে ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিমত্তা তার মধ্যে Naturally কাজ করে।
-সত্যবাদিতার প্রতি অপরিসীম অনুরাগ এবং মিথ্যাচারের প্রতি ভীষণ বিরাগ। তাই সর্বদাই ভালো কাজকে Welcome করেন, আর মন্দ কাজকে Resist করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে ও পরিবারে তাই ভালো কাজের জন্য রয়েছে পুরস্কার, আর মন্দ কাজে রয়েছে তিরষ্কার।
-সমাজের অনেক অনিয়ম-অধিকার ভঙ্গের বেদনা যখন প্রায় সকলেই নীরবে সহ্য করে যান, সেখানে সমাজের বিবেক হিসেবে বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তাঁর মজ্জাগত। অনেক সময়ই অন্যের চাপিয়ে দেয়া অন্যায় শর্ত যখন আমরা অবশ্য-পালনীয় বলে মেনে নেই, তিনি সেখানেও খেয়াল করেন মানুষের অধিকার খর্ব হচ্ছে কি হচ্ছে না। অধিকার খর্ব হলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেন।
-স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। তাঁর খাদ্যাভ্যাস অনন্য। আমাদের সাধারণ বিচারে কোনো খাবার মজাদার নাকি স্বাদহীন, সেটা মুখ্য বিবেচ্য হলেও তার নিকট বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে খাবারের পুষ্টিগুণ। সবজি, মাছ, স্যুপ, সালাদ, মধু, দুধ, ফল -এসব খাবারই তার প্রিয়। স্বাস্থ্যসম্মত বা পুষ্টিগুণসম্পন্ন হলে স্বাদহীন খাবারও তিনি আগ্রহভরে খেয়ে নেন। বিয়ে-বাড়ির রোস্ট-পোলাও রেখে ঘরে ফিরে লাউ তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া তার জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। পরিমিত খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত মেডিটেশন, ইয়োগা -এসব তার জীবনের অপরিহার্য অংশ।
-তিনি একজন Simple মানুষ। তাই Simplicity কে স্বাগত জানান সবসময়। চলাফেরায় সিনিয়র-জুনিয়র সবার সাথে তিনি সহজভাবে মেশেন, সহজ-সরল কথা বলেন, সহজভাবে মনের কথা প্রকাশ করেন। তাতে কেউ রুষ্ট হলো না তুষ্ট হলো, তা তিনি আমলে নেন না। বিবেক-বুদ্ধিতে যা ন্যায়সঙ্গত মনে করেন, তা বলতে বা পালন করতে তিনি পিছপা হন না। তিনি জনপ্রিয়তার মোহে ভোগেন না, জনকল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার দর্শনই তাঁর জীবন-দর্শন।
-তিনি চমৎকার লেখক। খুবই সাবলীল ভাষায় যুক্তির মাধ্যমে গভীর জীবনদর্শনকে সহজভাবে যেমন বোঝাতে পারেন, আবার সামাজিক-রাজনৈতিক নানা বিষয়কে অন্য দৃষ্টিতে উপস্থাপনে তাঁর তুলনা নেই। জীবনে সফলতার শিখরে ওঠার জন্য, জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধির জন্য তথা নিজেকে উন্নততর মানুষরূপে গড়ে তোলার জন্য তার প্রকাশিত বইগুলো সবার জন্য আবশ্যকীয় পাঠ্য।
-আমার স্বামী সহজ-সরলপ্রাণ মানুষ। গরিব-দুঃখী সাধারণ মানুষের জন্য ভীষণ সহানুভূতিপ্রবণ তিনি। ঈদ-শবেবরাত ইত্যাদি নানা সামাজিক ধর্মীয় উৎসবে তিনি সর্বপ্রথম আপ্যায়ন করেন বাড়ির দারোয়ান-গার্ড-পিয়ন-বুয়া-ঝাড়–দার -এদের; তারপর অন্য অতিথি আপ্যায়ন এবং অতঃপর নিজের খাবার।
-পরিশ্রমী, উদ্যমী ব্যক্তিত্ব তিনি। কঠোর পরিশ্রম, হাজার রকম কাজের ঝামেলায় পারিবারিক অনেক দৈনন্দিন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সময় দিতে পারেন না ঠিকই, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি তার বিশেষ মনোযোগ সর্বদাই থাকে। যখনই সময় পান পরিবারের সদস্যদের সাথে একত্রে বসে নানান বিষয়ে পর্যালোচনা করেন; সর্বোপরি আদর আর শাসনের এক চমৎকার ব্যালেন্স কাজ করে তার মাঝে।
-আমার স্বামী আগাগোড়া একজন আধুনিক চিন্তার মানুষ। তিনি জীবন-জগৎ নিয়ে নতুন নতুন উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ। সেই উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ কখনও কোমল, কখনও কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এমন একজন মানুষের অনেক কাছে থাকলেই বোঝা যায় এ মানুষটি দারুণ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, যার আলো নেয়ার ক্ষমতা অনেকের থাকে না বলেই তাঁকে ভুল বুঝতে পারে; কিন্তু তাঁর দর্শনগুলো বুঝতে পারে যারা, তারা নিজেরাও আলোকিত হয়ে যায়।
-আপ্যায়ন প্রিয় মানুষ তিনি। অফিসে কিংবা বাসায় -মানুষকে যতœ করে আপ্যায়ন করতে তিনি খুবই ভালোবাসেন। ব্যতিক্রমী কিন্তু স্বাস্থ্যসম্মত খাবারে, ব্যতিক্রমী উপস্থাপনায় অতিথিদের মুগ্ধ করায় তাঁর সুবুদ্ধি ও উপস্থাপনা কৌশল অতুলনীয়।
-এই সমাজে আমরা যখন অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভারসাম্যহীন আচরণ করতে থাকি, তখন তাকে আমি দেখেছি নিজের বিশ্বাস আর আদর্শে অটল থেকে সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকতে। তিনি অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন না কখনও। যুক্তিকে গ্রহণ করেন সহজ-স্বাভাবিকভাবে।
-মানুষের অদম্য চিন্তাশক্তি এবং প্রকৃতির বিচার তথা প্রকৃতির প্রতিশোধ সম্পর্কে তাঁর বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস যেকোনো চিত্তকে আন্দোলিত করে। তার সরলতা, চিন্তার গভীরতা, দূরদৃষ্টি, অদম্য মনোবল, আত্মবিশ্বাস ও অসাধারণ ধীশক্তির সমন্বিত কারিশমা আমি বহুক্ষেত্রেই দেখেছি। যার ফলে তার সাথে কথার বরখেলাপ করে, মিথ্যা বলে, কিংবা লুকোচুরি করে তথা কোনো অন্যায় করে প্রাকৃতিকভাবেই অসুবিধায় কিংবা পেরেশানিতে পড়তে দেখেছি বহুজনকে-বহুভাবে। প্রকৃত-প্রাকৃত-সত্য-সুন্দর ও স্রষ্টার প্রতি তার মোহাবিষ্ট আকর্ষণ তাকে দৃঢ়প্রত্যয়ী ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।

এভাবেই বিজ্ঞানমনষ্ক, যুক্তিবাদী, অন্যের অধিকার সচেতন, সংবেদনশীল, সৃজনশীল একজন মানুষের সাথে আমার জীবনকে সংযুক্ত করতে পেরে আমি আমার জীবনাদর্শও সমৃদ্ধ করেছি।

স্ত্রীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনার এইরূপ ব্যতিক্রমী বিশাল মনের মানুষটির প্রতিই স্ত্রী ক্রমান্বয়ে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠেন তার নিজ উত্থানের সাথে সাথে। যতই তিনি যশস্বী হচ্ছেন, ততই বাড়ছে স্বামী-বিকর্ষণ, অবহেলা, অপমান। স্বার্থান্ধ ও ইবলিশরূপী বিভিন্ন মানুষের উস্কানিতে ও প্ররোচনায় পড়ে স্ত্রী ধীরে ধীরে অহংকারী ও উচ্ছৃঙ্খল সন্দেহবাতিকের রোগীতে পরিণত হন। বিভিন্ন মানুষের কানকথায় ও সামাজিক ইবলিশদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেন তিনি। বাড়তে থাকে স্বামীর সাথে দূরত্ব-বিরক্তি-বিকর্ষণ; স্বামীর প্রতি ধৈর্য-সহ্য, Sympathy-Empathy নামতে থাকে শূন্যের কোটায়। নিজ জীবনের বহুগামীতায় তথা নিজের Belief System এর দৃষ্টি দিয়ে দেখতে থাকেন স্বামীকে। তার সন্দেহের সুদীর্ঘ জালে কোনো মাছ কখনো ধরা না পড়লেও দু’একবার হয়ত কচ্ছপ ধরা পড়ে। অবশেষে ঐ কচ্ছপকেই মাছ মনে করে তিনি নিজকে পাকা জেলেরূপে আত্মতুষ্ট করে নিজ সন্তানদের সাথে এবং অফিস-আদালত ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বামী-বিরোধী কথাবার্তা বলতে বলতে কিছু মানুষের ইন্ধন ও প্ররোচনায় একসময়ে ঐ সন্দেহ-ইবলিশের ভুত তাকে ব্যাপক আছর করে ফেলে। ওদিকে স্বামীর কাছেও তার সেলিব্রেটি জাঁদরেল স্ত্রী সম্পর্কে নেতিবাচক বিভিন্ন খবর আসতে থাকলেও স্ত্রীর ওপর অন্ধভক্ত ও প্রোএকটিভ এটিচিউডের ধৈর্যশীল স্বামী স্বভাবসুলভ সরলতায় এবং স্ত্রীর ওপর অগাধ বিশ্বাস ও মমতার কারণে সেসবে কর্ণপাত করেননি এবং স্ত্রীকেও বাইরের মানুষদের ঐসব কথার কোনোকিছু বলেননি কিংবা জিজ্ঞাসাও করেননি কোনোদিন। স্বামীর উদার মনের নিবিড় পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমান্বয়েই স্ত্রীর পেশাগত দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। তিনি ক্ষমতাবান ও প্রতাপশালী হতে থাকেন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বগণের সাথে তার বিভিন্নরূপ ব্যক্তিগত ও একান্ত সম্পর্ক তৈরি হতে থাকে। এসব প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ঐশ্বর্যের ভারে ২০ বছর পর এখন স্বামীর প্রতি ভালোবাসাতো দূরের কথা, তাকে আর কিছুতেই পছন্দ হয়ে উঠতে চায় না। তাই স্বামী যা কিছু বলে, যা কিছু করে সবই তার কাছে খারাপ ও বৈরি বলে মনে হয়। স্ত্রীর প্রতিপত্তির জোয়ারে ভেসে যেতে থাকে স্বামীর সকল পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্ত্রীকে ঘিরে স্বামীর সকল অভিলাষী লক্ষ্য। 

সন্তানদেরকে উন্নততর মানুষরূপে গড়ে তুলতে স্বামীর বিভিন্ন পরামর্শকেও স্ত্রী তার স্বভাবসুলভ সন্দেহের বেড়াজালে আবদ্ধ করে ঐসব পরামর্শ তার পেটের সন্তানদের নিকট এমনভাবে বলতে থাকেন- যাতে বাবার প্রতি সন্তানদের ভক্তি-শ্রদ্ধা কমতে থাকে, অন্যদিকে মা হিসেবে কেবল তার ওপরই অবুঝ কিশোর-কিশোরী সন্তানদের নির্ভরতা বাড়তে থাকে।

অনুরূপ লক্ষ্য অর্জনে তিনি স্বামীকে না জানিয়ে এমনকি স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও সন্তানদেরকে লেটেস্ট ফোন, ফ্রি ওয়াইফাই, ল্যাপটপ ইত্যাদি দিয়ে তাদের নিজের প্রতি নির্ভরশীল ও মোহাবিষ্ট করে তোলেন এবং তার স্বভাবসুলভ সন্দেহবাতিকের ধ্যান-ধারণায় সন্তানদেরও বাবার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকেন। স্কুল-পড়–য়া যে ছেলেকে বাবা ফোনের Security lock কিংবা ড্রয়ারের চাবি উন্মুক্ত করে রেখেছিল -সেই সুবোধ, সৃজনশীল ও ব্যতিক্রমী প্রতিভাদীপ্ত কলামিস্ট ও গ্রন্থকার কিশোর ছেলেকে এবং কিশোরী মেয়েকে বাবার অগোচরে প্ররোচিত করে গভীর রাতে স্বামী নিদ্রায় গেলে কিংবা বাথরুমে গেলে তার ড্রয়ার, ফোন, পকেট কিংবা ব্যাগ চেক করাসহ বিভিন্ন নেগেটিভ কার্যক্রম চালাতে থাকেন। অথচ ক্রিয়েটিভ ও কনস্ট্রাকটিভ এটিচিউডের এ ছেলে সর্বদাই ছিল বাবাভক্ত এবং বাবারও অতিপ্রিয়, সর্বজনের বিবেচনায় এ সমাজের অত্যন্ত প্রতিভাদীপ্ত শ্রেষ্ঠ সন্তান।

এভাবে স্ত্রী একদিকে স্বামীর প্রতি চরম নেগেটিভ কথা ও আচরণের মাধ্যমে নিজ মস্তিষ্ক-ভূমি দ্রুত উর্বর করতে থাকেন হাইব্রিড পদ্ধতিতে; অন্যদিকে সন্তানদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলেন তাদেরই জন্মদাতা পিতার বিরুদ্ধে। পুরো বিষয়টি ঘটে যায় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই।

অথচ এই স্বামীই তার কঠোর পরিশ্রমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় দিয়ে কেনা জীবনের প্রথম ফ্ল্যাট নববিবাহিতা বধূর নামেই রেজিস্ট্রি করে দেন। বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় স্ত্রীর নামে জমি কিনে দেয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্ত্রী ও সন্তানদের দীর্ঘমেয়াদি সুখ-শান্তি নিশ্চিত করতে এবং শেষ জীবনে সুখ ও আরাম-আয়েশের পরিকল্পনায় নিজকে দিবারাত্রি কঠোর পরিশ্রমে নিবেদিত রাখেন। বিয়ের পর থেকেই জমি-ফ্ল্যাটসহ স্বামীর সব কেনাকাটার মালিকানা কাগজপত্র করে দেন স্ত্রীর নামে। স্বামীর এ ভুল কিংবা উদার-মহানুভবতার সুযোগটাই অস্ত্র হিসেবে স্বামীর বিরুদ্ধে পরবর্তীতে ব্যবহার করে ধূরন্ধর স্ত্রী। 

বাইরের জগতে স্ত্রী এতই সম্পৃক্ত যে, সন্তান-পরিবার-স্বামীকে গুণগত সময় দেয়া হয়ে উঠছে না। স্বামীর প্রতি বৈরি আচরণের প্রেক্ষিতেও গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে ওঠা স্বামী কখনো কোনোরূপ বিশ্বাস হারাতে পারেন না ইউরোপে পড়াশোনা করা পশ্চিমা সংস্কৃতির স্ত্রীর ওপর। তাই স্ত্রীর বিরাট পরিবর্তনেও কিংবা স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাইরের মানুষের সমালোচনায়ও তিনি কখনো স্ত্রীকে প্রশ্ন করার নেতিবাচক মনও তৈরি করেননি। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অবারিত উৎসর্গে স্ত্রী আরও অহংকারী ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয়ে ওঠেন এবং নিজকে Single করে ফেলার দৃঢ়সংকল্পে সন্তান ও আয়া-বুয়া-ড্রাইভারকে স্বামীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে থাকেন। স্ত্রীর রিএকটিভ ও নেগেটিভ আচরণের ২/১টি Hit of moment এ প্রেমের অনুপম আবেগের ও প্রচন্ড ভালোবাসার স্ত্রীকে অগত্যা রাগত কথা বলে তার ঔদ্ধত্য, উচ্ছৃঙ্খলা ও তর্কাতর্কি থামানোর চেষ্টা করেন। এরূপ এক ছুটির দিনে সকালে স্ত্রীকে নিজ ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সন্তানদের খাবারদাবার ও ক্যারিয়ারের প্রতি মনোযোগী হবার পরামর্শ দিতেই স্ত্রী প্রচন্ড ক্ষেপে যান এবং পূর্ব-পরিকল্পনায় সাজানো ছকে ফেলে সন্তান ও বুয়ার সহায়তায় এক ট্রাজিক ও অকল্পনীয় পরিস্থিতিতে ফেলে দেন তার প্রতি উৎসর্গীকৃত ও উজাড় করা ভালোবাসার ঐ স্বামীকে।

এরপর একা-অসহায়-নিরুপায় স্বামী অফিসে গিয়ে স্ত্রীর অকল্পনীয় ও অপ্রত্যাশিত উচ্ছৃৃঙ্খল আচরণের কারণ উদঘাটনে এবং সন্তান-সংসার ও স্বামীর প্রতি তার উদাসীনতার কারণ অনুসন্ধানে তার সাথে বিবাহপূর্ব অন্য পাত্রের সাথে সম্পর্কের স্বরূপ ও সঠিক তথ্য জানতে চিঠি পাঠান। দু’দিন অপেক্ষা করার পরও স্ত্রী সে পত্রের উত্তর না দেয়ায় ছোট্ট শিশুসন্তানসহ বহুদিক বিবেচনায় পারিবারিক শান্তির স্বার্থে পূর্ব ঘটনার জন্য নিজেই স্ত্রীকে Sorry, Forgive ইত্যাদি সব সব বলেন। সে সময়ে স্ত্রীও তাকে ক্ষমা করে দেন। এসবই ঘটেছে সন্তান ও বুয়ার উপস্থিতিতে।

স্বামী ভাবতে থাকেন, এখন থেকে তিনি স্ত্রীর প্রতি আরো অধিক মায়া-ভালোবাসা এবং সেক্রিফাইস করে হলেও সন্তানদের ও পারিবারিক মঙ্গলের প্রয়োজনে স্ত্রীর সকল অপকর্মেও কম্প্রোমাইজ করবেন এবং নিজ নীতি-আদর্শ শিথিল করে হলেও ফেইসবুক আসক্ত অতি আধুনিক (!) স্ত্রী-সন্তানদের সাথে Match & Adjust করবেন। তাই চরম নেগেটিভ স্ত্রীর প্রতি তার এরূপ সর্বত ও সর্বোচ্চ প্রোএকটিভ ও পজিটিভ সিদ্ধান্তের কথা তিনি এসএমএস-ইমেইলে, সুস্পষ্ট টাইপে এমনকি নিজ হাতে চিঠি লিখেও স্ত্রীর নিকট বারবার পৌঁছান। শেষতক তিনি এমনও লিখেছেন যে- I will go anywhere elsewhere as you forward me and I will do that to keep our promises, in which both of us signed at Lalmatia Kazi Office.

কিন্তু বিধি বাম। ঐ দিনের মধ্যেই স্ত্রী ঘরের ভিতরের কথা বাইরের ফোরামে ও বিভিন্ন মানুষের কাছে একচেটিয়া বলে তাদের ইন্ধন ও প্ররোচনায় স্বামীকে বলে দেন, আর বাসায় এসো না এবং আমি ডিভোর্স চাই। স্ত্রী-সন্তানের কাছে নিজকে ছোট করেও উদার মনে ক্ষমা চাওয়া স্বামী ক্ষমা করে দেয়া স্ত্রীর কাছ থেকে বিনামেঘে বজ্রাঘাতে পড়ে হতবিহ্বল হয়ে কাটাতে থাকেন মানবেতর জীবন; গৃহহারা-সংসারহারা হয়ে কোনো ভাত-মাছ-মাংস না খেয়ে এবং কোনো খাট-চাদরের বিছানায় না ঘুমিয়ে কাটাতে থাকেন বছরের পর বছর। অপেক্ষা করতে থাকেন স্ত্রীর বোধোদয়ের, করুণার, মানবিক মূল্যবোধের এবং সেই কৃতজ্ঞতাবোধের- যেই উৎসর্গ, ধৈর্য ও ক্ষমার সুমহান আদর্শের সাথে স্নেহ ও মমতার এক অনুপম প্রেমে তার স্বামী তাকে অভিষিক্ত করে এখন তাকে ক্ষমতাবান সেলিব্রেটিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং যে ক্ষমতাবলে স্ত্রী এখন স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অযথা র‌্যাব-পুলিশ-প্রশাসন লেলিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। স্বামীর অফিস ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের জন্য তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি করে নানামুখী শত্রুদল। এক কথায় দু’দশক পূর্বে যে তরুণী মোহনীয় ছলনায় সন্মোহিত করে সুদীর্ঘকাল ধরে স্বামী থেকে লুটে নিয়েছে সকল স্বার্থ; সেই রমণীই এখন স্বামীর ওপর স্বহস্তে বিছিয়ে দিয়েছে ঘোর শত্রুতার বেড়াজাল আর চাপিয়ে দিয়েছে নানামুখী অত্যাচার ও নির্যাতনের কঠিন খড়্গ।

এর মূলে রয়েছে ‘খেলারাম খেলে যা’ এর আরেক চাতুর্য। এ রমণীর স্বেচ্ছাচারিতার অবাধ রঙ্গলীলা চরিতার্থে যাতে কারুর নজর না থাকে; যাতে শিশু-সন্তানদেরকে বুয়ার কাছে ফেলে সেমিনারের অজুহাতে বিদেশ-বিলাস কিংবা দেশে যেকোনো সময়েই প্রমোদ বিহারের ক্ষেত্রে কারুর নজরদারীর সুযোগ না থাকে; যে মা ক্ষণস্থায়ী ভোগবিলাসে মত্ত ক্ষণজন্মা বিদূষী রমণী, সেই মা কর্তৃক ছোট্ট শিশুর ওপর চরম হেলাফেলার কথাও কিছুতেই জানার সুযোগ করতে না পারে তাদের নিগৃহীত পিতা..। এত্তকিছুর পরও নিরুপায় স্বামী সকল নফল এবাদতে তার সন্তানদের মায়ের হেদায়েতের প্রার্থনা করেই যাচ্ছেন; যদিও ক্ষেত্রবিশেষে এরূপ কিছু জালেমকে স্রষ্টা হেদায়েত দান করেন না।

সুধী পাঠক, এ লেখার প্রথমদিকে উত্থাপিত বনি ইসরাইল যুগের সাথে আধুনিক যুগের এ স্ত্রীর অকৃতজ্ঞতার সমঞ্জস বেশ লক্ষনীয়। বর্তমান সময়ের বাস্তব এ উপাখ্যানে গভীরভাবে লক্ষণীয় যে- স্ত্রীর বর্তমান ক্ষমতার উত্থানে স্বামীর সুদীর্ঘ দু’দশক ধরে বিভিন্ন উৎসর্গের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের শিক্ষায় দীক্ষিত হতে না পেরে আত্মঅহংকারী স্ত্রী আজ নিজ ভুবনে অশান্ত, উচ্ছৃঙ্খল; তার মনোরাজ্যের শান্তি ও স্বস্তির স্থলে সৃজিত হচ্ছে অহমিকা, উচ্ছৃঙ্খলা, বিবেকহীন, যুক্তিহীন, অশোভনীয় এমন আচরণ; যা সে নিজেও কিছুতেই টের পাচ্ছে না।

মানুষরূপী ইবলিশের প্ররোচনার গ্যাড়াকলে পড়ে ‘পৃথিবীর সকল সমস্যার সহজ সমাধান’ গ্রন্থের লেখক স্বামীর কোনো সমাধানের প্রস্তাবই তার কর্ণপাতে স্থান পায় না কিছুতেই; স্বামী-স্ত্রী দু’জনার পথ দু’দিকে, ভেঙেচুরে খানখান সংসার। সে ছিল কোথায়! আছে কোথায়!! যাচ্ছে কোথায়!!!

প্রিয় পাঠক, তাই আসুন- সম্পর্কের শুরুতে যে সঙ্গী ছিল অত্যাবশ্যকীয় ও অপরিহার্য, সে সঙ্গীর প্রতি কৃতার্থ থাকি সারাজীবন। অন্যের প্ররোচনায় পড়ে সঙ্গীর জীবন কিংবা শিশু সন্তানের জীবন ধ্বংস না করি। এমনকি সঙ্গীর ভুল-ত্রুটিতেও সংসার ভাঙার মতো নিকৃষ্টতম চরম উচ্ছৃঙ্খল ও অমানবিক রিএকশনে না গিয়ে তাকে নিজ উদার ও ক্ষমার সুমহান আদর্শের ঝাপিতে ফেলে মহামানুষ করে তুলি এবং নিজেও সুমহান হয়ে স্রষ্টার অনুকম্পা লাভ করে ইহলোক ও পরলোকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে থাকি। 

বনি ইসরাইল যুগের ঐ নারীর মতো কিংবা অতি আধুনিকা-উচ্ছৃঙ্খল-লম্পট এ নারীর মতো আর কেউই যেন সঙ্গীর সাহায্যের ওপর ভর করে তার মাথার উপর উঠে তারপর নিজ প্রতিপত্তির গরিমায় কিংবা অমানবিক অহংকারে সঙ্গী ও সন্তানের জীবন কিংবা সংসার ভেঙে না দেই। এরূপ উচ্ছৃঙ্খল-বিশৃঙ্খল কথা ও কর্ম আমরা এড়িয়ে চলি এবং ইবলিশি কর্মকান্ড থেকে নিজকে বিরত রাখি।

আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাবোধের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে সহজ-সরল, আনন্দে ও সৃজনশীলতায় ভরপুর করি; স্রষ্টার ও সৃষ্টির অমোঘ বিধানকে উপেক্ষা না করে গড়ে তুলি সবার সাথে সুসম্পর্কের অমিয় বন্ধন, মহানন্দে অবগাহন করি ইহজগতের ও পরজগতের সর্বকিছুতে।

-চলবে