Sun Sun Sun Sun Sun
English

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিতেও বৈষম্য

|| ড. এম হেলাল ||
সবখানেই বৈষম্য -ধর্মের বৈষম্য, বর্ণের বৈষম্য, কর্মের বৈষম্য, আইন কানুনেও বৈষম্য। দেশগত এই বৈষম্যগুলো না হয় থাক, কিন্তু একই দেশের মধ্যে যখন নানা বৈষম্য চোখে পড়ে তখন অনুভূতিটা কেমন হয়? নিশ্চয় খুব একটা সুখকর অনুভূতির জন্ম হয় না। অবশ্য এই বৈষম্য যাদের স্বপক্ষে বেশ জোরালো তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যাদের স্বপক্ষে না, (এদেশে স্বপক্ষে না’র দলটা বেশ ভারী) তাদের বেলায় কোন্ অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতো ভুুক্তভোগী মাত্রই জানি।

কিন্তু কথা হচ্ছে এসব বৈষম্য আমাদের দেশে কত খানি? এক কথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, খুব বেশি। হ্যাঁ, বেশিতো বটেই। এই বেশিটাই আবার কিভাবে নিরূপণ করতে হবে? অবশ্যই এটা সংখ্যাগত মানের ভিত্তিতে। কিন্তু সেখানেও বৈষম্য, ঠিকমত কিছুই আমরা পাচ্ছি না। আর আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে যে কিছু একটা করতে যাবো, এমন পরিবেশই বা কই?

অবশ্য আমরা যে খালি হাতের মানুষ, তাও না। একটা না একটা পন্থা তো আমাদের আছেই। যার ভিত্তিতে আমরা জানছি বা বলতে পারছি এখানে বৈষম্য। ব্যাস ঐ পর্যন্তই, এর পরে যাওয়ার আর কোন ক্ষমতাও নেই, যাচ্ছিও না। শুধু ভুগেই যাচ্ছি, প্রতিকার কখনো চাচ্ছি না। আর না চাইলে পাওয়ার প্রশ্ন তো অবান্তর। কিন্তু বলতে যখন শুরু করেছি তখন থেমেই বা কি লাভ। যতদূর পারি বলি, তারপর যা হোক কোন এক উপসংহারে গিয়ে না হয় থেমে যাব।

যাক, যা বলছিলাম- এদেশের শিক্ষাঙ্গনের কথা। এখানে প্রথমে যে বৈষম্য চোখে পড়ে তা প্রাইমারি বনাম নার্সারী শিক্ষা ব্যবস্থা। অবশ্য গ্রামে-গঞ্জে ঐ প্রাইমারির অবস্থা যে আরো করুণ, তা আর বলতে যাচ্ছি না। কিন্তু কথা হচ্ছে ঐ প্রাইমারিতে যারা পড়ছে- তাদের সাধ্য নেই, সামর্থও নেই ঐ নার্সারীতে পড়ার। আর নার্সারীতে যারা পড়ছে তারা ইচ্ছে করলে প্রাইমারিতে পড়তে পারতো। কেননা প্রাইমারিতে পড়তে বিত্তের তেমন একটা প্রয়োজন পড়ে না, যতটা না নার্সারীতে পড়তে গেলে প্রয়োজন পড়ে। অবশ্য সবখানেই যে চিত্তের চেয়ে বিত্তের প্রয়োজন বেশি, তাকেও এই সাথে স্বীকার করে নিচ্ছি। আসলে শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্যের সূত্রপাত এখান থেকেই। পরবর্তীতে যা আরো ব্যাপক হচ্ছে। আর মাধ্যমিক পর্যায়ে আরেক বিচিত্র খেলা। খেলাতো নয়, বরং বিত্তের চালের একটা বড় ধরনের পাঁয়তারা। ভালো স্কুল, ভাল বেতন, ভাল পোষাক-পরিচ্ছদ। কিন্তু একজন গরীব অভিভাবকের পক্ষে ততটা যোগাড় করা কিভাবে সম্ভব? অবশ্য তার সন্তান-সন্ততি ততদিনে প্রাইমারির ধাপটা অতিক্রম করে ফেলেছে। আবার ঐ অভিভাককেরও ইচ্ছা, সন্তান-সন্ততি আরো লেখাপড়া শিখুক এবং তাদের/এর মাধ্যমে তারাও বিত্তবানদের দলে নাম লেখাক। কিন্তু ঐ সব যোগাড় করা যখন সম্ভব হয় না, তখন? হাঁ, তখনই তাকে খুঁজতে হয় কমদামী একটা স্কুল (এই কমদামী অবশ্য বেতন ও রেজাল্টের মানে নির্ণীত)। খুঁজেও নেয়, জন্ম হয় আরেক ধাপ বৈষম্যের।

তেমনিভাবে কলেজেও এই একই খেলা বেশ জমে, জমবেইতো। তবে এটা একটু ভিন্ন গোছের। কেননা প্রাইমারি আর মাধ্যমিক ধাপ পার হওয়া অনেকের পক্ষে সম্ভব হলেও কলেজ পর্যন্ত টেনে নেয়ার সাধ্য এদেশের ক’টা অভিভাবকের আছে? অবশ্য এই মাধ্যমিক ধাপ উৎরানোর আগেই যে আবার অনেকে হোঁচট খায় না এমন অবস্থা তো আর যেখানেই হোক আমাদের এই বাংলাদেশে বিরল নয়।

যাক এতক্ষণ তো সারামাঠে পানি দেখে শুধু শুধু সাঁতরালাম, দীঘিতে পৌঁছলাম না। এবার যখন দীঘির প্রসঙ্গ এল তাহলে দীঘির পানিতে একটু নামি, একটু সাঁতরাই। বুঝছেন তাহলে, হ্যাঁ এই দীঘি মানে বিশ্ববিদ্যালয়; যেখানে একটা স্বতন্ত্র ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য বৈষম্য যে এখানে নেই বা বিত্তের উপস্থিতি যে এখানে অনুপস্থিত তা বলছি না। সবই আছে এবং প্রকট ভাবেই আছে। শিক্ষায় বৈষম্যতো ঐ নার্সারী আর প্রাইমারি জন্ম দিয়েই বসে আছে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এর চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি। অবশ্য এই বৈষম্য একটু ভিন্ন, একটু অন্য ধরনের। নার্সারী আর প্রাইমারির যে বৈষম্য, সে বৈষম্য যতটা নগ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সে বৈষম্যটা ততটা নগ্ন না। মানে ঐ নগ্নতার ওপরে একটা আবরণ আছে। কিন্তু একথা স্বীকার করতে হবে হাল ফ্যাশানের ঐ আবরণের মাঝ দিয়েও নগ্নতা বেশ ফুটে ওঠে। আর ঐ প্রষ্ফুটিত নগ্নতা বা বৈষম্যই হচ্ছে মূল আলোচ্য বিষয়।

যা বলছিলাম, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় যে ক’টা আছে তার মধ্যে প্রাধান্য বজায় রেখেছে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য এদের এই প্রাধান্য বজায় রাখার পিছনে প্রধান কারণ- কলেজগুলোতে এদের ভূমিকা। ডিগ্রি কলেজগুলো এদের সহায়তায় পরিপূর্ণ।

কিন্তু এই যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়, এদের মধ্যে বৈষম্য আছে। আর এই বৈষম্য এত প্রকট যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সব ছাত্র-ছাত্রী তা চরমভাবে অনুভব করে থাকে। অথচ ঐ প্রাইমারি আর নার্সারীর মত ব্যাপার এখানেও লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ নার্সারীতে পড়ুয়ারা সহজেই প্রাইমারিতে পড়তে পারে, কিন্তু প্রাইমারির পড়ুয়ারা সহজেই নার্সারীতে পড়তে পারে না। কেননা সেখানে ব্যাপক বিত্তের প্রশ্ন এসে দেখা দেয়। অবশ্য আনুসঙ্গিক যে অসুবিধা নেই তা নয়, আছে। কিন্তু চেষ্টা করলে তার পাশ কাটানো খুব একটা কষ্টকর নয়। ফলে সহজভাবে দূর হয়ে যায় প্রাথমিক পর্যায়ের সমস্ত বৈষম্য। তেমনিভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বিভাগ পেতে হলে প্রয়োজন পড়ে শতকরা ৪৫ নম্বরের। পক্ষান্তরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তা হচ্ছে শতকরা ৪০ নম্বর। সমতা নেই, অসমতা আছে। বৈষম্য তো এটাই। কেননা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্রী কিংবা ছাত্র যেখানে ৪৫% নাম্বার পেয়ে দ্বিতীয় বিভাগ পাচ্ছে, সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ৪০ নাম্বারে সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে দিব্যি দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে বসে থাকছে। অবশ্য সার্টিফিকেটে লেখা থাকছে দ্বিতীয় বিভাগ উভয় ক্ষেত্রেই, মার্কসের কোন উল্লেখ সেখানে নেই। তারপর তো যোগ্যতার প্রশ্ন, প্রশ্ন ইন্টারভিউয়ের। কিন্তু ৪৪ পেয়ে যে ছাত্র বা ছাত্রী ঐ ইন্টারভিউতে উপস্থিত হওয়ার অধিকার পায় না, একজন ৪০ পেয়ে সে অধিকার দিব্যি অধিকৃত করে রাখে। এভাবে দেশের সর্ব্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন-বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি বৈষম্য চলে তাহলে এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাইবা কতটুকু ফলপ্রসূ হয় তা বলার অবকাশ রাখেনা। আর এদেশের সহৃদয় বুদ্ধিজীবীরা তা দেখেন কিন্তু বলার বা করার মত তেমন কিছুই খুঁজে পান না। বরং বৈষম্য বাড়তে থাকে, সৃষ্টি হয় হাজারো সমস্যা। সমাধান নেই, নেই কারো উদ্যোগ এ সমস্যা সমাধানের।

এমনি বৈষম্য কি এক দেশে দুই নিয়মের উপস্থিতি নয়? এমনি বৈষম্য কি এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটা বড় ত্রুটি নয়? অথচ এর সমাধান হচ্ছে না। আমরা করছি না। বরং আর সব বৈষম্যের পাশাপাশি এ বৈষম্যও শিকড় গেড়ে বসে আছে। কিন্তু আর কতদিন থাকবে -এটাই প্রশ্ন?

(১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার মে দিবস সংখ্যায় মুদ্রিত)